বিরোধী নেতার ওপর নজরদারিতে জ্যামাইকায় গোয়েন্দা পাঠিয়ে বিতর্কে ফোর্ডের কনজারভেটিভ পার্টি
নজরুল মিন্টো

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের দুর্বলতা খোঁজা এক জিনিস, আর ব্যক্তিগত ছুটিতে থাকা একজন বিরোধী নেতার ওপর নজর রাখতে বিদেশে লোক পাঠানো আরেক জিনিস। অন্টারিওর প্রগ্রেসিভ কনজারভেটিভ পার্টি বনি ক্রম্বির তিন দিনের ব্যক্তিগত ছুটির সময় প্রায় ৩ হাজার ডলার খরচ করে জ্যামাইকায় একজনকে পাঠিয়েছিল। বিষয়টি সামনে আসার পর ডাগ ফোর্ড ও তাঁর দলের রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
অন্টারিওর রাজনীতি ও কুইন্স পার্ককেন্দ্রিক রাজনৈতিক নিউজলেটার ও অনলাইন প্রকাশনা POLICORNER এবং Village Media পরিচালিত অন্টারিওর রাজনীতি ও নীতিনির্ধারণবিষয়ক বিশেষায়িত অনলাইন সংবাদমাধ্যম The Trillium-এর যৌথ অনুসন্ধানে ঘটনাটি সামনে আসে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে অন্টারিও লিবারেল পার্টির নেতা নির্বাচিত হওয়ার মাত্র কয়েকদিন পর বনি ক্রম্বি ব্যক্তিগত ছুটিতে জ্যামাইকা গেলে পিসি পার্টির একজন ‘অপোজিশন রিসার্চার’কে তাঁর অবস্থানরত রিসোর্টে পাঠানো হয়। সংশ্লিষ্ট দুটি সূত্রই এই অভিযানের উদ্দেশ্যকে ক্রম্বির ওপর ‘গুপ্তচরবৃত্তি’ বা নজরদারি হিসেবে বর্ণনা করেছে।
রাজনীতির ভাষায় শব্দ বদলানো সহজ। কাউকে অনুসরণ করাকে ‘রিসার্চ’, ব্যক্তিগত জীবনের ওপর নজর রাখাকে ‘তথ্য সংগ্রহ’ আর দলের অর্থ খরচ করে বিদেশে লোক পাঠানোকে ‘রাজনৈতিক কৌশল’ বলা যেতে পারে। কিন্তু নাম বদলালেই কাজের চরিত্র বদলে যায় না। রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিপক্ষের বক্তব্য, নীতি, ভোটের রেকর্ড ও জনসমক্ষে কর্মকাণ্ড নিয়ে গবেষণা করে। একজন বিরোধী নেতা ব্যক্তিগত ছুটিতে বিদেশে গেলে তাঁর রিসোর্ট পর্যন্ত লোক পাঠানো সেই পরিচিত রাজনৈতিক গবেষণার সীমা ছাড়িয়ে যায়।
এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। বনি ক্রম্বির ব্যক্তিগত ছুটির ওপর নজর রাখার প্রয়োজন কেন হয়েছিল? সেখানে পাঠানো ব্যক্তির দায়িত্বই বা কী ছিল? তাঁর চলাফেরা, কার সঙ্গে দেখা করছেন, কীভাবে সময় কাটাচ্ছেন কিংবা রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারযোগ্য কোনো ছবি বা তথ্য সংগ্রহের নির্দেশ কি তাঁকে দেওয়া হয়েছিল?
ডাগ ফোর্ড বলছেন, তিনি পুরো ঘটনা সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। ঘটনার প্রায় তিন বছর পর বিষয়টি প্রথম তাঁর নজরে এসেছে। তিনি সিদ্ধান্তটির সঙ্গে একমত নন বলেও জানিয়েছেন। অথচ জ্যামাইকার ওই অভিযানে প্রায় ৩ হাজার ডলার খরচ হয়েছে তাঁর নেতৃত্বাধীন পিসি পার্টির তহবিল থেকে।
ফোর্ড শুধু অন্টারিওর প্রিমিয়ার নন, তিনি প্রগ্রেসিভ কনজারভেটিভ পার্টিরও নেতা। তাঁর দলের অর্থে সদ্য নির্বাচিত প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ব্যক্তিগত ছুটির ওপর নজর রাখতে একজনকে বিদেশে পাঠানো হলো, অথচ দলীয় প্রধান কিছুই জানতেন না, এই বক্তব্য দলের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ ব্যবস্থা নিয়েই নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
যদি ফোর্ড সত্যিই না জেনে থাকেন, তাহলে সিদ্ধান্তটি কে নিয়েছিলেন? জ্যামাইকা সফরের অনুমোদন কে দিয়েছিলেন? ৩ হাজার ডলারের খরচ কে অনুমোদন করেছিলেন? ওই ব্যক্তিকে কী ধরনের তথ্য সংগ্রহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল? এবং এটি কি একবারের ঘটনা, নাকি অন্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধেও একই ধরনের কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে?
