সম্পাদকের পাতা

যুক্তরাজ্যের এসেক্সে সাত বছরের শিশুকে বাঁচাতে গিয়ে মা ও মেয়ের মৃত্যু

নজরুল মিন্টো

সমুদ্রের সৌন্দর্য মানুষকে টানে। নীল জলরাশি, লোনা বাতাস আর দিগন্তজোড়া সৈকত যেন কিছু সময়ের জন্য জীবনের সব ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয়। কিন্তু সেই সমুদ্রই কখনও কখনও হয়ে ওঠে নির্মম। হঠাৎ বদলে যাওয়া জোয়ার আর অপ্রত্যাশিত স্রোত মুহূর্তেই একটি পরিবারের সুখ-স্বপ্নকে পরিণত করতে পারে গভীর শোকে।

ইংল্যান্ডের এসেক্সের ওয়েস্ট মার্সি সমুদ্রসৈকতে তেমনই এক হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে। পানিতে আটকে পড়া সাত বছরের এক শিশুকে বাঁচাতে এগিয়ে গিয়েছিলেন এক মা ও তাঁর কিশোরী মেয়ে। শিশুটিকে উদ্ধারের সেই প্রাণান্তকর চেষ্টায় শেষ পর্যন্ত তাঁরাও আর তীরে ফিরতে পারেননি।

নিহতরা হলেন ৪২ বছর বয়সী সেলিনা রহমান এবং তাঁর ১৫ বছর বয়সী মেয়ে সামিহা রহমান। তাঁরা পূর্ব লন্ডনের ইলফোর্ডে বসবাস করতেন। তাঁদের পারিবারিক শিকড় বাংলাদেশের সিলেট জেলার দক্ষিণ সুরমা উপজেলায়।

বুধবার (২২ জুলাই) স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা ৩৫ মিনিটের দিকে এসেক্সের ওয়েস্ট মার্সির সিভিউ অ্যাভিনিউ সংলগ্ন সৈকত থেকে জরুরি সেবায় ফোন আসে। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায় কোস্টগার্ড, রয়্যাল ন্যাশনাল লাইফবোট ইনস্টিটিউট, এয়ার অ্যাম্বুলেন্স, অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস, ফায়ার অ্যান্ড রেসকিউ এবং এসেক্স পুলিশ। শুরু হয় ব্যাপক উদ্ধার অভিযান।

পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, পরিবারের সদস্যরা সৈকতের অগভীর পানিতে অবস্থান করার সময় সাত বছরের শিশুটি স্রোতের মধ্যে আটকে পড়ে। তাকে উদ্ধারের জন্য এক মুহূর্ত দেরি না করে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়েন সেলিনা ও সামিহা। কিন্তু দ্রুত বাড়তে থাকা জোয়ার ও প্রবল স্রোত মুহূর্তেই পরিস্থিতি পাল্টে দেয়। তাঁরা নিজেরাও পানিতে আটকা পড়েন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, স্রোত এতটাই তীব্র ছিল যে তীরে থাকা কয়েকজন মানুষ এগিয়ে গেলেও তাঁদের কাছে পৌঁছাতে পারেননি।

উদ্ধারকারী দল ও ঘটনাস্থলে উপস্থিত মানুষের দীর্ঘ চেষ্টার পর তাঁদের পানি থেকে তুলে আনা হয়। জরুরি চিকিৎসা দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকেরা মা ও মেয়েকে মৃত ঘোষণা করেন।

এ ঘটনায় আরও তিনজনকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে সাত বছর বয়সী শিশুটির অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাকে রয়্যাল লন্ডন হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে রাখা হয়েছে। অন্য দুজনও চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

