সম্পাদকের পাতা

সেপ্টেম্বরে টরন্টোয় বিশ্বের শীর্ষ বিনিয়োগকারীদের মহাসমাবেশ

নজরুল মিন্টো

একটি দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ সাধারণত এক দিনে বদলে যায় না। নতুন কারখানা গড়ে ওঠে বছরের পর বছর ধরে, বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নেও লাগে দীর্ঘ সময়। কিন্তু কখনও কখনও এমন একটি দিন আসে, যখন ভবিষ্যতের অনেক সিদ্ধান্তের বীজ একসঙ্গে বোনা হয়। আগামী ১৪ ও ১৫ সেপ্টেম্বর টরন্টোয় তেমনই এক বিরল মুহূর্তের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে কানাডা।

প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে Canada Investment Summit। মূল আয়োজনের সময় প্রায় ২৪ ঘণ্টা। সেই অল্প সময়ের জন্য টরন্টোয় জড়ো হওয়ার কথা বিশ্বের প্রায় ১০০টি বড় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের। ২৮টি দেশের এসব প্রতিষ্ঠান সম্মিলিতভাবে প্রায় ১২০ ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদ পরিচালনা করে। অর্থাৎ বিশ্বের কোন দেশ, কোন শিল্প কিংবা কোন প্রকল্পে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ হবে, সেই সিদ্ধান্তে প্রভাব রাখেন এমন অনেক মানুষ সেদিন একই ছাদের নিচে থাকবেন।

প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এবং কানাডার দুটি বড় পেনশন তহবিল এই আয়োজনের নেতৃত্বে রয়েছে। প্রায় ২৫০ জন অতিথির বেশির ভাগই হবেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। অর্থ ও বিনিয়োগ জগতের এমন সমাবেশ সাধারণত সুইজারল্যান্ডের দাভোস কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসের বড় আন্তর্জাতিক সম্মেলনগুলোতে দেখা যায়। এবার তাঁদের গন্তব্য টরন্টো।

আমন্ত্রিতদের তালিকাই বলে দেয় আয়োজনটিকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। Blackstone-এর প্রেসিডেন্ট জোনাথন গ্রে এবং BlackRock-এর চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী ল্যারি ফিঙ্ক উপস্থিত থাকার কথা। Berkshire Hathaway ও JPMorgan Chase-এর উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিরাও থাকবেন। মধ্যপ্রাচ্যের Saudi Arabia Public Investment Fund, Abu Dhabi Investment Authority ও Qatar Investment Authority-এর মতো বড় রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ তহবিলের কর্মকর্তাদেরও যোগ দেওয়ার কথা। এশিয়া থেকে আসবেন সিঙ্গাপুরের Temasek এবং জাপানের কয়েকটি বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নেতারা।

কানাডার পক্ষ থেকে থাকবেন দেশের বড় পেনশন তহবিল, ছয়টি প্রধান ব্যাংক, বীমা প্রতিষ্ঠান এবং জ্বালানি, প্রযুক্তি ও খনি খাতের শীর্ষ কর্মকর্তারা। যোগ দেওয়ার কথা কয়েকজন প্রাদেশিক প্রিমিয়ারেরও। সব মিলিয়ে ২৪ ঘণ্টার জন্য টরন্টো হয়ে উঠবে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ জগতের কেন্দ্রবিন্দু।

কানাডার কাছে এই আয়োজনের গুরুত্ব শুধু অতিথিদের পরিচয়ে নয়। দেশটি আগামী বছরগুলোতে বড় অঙ্কের নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে চায়। ফেডারেল সরকার আগামী পাঁচ বছরে বেসরকারি খাত থেকে ৫০০ বিলিয়ন ডলার নতুন বিনিয়োগ আনার লক্ষ্য নিয়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানি, পরিবহন, খনিজ, প্রতিরক্ষা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্প দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার কথাও বলা হচ্ছে। বিশ্বের বড় বিনিয়োগকারীরা যখন কানাডার দিকে তাকাচ্ছেন, তখন দেশটির সামনে নিজের বিনিয়োগ সম্ভাবনা ও নতুন প্রকল্পগুলো তুলে ধরার বড় সুযোগ এসেছে।

