পশ্চিমবঙ্গ

পশ্চিমবঙ্গে পশু জবাইয়ে কড়াকড়ি: সংকটে গবাদিপশু ব্যবসা ও ঈদ উৎসবের আমেজ

কলকাতা, ২৭ মে – পবিত্র ঈদুল আজহার আর মাত্র একদিন বাকি। কলকাতার যে ধুলাগড় পশুর হাট এই সময়ে ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাকডাকে মুখরিত থাকার কথা, তা আজ এক ভূতুড়ে প্রান্তরে পরিণত হয়েছে। টিনের চালার নিচে দল বেঁধে মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন বিক্রেতারা; আর খোলা আকাশের নিচে প্রখর রোদে দাঁড়িয়ে আছে বিক্রির অপেক্ষায় থাকা ২০০-এরও বেশি গবাদিপশু। কিন্তু পুরো হাটে কোনো ক্রেতার দেখা নেই।

গত ৬ মে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং প্রথমবারের মতো নরেন্দ্র মোদীর ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP) ক্ষমতায় আসার পর, এক ধাক্কায় বদলে গেছে রাজ্যের চেনা সমীকরণ। নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দায়িত্ব গ্রহণের এক সপ্তাহের মাথায় ১৯৫০ সালের ‘পশু সংরক্ষণ আইন’ কঠোরভাবে বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন। আর এই এক নির্দেশেই ওলটপালট হয়ে গেছে শত বছরের সাংস্কৃতিক সম্প্রীতি আর কোটি কোটি টাকার ঈদ অর্থনীতি।

১৯৫০ সালের আইনি সংস্কারের নামে এবার যে নিয়মগুলো জারি করা হয়েছে, তা কার্যত সাধারণ মুসলিম পরিবার ও মাংস ব্যবসায়ীদের জন্য মরণফাঁদ:

১. সরকারি পশু কর্মকর্তার কাছ থেকে ‘জবাই উপযোগী প্রত্যয়নপত্র’ (Fit-for-slaughter certificate) নেওয়া বাধ্যতামূলক।

২. জবাই করা পশুর বয়স অবশ্যই ১৪ বছরের বেশি হতে হবে।

৩. খোলা জায়গায় বা রাস্তায় প্রকাশ্যে কোরবানি দেওয়া যাবে না; জবাই করতে হবে কেবল পৌর কর্পোরেশনের কসাইখানা বা প্রশাসনের নির্ধারিত স্থানে।

এই কঠোর নিয়মের কারণে কলকাতার বিখ্যাত ‘দ্য বার্গার শপ’ তাদের জনপ্রিয় বিফ বার্গার বিক্রি বন্ধ করে ইনস্টাগ্রামে লিখেছে, ‘আমাদের বার্গারের কোনো ধর্ম নেই। কিন্তু রাজনীতির অবশ্যই আছে।’ কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকার ৬৫ বছর বয়সী মাংস ব্যবসায়ী মোহাম্মদ হাসিম আক্ষেপ করে বলেন, ৬০ বছর ধরে লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা করছি, এমন আতঙ্ক কখনো দেখিনি। বিফের দাম প্রতি কেজি ৪০০ রুপি থেকে ধসে এখন মাত্র ১৫০ রুপিতে নেমে এসেছে, তবুও কোনো ক্রেতা নেই।

ধুলাগড় পশুর হাটের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে ঐতিহ্যগতভাবেই সিংহভাগ বিক্রেতা হিন্দু এবং ক্রেতারা মুসলিম। ফলে এই নতুন সরকারি কড়াকড়িতে ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে গিয়ে চরম আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন দরিদ্র খামারিরা।

হিন্দু বিক্রেতার হাহাকার: কলকাতা থেকে ১৩০ কিলোমিটার দূরের পূর্ব মেদিনীপুর থেকে আসা এক হিন্দু খামারি চড়া সুদে একাধিক ঋণ নিয়ে হাটে গরু এনেছিলেন। আড়াই কোটি মুসলিমের এই রাজ্যে ভালো লাভের আশা করেছিলেন তিনি। প্রশাসনের রোষানলে পড়ার ভয়ে নাম প্রকাশ না করে তিনি বলেন, “কে গরু কিনবে? মানুষ এখন চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।” অবিক্রিত প্রতিটি গরুর পেছনে দৈনিক ৫ হাজার রুপি করে লোকসান গুনছেন এই প্রান্তিক খামারিরা, যারা বছরের বাকি সময় নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করেন।

মুসলিম বিক্রেতার অন্তহীন সংকট: হাটের একমাত্র মুসলিম বড় ব্যবসায়ী উৎসবের মরসুমে ভালো লাভের আশায় নিজের মায়ের গহনা বন্ধক রেখে ১০ লাখ রুপি ঋণ নিয়েছিলেন। গত বছর যিনি একাই ১০০টি গরু বিক্রি করেছিলেন, এবার তার ২৫টি গরুর একটিও বিক্রি হয়নি। মায়ের সোনা কীভাবে ছাড়াবেন আর ঋণের টাকাই বা কীভাবে শোধ করবেন—তা ভেবে বুক চাপড়াচ্ছেন তিনি।

শুধু কোরবানির পশুই নয়, মুসলিমদের ধর্মীয় রীতিনীতিতেও আঘাত এসেছে বলে অভিযোগ করছেন স্থানীয়রা। কলকাতার মল্লিক বাজার ও পার্ক সার্কাস এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, নবনির্বাচিত বিজেপি বিধায়কেরা (এমএলএ) এবার মুসলিমদের রাস্তায় বা খোলা মাঠে ঈদের নামাজ পড়তে স্পষ্ট নিষেধ করেছেন। জায়গা সংকুলানের কারণে দক্ষিণ এশিয়ায় রাস্তায় ঈদের নামাজ পড়ার দীর্ঘদিনের যে সংস্কৃতি, তা এবার বন্ধের মুখে। ফলে উৎসবের ঠিক আগে কলকাতার মল্লিক বাজার সম্পূর্ণ ফাঁকা, নেই কোনো বেচাকেনা।

আইন বাস্তবায়নের পক্ষে সাফাই গেয়ে বিজেপির মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার বলেন, “আগে যেসব আইন কাগজে-কলমে ছিল কিন্তু মানা হচ্ছিল না, সরকার এখন শুধু সেগুলোই কঠোরভাবে বলবৎ করছে।”

তবে বিশিষ্ট সমাজকর্মী ও লেখক হর্ষ মান্দার এই পদক্ষেপের পেছনে গভীর রাজনৈতিক ও আদর্শিক এজেন্ডা দেখছেন। আরএসএস (RSS)-এর শতবর্ষী ভাবাদর্শের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “বিজেপি মূলত একটি নির্দিষ্ট আদর্শিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এসেছে। তারা স্পষ্ট বার্তা দিতে চায় যে, মুসলিমদের অধিকার ও সামাজিক অবস্থান ছাড়া দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে থাকতে হবে। এটি আসলে আইনের শাসন নয়, বরং নিজ দেশের নাগরিকদের একটি অংশের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য যুদ্ধ।”

এনএন/ ২৭ মে ২০২৬


Back to top button