অন্যায় দেখলে ইস্পাতকঠিন হবো, রাজশাহী থেকে জামায়াত আমিরের চরম হুঁশিয়ারি

রাজশাহী, ১৬ মে – দেশের বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণে এক বিশাল ভূমিকম্প সৃষ্টি হলো রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠে। ক্ষমতাসীন দল বিএনপির সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড, একচ্ছত্র সিদ্ধান্ত এবং দেশজুড়ে চলা চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে এক歩ও ছাড় না দেওয়ার ঘোষণা দিলেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান (এমপি)।
শনিবার (১৬ মে) বিকেলে ১১ দলীয় ঐক্যজোটের এক বিশাল জনসমাবেশে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “আমরা ভালো কাজের পক্ষে সবসময় পানির মতো তরল থাকবো, কিন্তু অন্যায় দেখলে ইস্পাতের মতো কঠিন হবো।” একই সাথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, “এখনো সময় আছে, জনগণের কাছে এসে ক্ষমা চান।”
জুলাই বিপ্লবের শহীদ ও তরুণদের অবদান স্মরণ করিয়ে দিয়ে জামায়াত আমির ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “যাদের ত্যাগ ও আত্মদানের ফলে দেশে একটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। স্বপ্নবাজ তরুণদের কোরবানির ফলেই আপনারা অনেকে কারামুক্ত হয়েছেন, কেউ প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, কেউ মন্ত্রী হয়েছেন। কিন্তু আপনারা কৃতজ্ঞ না থেকে বিগত স্বৈরাচার (আওয়ামী লীগ) যে পথে হেঁটেছিল, আপনারাও সেই পথেই হাঁটছেন।”
তিনি আরও বলেন, বিগত ১৭ বছর আন্দোলন করেও যা সম্ভব হয়নি, তা তরুণরা বুলেটের সামনে বুক পেতে করে দেখিয়েছে। অথচ আজ সেই সাহসী তরুণদেরই ‘শিশু সংগঠন’ বা ‘গুপ্ত সংগঠন’ বলা হচ্ছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক ও অনভিপ্রেত।
বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারের চরম সমালোচনা করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, “আপনারা বলেছিলেন নির্বাচিত প্রতিনিধি ছাড়া কেউ ক্ষমতায় বসতে পারবে না। অথচ নির্বাচন ছাড়াই এখন দেশের ৪৭টি জেলায় এবং সিটি করপোরেশনগুলোতে নিজেদের পছন্দের প্রশাসক বসানো হয়েছে। আমরা চেয়েছিলাম অতীতের অন্যায়ের বিচারের জন্য একটি ‘গুম কমিশন’ গঠন করা হোক, কিন্তু আপনারা তাতে কর্ণপাত করেননি।”
চাঁদাবাজি প্রসঙ্গে তিনি তীব্র আক্রমণ করে বলেন, “আপনারা বলেছিলেন চাঁদাবাজিমুক্ত বাংলাদেশ গড়বেন, অথচ এখন ক্ষমতায় এসে বলছেন—সমঝোতার মাধ্যমে নেওয়া টাকা নাকি চাঁদাবাজি নয়! একসময় আপনাদের দলের নাম ছিল ‘জাতীয়তাবাদী দল’, আর এখন দেশের সাধারণ মানুষ আপনাদের বলছে ‘চাঁদাবাজ দল’।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরে যোগ্য ও দক্ষ মানুষদের বাদ দিয়ে কেবল দলীয় খাতিরে অযোগ্যদের বসানো হচ্ছে।
সমাবেশে জামায়াত আমির হুঙ্কার দিয়ে বলেন, “অনেক সময় আমাদের ভয় দেখানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু যে সংগঠনের নেতাকর্মীরা ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়েও হাসিমুখে জীবন দিতে পারে, তাদের ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। আমরা আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে (ভারত) সম্মান করি, কিন্তু কেউ যদি আমাদের চোখ রাঙায়, সেটি মেনে নেওয়া হবে না।”
তিনি জাতীয় সংসদের কথা উল্লেখ করে বলেন, সংসদে যদি সত্য কথা বলার সুযোগ না দেওয়া হয়, তবে স্পিকারের অনুমতি ছাড়াই দেশের জনগণের মাঝে গিয়ে সত্য উন্মোচন করা হবে এবং কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
বর্তমানে পদ্মা ও তিস্তা নদীর বিশাল অংশ মরুভূমিতে পরিণত হওয়া নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন ডা. শফিকুর রহমান। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘খাল কাটা’ কর্মসূচিকে এক হাত নিয়ে তিনি বলেন, “খাল কাটার কর্মসূচি ভালো উদ্যোগ, তবে নদীতেই যদি পানি না থাকে, তবে খাল খননের সুফল সাধারণ মানুষ কীভাবে পাবে? আমাদের আগে গঙ্গা ও তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে হবে।”
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই মহাসমাবেশে যেন তারার মেলা বসেছিল। বক্তব্য রাখেন জামায়াতের নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির নুরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, নেজামে ইসলাম পার্টির প্রধান মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম, খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির অধ্যাপক সিরাজুল হক এবং লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (LDP) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম।
এছাড়াও এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা ইমরান ইমন, নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারী এবং উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমসহ রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা জামায়াতের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সমাবেশ থেকে গণভোটের ৭০ শতাংশ রায় বাস্তবায়ন এবং চাঁদাবাজদের রুখে দিতে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার চূড়ান্ত ডাক দেওয়া হয়।
এনএন/ ১৬ মে ২০২৬