বাবা ড. মনসুর রহমানের সাথে তাঁর কিশোরী কন্যা সামিহা

স্ত্রী ও কিশোরী মেয়েকে হারানো ড. মনসুর রহমানের এ শোক ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। পরিবারের পক্ষ থেকে সামিহার চাচা শেখ মঞ্জুর রহমান জানান, পানিতে আটকে পড়া শিশুটি ছিল সামিহার খালাতো ভাই। তিনি বলেন, শিশুটিকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে গিয়েই সেলিনা ও সামিহা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেন।

জানা গেছে, সেলিনা রহমান পেশায় একজন শিক্ষক ছিলেন। সহকর্মী ও পরিচিতজনদের কাছে তিনি ছিলেন স্নেহশীল, দায়িত্বশীল ও পরোপকারী একজন মানুষ। অন্যদিকে সামিহা ছিল প্রাণবন্ত ও মেধাবী এক কিশোরী। পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে তার সামনে পড়ে ছিল দীর্ঘ পথ। কিন্তু আপনজনকে উদ্ধারের চেষ্টাই শেষ পর্যন্ত মা ও মেয়ের জীবনের শেষ অধ্যায় হয়ে দাঁড়াল।

সামিহার দাদা মখন মিয়া স্থানীয় ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ছিলেন। তাঁর নানা মুজিবুর রহমান যুক্তরাজ্য বিএনপির সাবেক সহসভাপতি। মর্মান্তিক এ ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশে তাঁদের আত্মীয়স্বজন, বন্ধু ও পরিচিতদের মধ্যে গভীর শোক নেমে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অসংখ্য মানুষ তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে শোক প্রকাশ করছেন।

ঘটনাস্থল ওয়েস্ট মার্সি সমুদ্রসৈকতেও সেলিনা রহমান ও সামিহার স্মরণে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সেখানে আসা মানুষেরা। বালুর ওপর ফুলের তোড়া ও ছোট ছোট স্মারক রেখে গেছেন অনেকে। একটি সূর্যমুখীর তোড়ার সঙ্গে রাখা চিরকুটে লেখা ছিল, ‘এক সাহসী মা এবং এক নির্ভীক তরুণীর জন্য। শান্তিতে থাকুন। আপনাদের পরিবারের প্রতি ভালোবাসা ও সমবেদনা।’

এসেক্স পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চলছে। কীভাবে শিশুটি স্রোতে পড়ে গেল এবং ঠিক কোন পরিস্থিতিতে মা ও মেয়ে পানিতে আটকা পড়লেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পুলিশ প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকেও তথ্য সংগ্রহ করছে।

সমুদ্র বিশেষজ্ঞরা প্রায়ই সতর্ক করে থাকেন, জোয়ার-ভাটার সময় সমুদ্রের স্রোত বাইরে থেকে শান্ত মনে হলেও কয়েক মুহূর্তের মধ্যে তা অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে বালুচর বা অগভীর জলরাশি দ্রুত গভীর হয়ে গেলে অনভিজ্ঞ মানুষের পক্ষে নিরাপদে তীরে ফিরে আসা কঠিন হয়ে পড়ে। প্রতি বছর যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন সমুদ্রসৈকতে এমন দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।

এই ঘটনার সবচেয়ে মর্মস্পর্শী দিকটি মা ও মেয়ের শেষ চেষ্টার মধ্যে নিহিত। বিপদের মুহূর্তে সেলিনা কিংবা সামিহা কেউ নিজের নিরাপত্তার কথা আগে ভাবেননি। তাঁদের সমস্ত মনোযোগ ছিল পানিতে আটকে পড়া শিশুটিকে উদ্ধারের দিকে। হয়তো তাঁরা বিশ্বাস করেছিলেন, সবাই মিলে তীরে ফিরে আসবেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে তা আর হয়নি। একটি পরিবারের দুই প্রজন্মের দুই নারী একই সঙ্গে হারিয়ে গেলেন। রেখে গেলেন সাহস, ভালোবাসা আর আত্মত্যাগের এমন একটি গল্প, যা মানুষের হৃদয়ে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবে।

এনএন/ ২৪ জুলাই ২০২৬


Back to top button