
এবারের বিশ্বকাপে কয়েকটি ম্যাচের মধ্যেই তিনি হয়ে উঠলেন সবচেয়ে আলোচিত মুখগুলোর একজন। তাঁর দৌড় শুরু হলেই গ্যালারিতে প্রত্যাশা বাড়ে, বল তাঁর পায়ে গেলে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে ছড়িয়ে পড়ে অস্থিরতা। অল্প সময়ের মধ্যেই প্রতিপক্ষের কাছে আতঙ্কের নাম হয়ে ওঠেন নরওয়ের আর্লিং হালান্ড।
তাঁর উচ্চতা, শক্তি ও গতি প্রথম দেখাতেই চোখে পড়ে। তবে হালান্ডের সবচেয়ে বড় শক্তি গোলের জায়গাটি অন্যদের আগে চিনে নেওয়া। বল কোথা দিয়ে আসবে, ডিফেন্ডার কখন ঘুরবেন এবং কখন দৌড় শুরু করলে তাঁকে আর ধরা যাবে না, এসব যেন তিনি কয়েক সেকেন্ড আগেই বুঝে ফেলেন। তাই তাঁকে সামলাতে গিয়ে প্রতিপক্ষকে সারাক্ষণ সতর্ক থাকতে হয়।
ব্রাজিলের বিপক্ষে হালান্ডের ভয়ংকর রূপটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের রক্ষণভাগ তাঁকে ঘিরে পরিকল্পনা সাজিয়েছিল, তবু শেষ পর্যন্ত থামাতে পারেনি। সামান্য ফাঁকা জায়গা, কয়েক পা দৌড় এবং নিখুঁত সমাপ্তিতে দুটি গোল করে তিনি ব্রাজিলকে এবারের আসর থেকে বিদায় করে দেন। সেই ম্যাচের পর হালান্ডকে নিয়েই শুরু হয় বিশ্বকাপের সবচেয়ে বেশি আলোচনা।
এবারের বিশ্বকাপে চার ম্যাচে সাত গোল করেছেন হালান্ড। আইভরি কোস্টের বিপক্ষে শেষ বত্রিশের ম্যাচে তাঁর শেষ মুহূর্তের গোল নরওয়ের জয় নিশ্চিত করেছিল। এরপর ব্রাজিলের বিপক্ষে দুটি গোল করে দেশকে পৌঁছে দিয়েছেন ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালে। ২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফেরা নরওয়ের সামনে এখন ইংল্যান্ড। আর ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, হালান্ডকে থামানো যাবে কীভাবে?
ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডারদের কাছে হালান্ড অপরিচিত নন। মানচেস্টার সিটির হয়ে প্রিমিয়ার লিগে নিয়মিতই তাঁকে সামলাতে হয় তাঁদের। তাঁরা জানেন, দীর্ঘ সময় বলের বাইরে থাকলেও হালান্ডকে নিয়ে নিশ্চিন্ত হওয়ার সুযোগ নেই। হঠাৎ একটি দৌড়েই তিনি রক্ষণভাগের পেছনে চলে যেতে পারেন, আর তাঁর সামনে গোলপোস্ট থাকলে পরের দৃশ্যটি প্রায়ই অনুমান করা যায়।
এ কারণেই হালান্ড শুধু একজন গোলদাতা নন, তাঁকে ঘিরে প্রতিপক্ষকে পুরো পরিকল্পনা বদলাতে হয়। একজন ডিফেন্ডার দিয়ে তাঁকে পাহারা দেওয়া কঠিন। দুজন এগিয়ে এলে অন্যদের জন্য জায়গা তৈরি হয়। একটু পেছনে দাঁড়ালে তিনি গতিতে বেরিয়ে যান, কাছ থেকে বাধা দিলে শক্তি দিয়ে টিকে থাকেন। আর উঁচু বল এলে তাঁর উচ্চতা ও লাফ বাড়তি সুবিধা এনে দেয়।
২০০০ সালের ২১ জুলাই ইংল্যান্ডের লিডসে জন্ম নেন আর্লিং ব্রাউট হালান্ড। তাঁর বাবা আলফ ইঙ্গে হালান্ড তখন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে খেলতেন। তিন বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে নরওয়েতে ফিরে যান আর্লিং। ছোট শহর ব্রাইনেই তাঁর বেড়ে ওঠা এবং ফুটবলের সঙ্গে প্রথম পরিচয়। জন্ম ইংল্যান্ডে হলেও তিনি বেছে নিয়েছেন বাবার দেশ নরওয়েকে। আজ সেই ইংল্যান্ডই দাঁড়িয়ে আছে তাঁর এবং নরওয়ের বিশ্বকাপ স্বপ্নের মাঝখানে।
নরওয়ের ছোট শহরের ক্লাব Bryne FK-এর বয়সভিত্তিক দল থেকে হালান্ডের যাত্রা শুরু। এরপর দেশের শীর্ষ পর্যায়ের ক্লাব Molde FK-তে তাঁর প্রতিভা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০১৮ সালে নরওয়ের শক্তিশালী ক্লাব Brann-এর বিপক্ষে প্রথম ২১ মিনিটেই চার গোল করে তিনি বুঝিয়ে দেন, নরওয়ের ঘরোয়া ফুটবলের সীমানায় তাঁকে আর বেশিদিন আটকে রাখা যাবে না।
সেখান থেকে তিনি পাড়ি জমান অস্ট্রিয়ার শীর্ষ ক্লাব Red Bull Salzburg-এ। ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোর নজরে আসতে তাঁর বেশি সময় লাগেনি। Champions League অভিষেকেই করেন হ্যাটট্রিক। এরপর জার্মানির Borussia Dortmund ঘুরে ২০২২ সালে পৌঁছে যান ইংল্যান্ডের শীর্ষ ক্লাব Manchester City-তে।
সেখানেই হালান্ড নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন বিশ্ব ফুটবলের প্রথম সারির স্ট্রাইকার হিসেবে। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে নিজের প্রথম মৌসুমেই ৩৬ গোল করে ভেঙে দেন এক মৌসুমে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড।
ক্লাব ফুটবলে এত সাফল্যের পরও বিশ্বকাপের মঞ্চে হালান্ডকে আগে দেখা যায়নি। নরওয়ে ১৯৯৮ সালের পর বিশ্বকাপে উঠতে পারেনি। ২০২৬ সালে সেই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হয়। আর প্রথম বিশ্বকাপেই গোলের পর গোল করে হালান্ড হয়ে ওঠেন এবারের আসরের অন্যতম প্রধান চরিত্র।
নরওয়ের বিশ্বকাপ যাত্রা কোথায় গিয়ে থামবে, সেটি আজকের ম্যাচ বলবে। কিন্তু হালান্ড ইতিমধ্যে একটি কাজ করে ফেলেছেন। তিনি নরওয়েকে শুধু বিশ্বকাপে ফিরিয়ে আনেননি, দেশটিকে বিশ্বাস করতে শিখিয়েছেন যে তারা বড় দলকে হারাতে পারে, ইতিহাস বদলাতে পারে এবং বিশ্বকাপের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত যাওয়ার স্বপ্নও দেখতে পারে।
তথ্যসূত্র:
FIFA (July 10, 2026)









