সম্পাদকের পাতা

যৌন নিপীড়ন ও শ্রমশোষণের দায়ে কানাডায় দুই বাংলাদেশি রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী দোষী

নজরুল মিন্টো

কানাডায় এসে নতুন জীবন শুরু করার স্বপ্ন ছিল তাঁর। উচ্চশিক্ষিত, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন চাকরির অভিজ্ঞতাও ছিল। কিন্তু পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের একটি দেশে এসে কাজের সন্ধান করতে গিয়ে সেই স্বপ্নই একসময় পরিণত হয় দুঃস্বপ্নে। রেস্তোরাঁয় দিনের পর দিন দীর্ঘ সময় কাজ, বেতন না পাওয়া, চলাফেরায় নিয়ন্ত্রণ, অভিবাসন পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে চাপ সৃষ্টি এবং শেষ পর্যন্ত যৌন নিপীড়ন, সব মিলিয়ে এক বাংলাদেশি নারীর জীবন ক্রমেই দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। প্রায় চার বছর পর সেই ঘটনার বিচার শেষে কানাডার আদালত দুই বাংলাদেশি রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীকে দোষী সাব্যস্ত করেছেন।

ঘটনার শুরু কানাডার প্রেইরি-প্রধান সাসকাচুয়ান প্রদেশের গুল লেক-এ। দোষী সাব্যস্ত দুই ব্যক্তি হলেন ৫৫ বছর বয়সী সোহেল হায়দার এবং ৪৪ বছর বয়সী মোহাম্মদ মাসুম। গত ৭ আগস্ট সাসকাটুনের প্রাদেশিক আদালতের বিচারক মিগেল মার্টিনেজ তাঁদের বিরুদ্ধে রায় দেন। সোহেলকে মানবপাচারের একটি অভিযোগে এবং মাসুমকে মানবপাচারের পাশাপাশি তিনটি যৌন নিপীড়নের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। রায়ের পর দুজনকেই হেফাজতে নেওয়া হয়। ১৪ আগস্ট তাঁদের সাজা নির্ধারণ-সংক্রান্ত পরবর্তী শুনানি হওয়ার কথা।

আদালতে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার শিকার নারী ২০২২ সালের আগস্টে ভিজিটর ভিসায় বাংলাদেশ থেকে টরন্টোয় আসেন। কানাডায় বৈধভাবে থেকে কাজ করার সুযোগও খুঁজছিলেন তিনি। একপর্যায়ে একটি চাকরির বিজ্ঞাপনের সূত্র ধরে সোহেল হায়দারের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়। সোহেল সাসকাচুয়ানের Gull Lake-এ তাঁর পরিচালিত Empire Diner-এ কাজের প্রস্তাব দেন। টরন্টো থেকে প্রথমে রেজাইনা এবং সেখান থেকে তাঁকে Gull Lake-এ নিয়ে যাওয়া হয়।

সাসকাটুন থেকে সড়কপথে প্রায় ৩৩০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমের ছোট একটি শহর Gull Lake। সেখানে পৌঁছানোর পর ওই নারীর জীবনের চিত্র দ্রুত বদলে যেতে থাকে। আদালতে উঠে এসেছে, তিনি মূলত রেস্তোরাঁর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করতেন, দিনে প্রায় ১২ ঘণ্টা, সপ্তাহে ছয় দিন। দুপুরের খাবারের জন্য বিরতি ছিল মাত্র আধঘণ্টা। থাকার জন্য প্রথমে তাঁকে একটি এয়ার ম্যাট্রেস দেওয়া হয়, পরে মেঝেতে ফোমের গদি। অথচ Gull Lake-এ করা কাজের জন্য সোহেল তাঁকে কোনো বেতন দেননি বলে আদালতে প্রমাণিত হয়েছে।

কাজের অনুমতিপত্র নিয়েও তাঁর ওপর চাপ তৈরি হয়েছিল। আদালতে ওই নারী জানান, প্রথমে তাঁকে বলা হয়েছিল কাজের অনুমতিপত্র পেতে কুড়ি হাজার ডলার লাগবে। পরে সেই অঙ্ক কমিয়ে ১০ থেকে ১২ হাজার ডলার করা হয় এবং প্রতি মাসে এক হাজার ডলার করে পরিশোধের কথা বলা হয়। এর মধ্যেই ২০২২ সালের নভেম্বরে হঠাৎ তাঁকে Gull Lake থেকে সরিয়ে উত্তর-পূর্ব সাসকাচুয়ানের ছোট শহর Tisdale-এ নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মোহাম্মদ মাসুমের Little Town Restaurant-এ তাঁর কাজ শুরু হয়। Tisdale উত্তর-পূর্ব সাসকাচুয়ানের একটি আঞ্চলিক কেন্দ্র এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবেও পরিচিত।

