সম্পাদকের পাতা

কার্যকর হলো যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত পণ্যের ওপর কানাডার নতুন শুল্ক

নজরুল মিন্টো

কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান বাণিজ্য বিরোধের নতুন অধ্যায় হিসেবে ৮ সেপ্টেম্বর রাত ১২টা ১ মিনিট থেকে যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত নির্দিষ্ট কয়েকশ শ্রেণির পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক কার্যকর করেছে কানাডা। তবে এর অর্থ এই নয় যে আজ থেকেই দোকানের সব আমেরিকান পণ্যের দাম হঠাৎ বেড়ে যাবে। আবার নতুন শুল্কের কোনো প্রভাবই সাধারণ মানুষের জীবনে পড়বে না, সেটিও ঠিক নয়।

তাই এখন প্রয়োজন আতঙ্কিত না হয়ে বরং একটু সচেতন হওয়া। পণ্যটি কোথায় তৈরি, কানাডিয়ান বিকল্প আছে কি না এবং দামের পার্থক্য কত, কেনার আগে এই কয়েকটি বিষয় দেখলেই অনেক ক্ষেত্রে বাড়তি খরচ এড়ানো সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে কানাডার কৃষক, উৎপাদক, কারখানা ও শ্রমিকদের তৈরি পণ্য বেছে নেওয়ার সুযোগও তৈরি হয়েছে।

কানাডার নতুন পাল্টা শুল্কের পেছনে রয়েছে গত ২২ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত। ওয়াশিংটন কানাডার প্রায় ২৭.৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করার পর অটোয়া ঘোষণা দেয়, একই পরিমাণ মার্কিন আমদানির ওপর ‘dollar for dollar, rate for rate’ পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সেই সিদ্ধান্তই কার্যকর হয়েছে ৮ সেপ্টেম্বর।

বর্তমান তালিকায় ৬২৯টি শুল্ক শ্রেণি রয়েছে। এর অর্থ বাজারের ঠিক ৬২৯টি আলাদা পণ্যের দাম বাড়বে, এমন নয়। একটি শুল্ক শ্রেণির আওতায় অনেক ধরনের পণ্য, মডেল ও ব্র্যান্ড থাকতে পারে। প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, ৪১৩টি শ্রেণিতে ৫০ শতাংশ, ১৯৫টিতে ২৫ শতাংশ এবং ২১টিতে ১৫ শতাংশ শুল্ক রাখা হয়েছে।

সাধারণ ভোক্তার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শুল্কটি কোনো আমেরিকান ব্র্যান্ডের ওপর নয়, বরং মার্কিন উৎপত্তির পণ্যের (U.S.-origin goods) ওপর। অর্থাৎ কোনো মার্কিন কোম্পানির পণ্য যদি চীন, ভিয়েতনাম, মেক্সিকো বা অন্য কোনো দেশে তৈরি হয়, শুধু কোম্পানিটি আমেরিকান বলে তার ওপর এই শুল্ক বসবে না। আবার কম পরিচিত কোনো ব্র্যান্ডের পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি হয়ে তালিকাভুক্ত শ্রেণির মধ্যে পড়লে তার ওপর শুল্ক কার্যকর হতে পারে।

তালিকার দিকে তাকালে বোঝা যায়, বিষয়টি কেবল গ্রোসারি স্টোরের কয়েকটি পণ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে শিল্প ও নির্মাণ খাতের কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি। বিশেষ করে ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের বহু পণ্যে আগে থাকা ২৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক বেড়ে ৫০ শতাংশ হয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে দুগ্ধজাত পণ্য, গৃহস্থালি বৈদ্যুতিক যন্ত্র, কৃষিযন্ত্র, কাগজ ও কাগজজাত পণ্য, প্লাস্টিক এবং ইলেকট্রনিকস।

