মধ্যপ্রাচ্য

ইরান-মার্কিন শান্তি ফেরাতে এবার তেহরানে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি

তেহরান, ১৬ মে – মধ্যপ্রাচ্যের চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মাঝে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার থমকে থাকা শান্তি আলোচনায় গতি ফেরাতে এক মহাগুরুত্বপূর্ণ মিশনে তেহরানে পৌঁছেছেন পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি। শনিবার (১৬ মে) ইসলামাবাদ থেকে একটি বিশেষ বিমানে করে তিনি ইরানি রাজধানীতে পৌঁছান। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি (AFP) এবং ইরানের আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ এজেন্সির বরাতে এই হাই-ভোল্টেজ সফরের খবরটি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর হুঁশিয়ারি এবং ইরানের অনমনীয় অবস্থানের কারণে দুই দেশের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি যখন প্রায় ভাঙার মুখে, ঠিক তখনই পাকিস্তানের এই কূটনৈতিক তৎপরতা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এক নতুন মোড় এনে দিয়েছে।

তেহরানের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছালে পাকিস্তানি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভিকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এস্কান্দার মোমেনি। ইরানের সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, আঞ্চলিক শান্তি রক্ষা এবং দুই বৈরী দেশের মধ্যে আলোচনা সহজতর করার লক্ষ্যেই নাকভির এই দুই দিনের অফিশিয়াল সফর।

উল্লেখ্য, পাকিস্তানের প্রভাবশালী সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল অসীম মুনিরের তেহরান সফরের ঠিক কয়েক দিন পরই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফরটি অনুষ্ঠিত হলো। ইরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার আলোচনা পুনরুজ্জীবিত করতে ইসলামাবাদ যে কতটা সক্রিয়, তা এই ব্যাক-টু-ব্যাক সফরগুলো থেকেই স্পষ্ট। এর আগে গত মাসেই পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই দেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানি ভূখণ্ডে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর আকস্মিক ও ভয়াবহ হামলার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু হয়। পরবর্তীতে পাকিস্তানসহ কয়েকটি বন্ধু রাষ্ট্রের অক্লান্ত মধ্যস্থতায় গত ৮ এপ্রিল একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হয়। তবে যুদ্ধ থামলেও দুই দেশের মধ্যকার মূল শান্তি আলোচনা বর্তমানে সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে আছে।

এরই মধ্যে গত শুক্রবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এক চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়ে বলেন, তেহরান ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ বার্তা পেয়েছে। যেখানে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন আলোচনা চালিয়ে যেতে আগ্রহী।

মার্কিন বার্তা পাওয়ার কথা স্বীকার করলেও ওয়াশিংটনকে এক প্রকার আলটিমেটাম দিয়ে রেখেছেন ইরানের প্রধান আলোচক ও পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ। গত মঙ্গলবার তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ওয়াশিংটনের উচিত তেহরানের শান্তি প্রস্তাব মেনে নেওয়া, অন্যথায় তাদের চূড়ান্ত ব্যর্থতার মুখে পড়তে হবে।

এর আগে ইরানের একটি পাল্টা প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানকে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন। ট্রাম্প সাফ জানিয়ে দেন, দুই দেশের মধ্যকার যুদ্ধবিরতি এখন কার্যত ‘লাইফ সাপোর্টে’ রয়েছে।

ট্রাম্পের এই হুমকির জবাবে স্পিকার ঘালিবাফ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গর্জে উঠে বলেন, “আমাদের দেওয়া ১৪ দফা প্রস্তাবে ইরানি জনগণের যে ন্যায্য অধিকারের কথা বলা হয়েছে, ওয়াশিংটনকে তা মেনে নিতেই হবে। এর বাইরে অন্য যেকোনো পন্থা পুরোপুরি অকার্যকর হবে, যা কেবল আমেরিকার জন্য একের পর এক ব্যর্থতাই ডেকে আনবে।”

আমেরিকার ট্রাম্প প্রশাসনের একরোখা নীতি এবং ইরানের ১৪ দফার অনমনীয় অবস্থান—এই দুই বিপরীত মেরুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভির জন্য এই মধ্যস্থতা এক বিশাল অগ্নিপরীক্ষা। যুদ্ধবিরতি ভেঙে যদি নতুন করে মেগা যুদ্ধ শুরু হয়, তবে তার আঁচ লাগবে পুরো এশিয়ায়। এখন দেখার বিষয়, আগামী দুই দিনে তেহরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের সাথে বৈঠক করে নাকভি এই ‘লাইফ সাপোর্টে’ থাকা শান্তি আলোচনাকে আইসিইউ থেকে বের করে আনতে পারেন কি না।

এনএন/ ১৬ মে ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language