ফোর্ডের প্রতিক্রিয়াও বিতর্ক কমানোর বদলে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ভবিষ্যতে একই ধরনের অভিযান আবার হতে পারে কি না জানতে চাইলে তাঁর উত্তর ছিল, ‘আমি আশা করি না।’ এরপর তিনি বলেন, নির্বাচনের সময় ‘নানা কিছু ঘটে’। আরেক প্রতিক্রিয়ায় ঘটনাটিকে ‘রাজনীতি’ বলে প্রায় ৩ হাজার ডলারের ব্যয়ের কথাও উল্লেখ করেন। একজন প্রিমিয়ারের কাছে প্রশ্নটি অবশ্য ‘আশা করি না’ পর্যায়ের নয়। তাঁর নেতৃত্বাধীন দলের কাজটি গ্রহণযোগ্য ছিল কি না এবং না হলে এর জন্য কে দায়ী, সেটিই আসল প্রশ্ন।
ঘটনার সময়কালও গুরুত্বপূর্ণ। বনি ক্রম্বি তখন সদ্য অন্টারিও লিবারেল পার্টির নেতৃত্বে এসেছেন এবং ফোর্ডের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছিলেন। এর পর থেকেই পিসি পার্টি তাঁকে ‘এলিট’ হিসেবে তুলে ধরতে আক্রমণাত্মক প্রচারণা চালায়। তাঁর জীবনযাপন ও ছুটি কাটানোর বিষয়ও সেই প্রচারণায় ব্যবহার করা হয়।
এই প্রেক্ষাপটে জ্যামাইকা সফরকে বিচ্ছিন্ন একটি দলীয় উদ্যোগ হিসেবে দেখা কঠিন। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, ক্রম্বির ব্যক্তিগত ছুটি থেকে এমন কোনো ছবি বা তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা হয়েছিল কি না, যা পরে তাঁকে সাধারণ মানুষের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন একজন ‘এলিট’ রাজনীতিক হিসেবে তুলে ধরতে ব্যবহার করা যেত।
এনডিপি নেতা মেরিট স্টাইলস ঘটনাটিকে ‘জঘন্য’ ও ‘ট্রাম্প-ধাঁচের রাজনীতি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি ফোর্ডের এই দাবি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন যে দলীয় নেতা হয়েও তিনি অভিযানের বিষয়ে কিছু জানতেন না। লিবারেল এমপিপি স্টেফানি স্মিথ বলেছেন, ঘটনাটি প্রচলিত রাজনৈতিক ‘অপোজিশন রিসার্চ’-এর সীমা ছাড়িয়েছে এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে।
বিতর্ককে শুধু বিরোধীদের রাজনৈতিক আক্রমণ বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগও কম। কারণ পিসি পার্টি অস্বীকার করছে না যে ক্রম্বির জ্যামাইকা সফরের সময় একজনকে সেখানে পাঠানো হয়েছিল এবং এর ব্যয় দলীয় তহবিল থেকে দেওয়া হয়েছিল। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, অভিযানের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল এবং এর নির্দেশ এসেছিল কোথা থেকে।
অর্থের প্রশ্নটিও উপেক্ষা করা যাচ্ছে না। Elections Ontario-এর হিসাবে ২০২৩ সালে প্রগ্রেসিভ কনজারভেটিভ পার্টি সরকারি ‘quarterly allowance’ হিসেবে মোট প্রায় ৫১ লাখ ৪৩ হাজার ডলার পেয়েছিল। জ্যামাইকা অভিযানের প্রায় ৩ হাজার ডলারের খরচও দেওয়া হয়েছে পিসি পার্টির দলীয় তহবিল থেকে। ফলে জনগণের অর্থে বড় অঙ্কের সরকারি ভর্তুকি পাওয়া একটি রাজনৈতিক দলের তহবিল কীভাবে এবং কোন ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হচ্ছে, সেই প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।
খরচের অঙ্ক বড় নয়। কিন্তু ঘটনাটির গুরুত্ব টাকার অঙ্কে নয়, রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে। একটি ক্ষমতাসীন দল যদি প্রতিপক্ষকে দুর্বল করতে তাঁর ব্যক্তিগত ছুটির ওপরও নজরদারি চালায়, তাহলে সেটি স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার সীমা ছাড়িয়ে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার পরিসরে প্রবেশ করে।
বনি ক্রম্বি এখন আর অন্টারিও লিবারেল পার্টির নেতা নন। তিনি বর্তমানে মিসিসাগার মেয়র নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। কিন্তু বিতর্কটি আর শুধু ক্রম্বিকে ঘিরে নেই। এর কেন্দ্রে এখন ফোর্ডের নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক আচরণ, দলীয় জবাবদিহি এবং প্রতিপক্ষকে মোকাবিলায় তারা কত দূর যেতে প্রস্তুত সেই প্রশ্ন।
ডাগ ফোর্ড বলতে পারেন তিনি জানতেন না। তাঁর দল ঘটনাটিকে ‘অপোজিশন রিসার্চ’ বলতে পারে। কিন্তু বিদেশে ব্যক্তিগত ছুটিতে থাকা একজন বিরোধী নেতার অবস্থানরত রিসোর্টে দলীয় লোক পাঠানোর ঘটনাকে শুধু রাজনৈতিক গবেষণা বলে শেষ করার সুযোগ নেই। কে নির্দেশ দিয়েছিল, কী খোঁজা হচ্ছিল এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, এসব প্রশ্নের পরিষ্কার উত্তর ফোর্ডের কনজারভেটিভ পার্টিকেই দিতে হবে।
জ্যামাইকার ঘটনাটি তাই অন্টারিওর রাজনীতিতে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, রাজনৈতিক শালীনতা এবং ক্ষমতাসীন দলের জবাবদিহি নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। আর সব প্রশ্ন ছাপিয়ে শেষ পর্যন্ত একটি প্রশ্নই সামনে থাকছে: রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে ডাগ ফোর্ডের কনজারভেটিভ পার্টি আসলে কত দূর যেতে প্রস্তুত?