৫০ শতাংশ শুল্কের তালিকায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত নির্দিষ্ট ধরনের গুঁড়া দুধ, ঘন দুধ ও ক্রিম, মধু, মোলাসেস, পারফিউম, লিপস্টিক ও চোখের প্রসাধনী, শ্যাম্পু ও কন্ডিশনারসহ চুলের পরিচর্যার কিছু সামগ্রী, টি-শার্ট, সোয়েটার, জ্যাকেট ও কিছু পোশাক। এছাড়া প্লাইউড ও কাঠজাত পণ্য, কাগজ ও প্যাকেজিং সামগ্রী, ধাতব ও শোবার ঘরের আসবাব, আলোকসজ্জার সরঞ্জাম এবং বহু ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম পণ্যও রয়েছে এই তালিকায়।

প্রযুক্তিপণ্যের মধ্যেও কিছু পরিচিত নাম রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত এবং সংশ্লিষ্ট শুল্ক শ্রেণির আওতায় পড়া স্মার্টফোনের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক রয়েছে। নির্দিষ্ট মনিটর, নেটওয়ার্কিং সরঞ্জাম, ভিডিও গেম কনসোল, গলফ সরঞ্জাম ও ব্যায়ামের কিছু সামগ্রীও একই হারের আওতায় পড়েছে। তবে একটি ফোন বা গেম কনসোল শুধু মার্কিন ব্র্যান্ডের হলেই শুল্ক লাগবে না; কোথায় তৈরি হয়েছে, সেটিই আসল বিষয়।

২৫ শতাংশের তালিকাটি সাধারণ পরিবারের কাছে আরও পরিচিত। cheddar, mozzarella, brie ও camembert-সহ বিভিন্ন ধরনের চিজ, রেফ্রিজারেটর, ফ্রিজার, ডিশওয়াশার, ওয়াশিং মেশিন ও ড্রায়ারের কিছু শ্রেণিতে এই হার প্রযোজ্য। ব্রেড মেকার, রাইস কুকার, চুলা ও রান্নার রেঞ্জের নির্দিষ্ট পণ্যও রয়েছে এই তালিকায়।

এমনকি নির্দিষ্ট মার্কিন টয়লেট পেপার ও ফেসিয়াল টিস্যুতেও ২৫ শতাংশ শুল্ক রয়েছে। রান্নাঘরের কিছু আসবাবে ২৫ শতাংশ, আবার অন্য ধরনের কাঠের গৃহস্থালি আসবাবে শুল্ক ৫০ শতাংশ পর্যন্ত। ফলে শুধু ‘আসবাব’ বা ‘কাগজজাত পণ্য’ বলেই শুল্কের হার নির্ধারণ করা যাবে না। নির্দিষ্ট শুল্ক শ্রেণির ওপর হার নির্ভর করবে।

১৫ শতাংশের তালিকা তুলনামূলক ছোট। এর মধ্যে রয়েছে কিছু এয়ার কন্ডিশনার, হিট পাম্প, ফর্কলিফট, শিল্প রোবট, কৃষিযন্ত্র, ঘাস কাটার যন্ত্র এবং কারখানায় ব্যবহৃত কিছু যন্ত্রাংশ। এসব পণ্য সরাসরি প্রতিদিনের বাজারের অংশ না হলেও উৎপাদন ব্যয় বাড়লে পরে অন্য পণ্যের দামেও তার কিছু প্রভাব পড়তে পারে।

২৫ শতাংশ শুল্ক মানেই কি দাম ২৫ শতাংশ বাড়বে? না। এখানেই সবচেয়ে বেশি ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ রয়েছে। ধরা যাক, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা কোনো গৃহস্থালি যন্ত্রের সীমান্তে ঘোষিত মূল্য (customs value) ৪০০ ডলার। সেটি ২৫ শতাংশ পাল্টা শুল্কের আওতায় পড়লে আমদানিকারকের অতিরিক্ত ১০০ ডলার শুল্ক দিতে হতে পারে। কিন্তু দোকানে পণ্যটির দাম যদি আগে ৬০০ ডলার হয়ে থাকে, তার অর্থ এই নয় যে নতুন দাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে ৭৫০ ডলার হবে।