এরপর তাঁর নামে নির্দিষ্ট নিয়োগকর্তার অধীনে কাজের একটি অনুমতিপত্র হয়। সেই অনুমতিপত্র ছিল Bob’s Diner-এর জন্য, যার অবস্থান Elrose শহরে। Elrose সাসকাটুন থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে একটি ছোট কৃষিনির্ভর শহর। কয়েক মাসের ব্যবধানে ওই নারী Gull Lake, Tisdale এবং Elrose, সাসকাচুয়ানের তিনটি ছোট শহরের এক রেস্তোরাঁ থেকে আরেক রেস্তোরাঁয় ঘুরতে থাকেন।

Elrose-এ তাঁর থাকার অবস্থাও ছিল শোচনীয়। আদালতে বলা হয়েছে, তাঁকে একটি অসমাপ্ত বেসমেন্টে রাখা হয়েছিল। মেঝে ছিল কংক্রিটের, বাথরুম ছিল নোংরা এবং সেখানে দরজাও ছিল না। বাড়িতে পর্যাপ্ত খাবার বা বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থাও ছিল না।

মামলার সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলো ছিল মোহাম্মদ মাসুমের বিরুদ্ধে। ওই নারী আদালতে জানান, ২০২২ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে মাসুম তাঁকে একাধিকবার যৌন নিপীড়ন করেন। একপর্যায়ে তাঁর পাসপোর্ট নিয়ে প্রায় এক সপ্তাহ নিজের কাছে রাখেন এবং যৌন সম্পর্কে রাজি না হলে তা ফেরত না দেওয়ার হুমকি দেন। মাসুম এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ শুনানি শেষে বিচারক নারীর সাক্ষ্যকে বিশ্বাসযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য বলে গ্রহণ করেন এবং মাসুমকে তিনটি যৌন নিপীড়নের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করেন।

সাসকাচুয়ানের Cypress Hills আসনের প্রাদেশিক আইনসভার সদস্য ডগ স্টিল নিয়মিত Gull Lake-এর Empire Diner-এ যেতেন। সেখানে কাজ করতে থাকা ওই নারীকে দেখে একসময় তাঁর সন্দেহ হয়, নিয়োগকর্তা ও কর্মচারীর এই সম্পর্কের মধ্যে যেন কিছু একটা ঠিক নেই। পরে নারীটিকে হঠাৎ এক শহর থেকে আরেক শহরে সরিয়ে নেওয়া হতে থাকে; কখনও কয়েক দিন তাঁর অবস্থানও জানা যাচ্ছিল না। স্টিলের উদ্বেগ তখন আরও বাড়ে। একসময় কথা প্রসঙ্গে তিনি বিষয়টি তৎকালীন আরেক আইনসভার সদস্য হিউ নার্লিয়েনের সঙ্গে আলাপ করেন। পরে নার্লিয়েন Tisdale-এর Little Town Restaurant-এ গিয়ে গোপনে ওই নারীকে নবাগত অভিবাসীদের সহায়তাকারী একজন কর্মীর যোগাযোগের তথ্য দেন। সেই সূত্র ধরেই তাঁর পরিস্থিতির বিস্তারিত বাইরে আসতে শুরু করে।

২০২৩ সালের মার্চে তাঁকে Elrose-এ নিয়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত সহায়তাকারী কর্মী এবং ডগ স্টিলের নির্বাচনী এলাকার একজন সহকারীর উদ্যোগে ২৩ মার্চ তাঁকে ওই বাড়ি থেকে বের করে Swift Current-এর একটি নারী আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁকে নতুন মোবাইল ফোন ও নম্বর দেওয়া, ব্যাংক হিসাবের পাসওয়ার্ড পরিবর্তন, স্বাস্থ্য কার্ড এবং নতুন কাজের অনুমতিপত্র পেতে সহায়তা করা হয়। তাঁর কাছ থেকে ঘটনার বিস্তারিত জানার পর বিষয়টি স্থানীয় আরসিএমপি (Royal Canadian Mounted Police)-কে জানানো হয়। তদন্ত শেষে ২০২৩ সালের ২৯ জুন সোহেল ও মাসুমকে গ্রেপ্তার করা হয়।

