
আমেরিকার ভিসা হাতে থাকলেই এখন আর নিশ্চিন্ত থাকার সুযোগ নেই। সীমান্তে পৌঁছানোর আগেই কিংবা যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালে নতুন কোনো তথ্য সামনে এলে সেই ভিসা চলে যেতে পারে বাতিলের তালিকায়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে এমন ঘটনা আর বিচ্ছিন্ন নয়। ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে তাঁর প্রশাসন ইতিমধ্যে ১ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি বিদেশির ভিসা বাতিল করেছে। অপরাধ, জালিয়াতি, অভিবাসন আইন লঙ্ঘন, সহিংসতাকে সমর্থন কিংবা ভিসার অপব্যবহারসহ নানা অভিযোগকে সামনে রেখে এই অভিযান চালানো হচ্ছে। একই সঙ্গে নতুন আবেদনকারী, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী, পর্যটক ও বিভিন্ন শ্রেণির বিদেশি নাগরিকদের জন্যও একের পর এক কঠোর নিয়ম চালু করছে ওয়াশিংটন।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী, বাতিল হওয়া ভিসার বড় অংশের পেছনে রয়েছে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার নথিতে উঠে আসা অভিযোগ। হামলা, মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো, চুরি ও মাদক-সম্পর্কিত অপরাধ সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। এর বাইরে জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাৎ, যৌন অপরাধ, শিশু নির্যাতন, বেপরোয়া গাড়ি চালানো ও মানবপাচারের মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে। পররাষ্ট্র দপ্তর উদাহরণ দিয়ে বলেছে, শিক্ষকতার কাজ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এসে এক শিক্ষার্থীকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া একজন বিদেশির ভিসা বাতিল করা হয়েছে। একইভাবে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে কোটি কোটি ডলার হাতিয়ে নিতে আর্থিক তথ্য জাল করার অভিযোগে অভিযুক্ত আরেক ব্যক্তির ভিসাও বাতিল করা হয়েছে।
ভিসা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসন শুধু অপরাধ বা আদালতের মামলাই নয়, ব্যক্তির অনলাইন আচরণ ও প্রকাশ্য বক্তব্যকেও গুরুত্ব দিচ্ছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে রক্ষণশীল কর্মী চার্লি কার্ক নিহত হওয়ার পর তাঁর মৃত্যু নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উল্লাস বা সমর্থনসূচক মন্তব্য করেছিলেন এমন ছয় বিদেশি নাগরিকের ভিসা অক্টোবরে প্রত্যাহার করে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর। এ পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রে বিতর্কও তৈরি করে। একপক্ষের মতে, সহিংসতাকে প্রকাশ্যে সমর্থন করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যৌক্তিক। অন্যদিকে সমালোচকদের প্রশ্ন, এ ধরনের পদক্ষেপ মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সীমা নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে।
কঠোরতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো ‘বার্থ ট্যুরিজম’। এর মাধ্যমে এমন বিদেশিদের বোঝানো হয়, যারা পর্যটক বা অন্য অ-অভিবাসী ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে যান মূলত সেখানে সন্তান জন্ম দেওয়ার উদ্দেশ্যে, যাতে সন্তানটি জন্মসূত্রে মার্কিন নাগরিকত্ব পায়। মার্কিন কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, এটিকে ঘিরে বিভিন্ন দেশে ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কও গড়ে উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠান অর্থের বিনিময়ে আবেদনকারীদের ভিসা সাক্ষাৎকারে কী বলতে হবে তা শেখানো থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রে থাকার জায়গা এবং সন্তান প্রসবের ব্যবস্থাও করে দেয়। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, আফ্রিকা ও ইউরোপে এমন একাধিক নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। উত্তর আফ্রিকার একটি মার্কিন দূতাবাস একাই ‘বার্থ ট্যুরিজমের’ সঙ্গে যুক্ত ১০০টির বেশি ভিসা বাতিল করেছে।
জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করার বৃহত্তর প্রচেষ্টায় অবশ্য ট্রাম্প প্রশাসন আইনি বাধার মুখেও পড়েছে। গত ৩০ জুন মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ৬-৩ ভোটে রায় দেয়, যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে কিংবা সাময়িকভাবে অবস্থানরত বাবা-মায়ের সন্তানও সেখানে জন্ম নিলে সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনী অনুযায়ী জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের অধিকারী। এর ফলে ট্রাম্পের ২০২৫ সালের নির্বাহী আদেশের মূল অংশ কার্যত আটকে যায়। এরপর ৬ আগস্ট তিনি আরও দুটি নির্বাহী আদেশ জারি করেন। এর একটিতে সরাসরি ‘বার্থ ট্যুরিজম’ বন্ধে পররাষ্ট্র ও হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগকে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ভিসা বাতিলের বাইরে এখন আর্থিক জামানতও যুক্ত হচ্ছে নতুন নীতিতে। ৩ আগস্ট থেকে স্থায়ী হওয়া Visa Bond Program অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু দেশের B-1/B-2 ব্যবসা ও পর্যটন ভিসা আবেদনকারীদের ১০ হাজার, ১৫ হাজার বা সর্বোচ্চ ২০ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত জামানত দিতে হতে পারে। সাধারণভাবে ১৫ হাজার ডলার নির্ধারণের কথা বলা হলেও আবেদনকারীর পরিস্থিতি বিবেচনায় কনস্যুলার কর্মকর্তা তা ১০ হাজার বা ২০ হাজার ডলার নির্ধারণ করতে পারবেন।
এই কর্মসূচিও হঠাৎ করে আসেনি। ২০২৫ সালের আগস্টে প্রথমে ১২ মাসের পরীক্ষামূলক উদ্যোগ হিসেবে এটি চালু হয় এবং পর্যায়ক্রমে ৫০টি দেশের নাগরিককে এর আওতায় আনা হয়। ফেডারেল রেজিস্টারে প্রকাশিত পররাষ্ট্র দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ২০ হাজার ভিসা আবেদনের ক্ষেত্রে জামানত দেওয়ার শর্ত আরোপ করা হয়েছিল। তাঁদের প্রায় অর্ধেক শেষ পর্যন্ত জামানত জমা দেন। পররাষ্ট্র দপ্তরের দাবি, পরীক্ষামূলক কর্মসূচির প্রথম ১০ মাসে ওই ৫০টি দেশের ভিসাধারীদের নির্ধারিত সময়ের বেশি যুক্তরাষ্ট্রে থেকে যাওয়ার ঘটনা ৫০টির নিচে নেমে আসে। একই সময়ে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এসব দেশের B-1/B-2 ভিসা ইস্যু কমেছে ৮৩ শতাংশ।
সবচেয়ে আলোচিত পরিবর্তনগুলোর একটি আসছে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও এক্সচেঞ্জ ভিজিটরদের ক্ষেত্রে। ১৭ জুলাই প্রকাশিত চূড়ান্ত নিয়ম ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হবে। এতদিন F ও J শ্রেণির অনেক ভিসাধারী ‘duration of status’ ব্যবস্থায় পড়াশোনা, গবেষণা বা প্রশিক্ষণ চলাকালীন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করতে পারতেন। অর্থাৎ তাঁদের থাকার শেষ দিনটি আগে থেকেই নির্দিষ্ট করে দেওয়া হতো না; অনুমোদিত শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলার সঙ্গে তাঁদের বৈধ অবস্থানের মেয়াদ যুক্ত থাকত। নতুন নিয়মে সেই ব্যবস্থার বদলে নির্দিষ্ট মেয়াদ দেওয়া হবে।
সব মিলিয়ে ভিসা বাতিলের এই ব্যাপক অভিযান ট্রাম্প প্রশাসনের আরও কঠোর হয়ে ওঠা অভিবাসন ও ভিসা নীতির একটি বড় উদাহরণ। অপরাধের অভিযোগ থেকে ভিসার অপব্যবহার, অতিরিক্ত সময় অবস্থান থেকে বার্থ ট্যুরিজম, এমনকি শিক্ষার্থী ভিসার মেয়াদ পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রেই নিয়মের বেড়াজাল শক্ত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পাওয়া যেমন কঠিন হচ্ছে তেমনি ভিসা পাওয়ার পরও তা ধরে রাখা এখন কঠোর নজরদারির আওতায়।
তথ্যসূত্র:
U.S. Department of State
Reuters









