
টরন্টো, ৩০ জুন – টরন্টোর বহুসাংস্কৃতিক জীবনে খেলাধুলা অনেক সময় শুধু মাঠের প্রতিযোগিতা হয়ে থাকে না; হয়ে ওঠে মানুষে মানুষে সেতুবন্ধনের এক প্রাণবন্ত উপলক্ষ। ভাষা, দেশ, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের ভিন্নতা তখন এক সবুজ মাঠে এসে মিলিত হয় একই উত্তেজনায়। ফুটবলের বলটি যেমন এক পা থেকে আরেক পায়ে ঘুরে বেড়ায়, তেমনি সেই বলের সঙ্গে ঘুরে বেড়ায় স্মৃতি, বন্ধুত্ব, শিকড়ের টান এবং প্রবাসজীবনের এক ধরনের আনন্দময় সহাবস্থান।
এমনই এক প্রাণময় আবহে গত ২৮ জুন, ২০২৬, রবিবার পূর্ব টরন্টোর ওকরিজ পার্ক সকার ফিল্ডে অনুষ্ঠিত হলো স্বাধীন ওপেন সকার চ্যাম্পিয়নশিপ ২০২৬। ‘স্বাধীন কমিউনিটি কানাডা’ আয়োজিত এই টুর্নামেন্টে বিভিন্ন ভাষাভাষী কমিউনিটির ফুটবল দল অংশ নেয়। সারাদিনের খেলাধুলা, দর্শকদের উপস্থিতি, অতিথিদের অংশগ্রহণ এবং দলগুলোর পারস্পরিক সৌহার্দ্যে আয়োজনটি পরিণত হয় প্রাণবন্ত এক ক্রীড়া উৎসবে।
রবিবার সকাল সাড়ে ৮টায় উদ্বোধনী ম্যাচের মধ্য দিয়ে টুর্নামেন্টের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। মাঠের চারপাশে তখন ছিল অংশগ্রহণকারী দল, সমর্থক, সংগঠক ও কমিউনিটির মানুষের সরব উপস্থিতি। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ও বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সালমা জাহিদ এমপি ও অন্টারিও সকারের চেয়ারম্যান অ্যালান ও’ব্রায়েন।
উদ্বোধনী বক্তব্যে অতিথিরা বলেন, ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়; এটি বিভিন্ন সংস্কৃতি ও ভাষার মানুষকে কাছাকাছি আনার এক শক্তিশালী মাধ্যম। তাঁরা শারীরিক সুস্থতা, মানসিক বিকাশ এবং তরুণ প্রজন্মকে ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে যুক্ত রাখার ক্ষেত্রে ফুটবলের গুরুত্ব তুলে ধরেন। বক্তারা এ ধরনের ক্রীড়া আয়োজন নিয়মিতভাবে চালিয়ে যাওয়ার ওপরও গুরুত্ব আরোপ করেন।
এবারের টুর্নামেন্টে মোট ছয়টি দল অংশ নেয়। দলগুলো হলো আফগানিস্তান, ভুটান, নেপাল, তিব্বত এবং স্বাগতিক বাংলাদেশের দুটি দল, বাংলাদেশ লাল ও বাংলাদেশ সবুজ। বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিত্বকারী এসব দলের অংশগ্রহণ টুর্নামেন্টকে শুধু প্রতিযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং মাঠটিকে পরিণত করেছিল বহু সংস্কৃতির এক মিলনস্থলে।
সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ম্যাচগুলোতে ছিল প্রতিদ্বন্দ্বিতা, গতি, উত্তেজনা এবং খেলোয়াড়দের আন্তরিক প্রচেষ্টা। প্রতিটি দলই নিজেদের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করে। দর্শকরাও মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে উৎসাহ দিয়েছেন নিজেদের দলকে। কখনো করতালি, কখনো উল্লাস, কখনো চাপা উৎকণ্ঠা, সব মিলিয়ে ওকরিজ পার্ক সকার ফিল্ড সারাদিন ছিল ফুটবলমুখর।
সন্ধ্যা ৭টায় অনুষ্ঠিত হয় টুর্নামেন্টের বহুল প্রতীক্ষিত ফাইনাল। ফাইনালে মুখোমুখি হয় শক্তিশালী বাংলাদেশ লাল এবং দুর্দান্ত ছন্দে থাকা টিম তিব্বত। উত্তেজনাপূর্ণ লড়াই শেষে বাংলাদেশ লালকে হারিয়ে শিরোপা জিতে নেয় টিম তিব্বত। রানার্সআপ হওয়ার গৌরব অর্জন করে বাংলাদেশ লাল। পুরো টুর্নামেন্টে চমৎকার ক্রীড়াসুলভ আচরণের জন্য ফেয়ার প্লে অ্যাওয়ার্ড পায় বাংলাদেশ সবুজ। টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন তিব্বত দলের টেনজিন ওগেন।
রাত ৮টায় শুরু হয় পুরস্কার বিতরণী পর্ব। চ্যাম্পিয়ন, রানার্সআপ এবং অন্যান্য বিজয়ীদের হাতে ট্রফি ও পুরস্কার তুলে দেন অতিথিবৃন্দ। পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন নগরীর ওয়ার্ড ২০-এর কাউন্সিলর পার্থি কান্দাভেল, এমপিপি পদপ্রার্থী আহসানুল হাফিজ, পিসি নোমিনেশন ক্যান্ডিডেট ড. এএসএম নূরুল্লাহ তরুন, পিসি নোমিনেশন ক্যান্ডিডেট নিজাম মুর্শেদ, বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং কমিউনিটির বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিরা।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিশিষ্ট পৃষ্ঠপোষকদেরও উপহার প্রদান করা হয়। বক্তারা আয়োজক আহমেদ ইত্তেজা টিপুকে ধন্যবাদ জানান এবং এই ধরনের টুর্নামেন্টকে আরও বড় পরিসরে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। তাঁরা ভবিষ্যতেও এ ধরনের উদ্যোগে সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
স্বাধীন ওপেন সকার চ্যাম্পিয়নশিপ ২০২৬ শেষ হয়েছে একটি সুন্দর বার্তা রেখে। প্রবাসে ভিন্ন দেশ ও সংস্কৃতির মানুষ যখন একই মাঠে খেলতে নামে, তখন জয়-পরাজয়ের হিসাবের বাইরে আরও বড় কিছু তৈরি হয়। তৈরি হয় সম্পর্ক, বোঝাপড়া এবং একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা। আগামী বছর আবারও মাঠে ফেরার প্রত্যয় নিয়ে শেষ হয় এবারের ফুটবল উৎসব।
এনএন/ ৩০ জুন ২০২৬