বিচারের সময় দুই আসামিই নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন। সোহেল হায়দারের বক্তব্য ছিল, ওই নারী তাঁর Gull Lake-এর রেস্তোরাঁয় কাজই করেননি; তিনি কেবল তাঁকে সাহায্য করার চেষ্টা করেছিলেন। মাসুমও দাবি করেন, নারীটি তাঁর অতিথি ছিলেন, কর্মচারী নন। যৌন নিপীড়নের অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন। আসামিপক্ষের আইনজীবীরা নারীর সাক্ষ্যের বিভিন্ন অসঙ্গতি তুলে ধরে তাঁর বক্তব্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। সাক্ষ্য, জেরা ও অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করে বিচারক দুই ব্যক্তির বক্তব্যই প্রত্যাখ্যান করেন। আদালতের পর্যবেক্ষণে, দীর্ঘ জেরার মধ্যেও ওই নারীর ঘটনার মূল বর্ণনা অটুট ছিল।

এই রায়ের একটি বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। কানাডার ফৌজদারি আইনের ২৭৯.০১ ধারায় শোষণের উদ্দেশ্যে কাউকে নিয়োগ, স্থানান্তর, আশ্রয় দেওয়া কিংবা তাঁর চলাফেরার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা মানবপাচারের অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। এ ধারায় সাধারণ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১৪ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। আর অপরাধ সংঘটনের সময় শারীরিক হামলা, যৌন হামলা কিংবা মৃত্যু ঘটলে সর্বোচ্চ সাজা যাবজ্জীবন পর্যন্ত হতে পারে। এ মামলায় আদালত বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন শ্রমশোষণ, নিয়ন্ত্রণ এবং একজন নতুন অভিবাসীর অসহায় পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়ার বিষয়টিকে।

সাসকাচুয়ানের এই ঘটনা তাই শুধু দুই রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীর অপরাধের গল্প নয়। এটি দেখিয়েছে, বিদেশে নতুন আসা একজন মানুষের চাকরি, বাসস্থান, পাসপোর্ট এবং অভিবাসন-ভবিষ্যৎ যখন কোনো ব্যক্তি বা কোনো একটি গোষ্ঠীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন সেই নির্ভরতা কত সহজে শোষণের অস্ত্রে পরিণত হতে পারে। একই ভাষা ও একই দেশের মানুষের কাছে সাহায্যের প্রত্যাশা যে সবসময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না, এই মামলার ঘটনাপ্রবাহ তারও কঠিন উদাহরণ। এখন ১৪ আগস্টের সাজা ঘোষণায় আদালত দুই দোষী ব্যক্তির জন্য কী শাস্তি নির্ধারণ করেন, সেদিকেই সকলের নজর।

দেশে বিদেশের পক্ষ থেকে সতর্কবার্তা
আমাদের কাছে প্রায়ই অভিযোগ আসে, বিভিন্ন গ্রোসারি দোকান, রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে নতুন আসা লোকজনকে দীর্ঘ সময় কাজ করিয়েও উপযুক্ত পারিশ্রমিক দেওয়া হয় না। কোথাও কোথাও নানা অজুহাতে মজুরি আটকে রাখার অভিযোগও পাওয়া যায়। স্বজাতির মানুষের কাছ থেকে এমন আচরণ আমরা আশা করি না। কারও বিরুদ্ধে এ ধরনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে এবং তার পক্ষে প্রয়োজনীয় সাক্ষ্যপ্রমাণ থাকলে আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করব। অভিযোগের সত্যতা প্রতিষ্ঠার মতো তথ্য পাওয়া গেলে তা জনস্বার্থে তুলে ধরব এবং প্রয়োজন হলে যথাযথ কর্তৃপক্ষের নজরেও আনব। নতুন আসা মানুষ যেন তাঁর অসহায়ত্বের কারণে কারও শোষণের শিকার না হন, সে জন্য কমিউনিটির সবার সহযোগিতা কামনা করছি।

তথ্যসূত্র:
CBC News
SaskToday / 620 CKRM
Department of Justice Canada


Back to top button
🌐 Read in Your Language