এই আগ্রহের পেছনে আন্তর্জাতিক রাজনীতিরও বড় ভূমিকা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতি বিশ্ববাজারে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য উত্তেজনা চলছে, পাশাপাশি উত্তর আমেরিকার মুক্তবাণিজ্য ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়েও আলোচনা চলছে।

এই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী কার্নি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে বড় বিনিয়োগকারীরাও কোথায় অর্থ রাখলে দীর্ঘ মেয়াদে নিরাপদ ও লাভজনক হবে, তা নতুন করে হিসাব করছেন। দুই দিকের এই পরিবর্তন কানাডার সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ এনে দিয়েছে।

Canada Pension Plan Investment Board বা CPPIB-এর প্রধান নির্বাহী জন গ্রাহামের বক্তব্যেও সেই সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। তাঁর মতে, বিশ্বের বড় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কানাডাকে নিয়ে আগ্রহ রয়েছে এবং সেই আগ্রহকে বাস্তব বিনিয়োগে রূপ দেওয়ার এখন ভালো সময়। গ্রাহাম যে CPPIB পরিচালনা করেন, তার হাতে রয়েছে প্রায় ৭৯৩ বিলিয়ন ডলারের পেনশন সম্পদ। তিনি এই সম্মেলনের অন্যতম উদ্যোক্তা। তাঁর সঙ্গে সহ-আয়োজক হিসেবে রয়েছেন ৩২১ বিলিয়ন ডলারের PSP Investments-এর প্রধান নির্বাহী Deborah Orida এবং প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি।

কানাডার বড় পেনশন তহবিলগুলোর হাতে সম্মিলিতভাবে প্রায় ২.৬ ট্রিলিয়ন ডলার রয়েছে। সরকার ও ব্যবসায়ী মহলের একটি অংশ চাইছে, দেশের ভেতরে বিনিয়োগের উপযোগী ভালো প্রকল্প গড়ে তুলে এই বিপুল অর্থের একটি বড় অংশ কানাডাতেই বিনিয়োগ করা হোক।

১৪ সেপ্টেম্বর নৈশভোজ দিয়ে সম্মেলনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। পরদিন থাকবে মূল অধিবেশন, বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা এবং ছোট ছোট বৈঠক। অনেক আলোচনাই হবে বন্ধ দরজার ভেতরে। সম্ভাব্য বিনিয়োগের সুযোগ ও প্রকল্প নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত ‘ডিল বুক’ও তৈরি করা হচ্ছে, যাতে আগ্রহী বিনিয়োগকারীরা কানাডায় কোথায় অর্থ লাগানোর সুযোগ রয়েছে তার একটি ধারণা পান।

সম্মেলনের দিনই কয়েকটি বড় বিনিয়োগ ঘোষণা আসতে পারে। তবে আয়োজকেরা এটিকে মূল সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে দেখছেন না। তাঁদের লক্ষ্য, বিশ্বের বড় প্রতিষ্ঠানগুলো টরন্টো থেকে ফিরে কানাডার প্রকল্পগুলো আরও গভীরভাবে যাচাই করুক, স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াক এবং ধীরে ধীরে বড় অঙ্কের বিনিয়োগে এগিয়ে আসুক।

এই কারণেই আয়োজনটি ইচ্ছাকৃতভাবে ছোট এবং আমন্ত্রণনির্ভর রাখা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী কার্নির চিঠিতে প্রথমে প্রায় ১০০ জন আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। খবর প্রকাশ হওয়ার পর আরও অনেক বড় প্রতিষ্ঠান অংশ নিতে আগ্রহী হয়। কিন্তু তাদের অনেকেরই জায়গা হয়নি।

আগামী সেপ্টেম্বরের সেই ২৪ ঘণ্টায় কানাডায় ১২০ ট্রিলিয়ন ডলার এক ঝলকে এসে পড়বে না ঠিকই। কিন্তু এত বিপুল অর্থের বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত যাঁদের হাতে, তাঁরা যখন টরন্টোয় কানাডার কথা শুনতে আসছেন, তখন দেশটির সামনে একটি বিরল সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মনে করতে হবে। ভালো প্রকল্প, দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং অনুকূল পরিবেশ দেখাতে পারলে এই সম্মেলন কানাডার অর্থনীতিতে বড় অঙ্কের নতুন বিনিয়োগের দরজা খুলে দিতে পারে।

তথ্যসূত্র:
The Globe and Mail
Prime Minister’s Office of Canada
CPP Investments


Back to top button