পুরোনো মজুতের বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। নতুন শুল্ক কার্যকর হলেও অনেক দোকানে আগে থেকে আমদানি করা পণ্য রয়েছে। নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার সময় যেসব মার্কিন পণ্য ইতোমধ্যে কানাডার পথে রয়েছে, সেগুলোকেও নতুন পাল্টা শুল্কের বাইরে রাখা হয়েছে। ফলে আজ সকাল থেকেই সংশ্লিষ্ট সব পণ্যের মূল্যট্যাগ বদলে যাবে, এমন ধারণা ঠিক নয়।

মনে রাখতে হবে, এই শুল্ক সরাসরি কানাডায় তৈরি পণ্যের ওপর বসছে না। বরং মার্কিন পণ্য তুলনামূলক ব্যয়বহুল হলে কানাডিয়ান উৎপাদকরা নিজেদের বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠতে পারেন। চাহিদা বাড়লে স্থানীয় উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়তে পারে। পাল্টা শুল্কের অন্যতম উদ্দেশ্যই হলো মার্কিন প্রতিযোগীদের বিপরীতে কানাডিয়ান উৎপাদকদের অবস্থান শক্ত করা।

তবে কানাডিয়ান পণ্য কিনতে চাইলে শুধু ম্যাপল লিফ দেখলেই হবে না। লেবেলও পড়তে হবে। ‘Product of Canada’ এবং ‘Made in Canada’ এক অর্থ বহন করে না।

Competition Bureau-এর নিয়ম অনুযায়ী, খাদ্যবহির্ভূত কোনো পণ্যে ‘Product of Canada’ লেখা থাকলে সাধারণত অন্তত ৯৮ শতাংশ সরাসরি উৎপাদন ব্যয় কানাডায় হতে হয় এবং পণ্যটির শেষ বড় ধরনের রূপান্তরও কানাডায় ঘটতে হয়। আর ‘Made in Canada’-এর ক্ষেত্রে সরাসরি উৎপাদন ব্যয়ের অন্তত ৫১ শতাংশ কানাডায় হতে হয়। এতে বিদেশ থেকে আনা যন্ত্রাংশ বা উপকরণ থাকতে পারে, যা সাধারণত লেবেলে উল্লেখ করা হয়।

খাদ্যের ক্ষেত্রেও ‘Product of Canada’ সাধারণত প্রায় পুরোপুরি কানাডিয়ান উপাদান ও কানাডায় প্রক্রিয়াজাতকরণ বোঝায়। অন্যদিকে ‘Made in Canada’ পণ্যে আমদানি করা উপাদান থাকতে পারে। তাই শুধু ম্যাপল লিফের ছবি নয়, লেবেলের ভাষাও দেখা দরকার।

বর্তমান পরিস্থিতিতে কানাডিয়ান পণ্য বেছে নেওয়া শুধু আবেগ বা দেশপ্রেমের বিষয় নয়। একই মান ও কাছাকাছি দামের দুটি পণ্যের একটি যদি কানাডায় তৈরি হয়, সেটি কেনার অর্থ স্থানীয় ব্যবসা, কৃষক, শ্রমিক ও উৎপাদককে সমর্থন করা। ফেডারেল সরকারও সরকারি ক্রয়নীতিতে কানাডিয়ান সরবরাহকারী ও কানাডায় তৈরি পণ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পথে এগোচ্ছে।

আগামী কয়েক সপ্তাহে কেনাকাটার সময় তাই তিনটি বিষয় একটু বেশি দেখা দরকার: দাম, উৎপত্তির দেশ এবং বিকল্প পণ্য। অনেক পণ্যেরই কানাডিয়ান কিংবা অন্য দেশের বিকল্প রয়েছে।

বাণিজ্যযুদ্ধের সিদ্ধান্ত সরকার নেয়। কিন্তু বাজারে শেষ সিদ্ধান্তটি ক্রেতার হাতেই থাকে। সেই সিদ্ধান্ত যদি একই সঙ্গে পরিবারের অর্থ সাশ্রয় করে এবং কানাডার কৃষক, শ্রমিক ও উৎপাদকের পাশে দাঁড়ায়, তাহলে আজ থেকে শুরু হওয়া নতুন বাস্তবতায় সেটিই হতে পারে সবচেয়ে বুদ্ধিমান কেনাকাটা। Be Canadian. Buy Canadian.

তথ্যসূত্র:
Department of Finance Canada

Back to top button