পশ্চিমবঙ্গ

আরজি কর কাণ্ডে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর অ্যাকশন: ৩ শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা বরখাস্ত! মমতাকে নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য নির্যাতিতার মায়ের

কলকাতা, ১৬ মে – পশ্চিমবঙ্গের কুর্সিতে বসার পরই আরজি করের সেই অভয়া কাণ্ডে এক ঐতিহাসিক ও নজিরবিহীন প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিলেন নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। কলকাতার আরজি কর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে তরুণী চিকিৎসককে নৃশংসভাবে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় তথ্যপ্রমাণ লোপাট এবং দায়িত্বে চরম গাফিলতির অভিযোগে কলকাতার তৎকালীন পুলিশ কমিশনার (CP) বিনীত গোয়েলসহ তিন শীর্ষ আইপিএস কর্মকর্তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত (Suspend) করেছেন তিনি।

শুক্রবার (১৫ মে) নবান্নে এক জরুরি সাংবাদিক বৈঠক করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিজে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে এই বড় ঘোষণা দেন। এই তিন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শুধু বরখাস্তই নয়, বরং কড়া বিভাগীয় তদন্ত (Departmental Inquiry) শুরু করার নির্দেশও দিয়েছেন তিনি। দেড় বছর ধরে ঝুলে থাকা এই মামলার এই নতুন মোড়ে পশ্চিমবঙ্গসহ পুরো ভারতের রাজনীতিতে এখন তোলপাড় চলছে।

বরখাস্ত হলেন যে ৩ শীর্ষ আইপিএস কর্মকর্তা:

১. বিনীত গোয়েল: কলকাতার তত্কালীন পুলিশ কমিশনার (CP)।
২. ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়: তত্কালীন ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (DC- সেন্ট্রাল)।
৩. অভিষেক গুপ্তা: তত্কালীন ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (DC- নর্থ)।

নবান্নের সভাগৃহে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “মুখ্যমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পরই আমি মুখ্য সচিব ও স্বরাষ্ট্র সচিবের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, কলকাতা পুলিশ আরজি করের ঘটনার সময় কী ভূমিকা পালন করেছিল। তাদের জমা দেওয়া প্রাথমিক প্রতিবেদন দেখার পরই এই অ্যাকশন নেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে আমি ঘোষণা করছি, ওই সময় ঘটনাটিকে পুরোপুরি ‘মিসহ্যান্ডেল’ বা ভুলভাবে সামলানো হয়েছিল এবং এফআইআর দায়েরের বিষয়টি নিয়েও সঠিক তদন্ত করা হয়নি।”

মুখ্যমন্ত্রী আরও এক ভয়ঙ্কর তথ্য ফাঁস করে বলেন, “সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে নির্যাতিতার মায়ের কাছ থেকে আমরা জানতে পেরেছি, দুজন পুলিশ কর্মকর্তা নাকি ঘটনা ধামাচাপা দিতে পরিবারকে টাকা দিতে চেয়েছিলেন! এই আধিকারিকদের পদে রেখে নিরপেক্ষ তদন্ত সম্ভব নয়। বিভাগীয় তদন্তের সময় ওই সময়ের সব ফোনকল রেকর্ড, হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট—সব বের করা হবে। দেখা হবে তখনকার পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বা কোনো মন্ত্রীর সরাসরি কী নির্দেশ ছিল। আমরা সব সত্য টেনে বের করব।” প্রয়োজনে পুলিশ কর্মকর্তারা নির্যাতিতার বাড়িতে গিয়েও বক্তব্য রেকর্ড করবেন বলে জানান তিনি।

মুখ্যমন্ত্রীর এই বিশাল পদক্ষেপেও অবশ্য পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারেননি আরজি করে নিহত চিকিৎসকের মা এবং মেদিনীপুরের পানিহাটি আসন থেকে সদ্য নির্বাচিত বিজেপি বিধায়ক রত্না দেবনাথ। নবান্নের এই সিদ্ধান্তের পর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, “এখানে খুশি হওয়ার মতো কিছু এখনো ঘটেনি। এখানে আরও অনেক বড় বড় মাথা জড়িত রয়েছে। এই ঘটনার প্রধান অপরাধী হলেন খোদ মমতা ব্যানার্জী! তাকে যদি ধরে জেলে ঢোকানো যায়, তবে বাকি সব অপরাধীর নাম এক নিমেষে বেরিয়ে আসবে।”

তিনি আরও বলেন, শুধু পুলিশ বরখাস্ত নয়, যদি প্রকৃত অপরাধীদের সঠিক ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার হয়, তবেই অপরাধীরা ভয় পাবে এবং একটি অপরাধমুক্ত সমাজ গড়ে উঠবে।

২০২৪ সালের ৯ আগস্ট কলকাতার আরজি কর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে নৃশংসভাবে ধর্ষণ ও খুনের শিকার হন ওই পিজিটি চিকিৎসক ছাত্রী, যাকে পুরো ভারত ‘অভয়া’ নামে চেনে। এই ঘটনার প্রতিবাদে এবং দোষীদের ফাঁসির দাবিতে গোটা ভারতজুড়ে তীব্র আন্দোলন শুরু হয়েছিল। সাধারণ নাগরিক সমাজ থেকে শুরু করে চিকিৎসকেরা ‘রাত দখল’ কর্মসূচিসহ দীর্ঘমেয়াদি প্রতিবাদ করেছিলেন।

ঘটনার পর কলকাতা পুলিশ সঞ্জয় রায় নামে এক সিভিক ভলান্টিয়ারকে গ্রেফতার করেছিল। পরবর্তীতে আদালতের নির্দেশে তদন্তভার হাতে নিয়ে কেন্দ্রীয় সংস্থা সিবিআই (CBI) সঞ্জয় রায়কে মূল দোষী হিসেবে চিহ্নিত করে চার্জশিট জমা দেয়। তবে অভয়ার মা রত্না দেবনাথের প্রথম থেকেই দাবি ছিল, একা সঞ্জয় রায়ের পক্ষে এই কাণ্ড ঘটানো সম্ভব নয়, এর পেছনে হাসপাতালের ভেতরের এবং সরকারের একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত।

আর এই ন্যায়বিচার পাওয়ার লড়াইকে রাজনৈতিক রূপ দিতেই দুমাস আগে বিজেপিতে যোগ দেন রত্না দেবনাথ এবং ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে পানিহাটি আসন থেকে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে বিধায়ক হন। আর এবার পরিবর্তনের পর শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রী হতেই আরজি কর কাণ্ডের সেই ‘রক্ষক ভক্ষক’ পুলিশদের ওপর প্রথম কোপটি পড়ল।

এনএন/ ১৬ মে ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language