“মধ্যবর্তী নির্বাচন দরকার হতে পারে,” সরকারকে নাহিদ ইসলামের চরম হুঁশিয়ারি!

ঢাকা, ১৬ মে – দেশের বর্তমান রাজনৈতিক অঙ্গনে বইছে এক চরম উত্তপ্ত হাওয়া। একদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক নানা অসম চুক্তি এবং দেশের ভেতরে মহামারি পরিস্থিতি—সব মিলিয়ে সরকারের ওপর চরম ক্ষোভ উগরে দিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। শনিবার (১৬ মে) রাজধানীর তোপখানা রোডের বিএমএ ভবন মিলনায়তনে জাতীয় যুবশক্তির প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় সরকারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করান তিনি। সরকারের পারফরম্যান্সের ওপরই এখন দেশের ‘মধ্যবর্তী নির্বাচন’ নির্ভর করছে বলে তিনি সাফ জানিয়ে দেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে নাহিদ ইসলাম স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “আপনারা বলেছিলেন নির্বাচন হলে নাকি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে। কিন্তু এখন পরিস্থিতি কয়েকগুণ বেশি অবনতি ঘটেছে। আপনারা আপনাদের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করেন। বাংলাদেশের জনগণের ভোগান্তি আমরা দেখতে চাই না।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার সংস্কার কার্যক্রমের নামে জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। গণভোটের রায় প্রত্যাখ্যান, গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাতিল এবং যুবকদের দেওয়া এক কোটি কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি পূরণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে এই সরকার।
দেশে হামের প্রকোপ: ‘মেডিকেল ইমার্জেন্সি’ ঘোষণার দাবি
রাজনৈতিক সংকটের পাশাপাশি দেশের স্বাস্থ্য খাতের এক ভয়ঙ্কর চিত্র তুলে ধরেন এনসিপি আহ্বায়ক। তিনি বলেন, “সারাদেশে হামের প্রকোপ চলছে এবং ইতিমধ্যে ৪০০-র বেশি শিশু মারা গেছে।” সরকার এই মহামারি মোকাবিলায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে উল্লেখ করে তিনি অতিসত্ত্বর দেশে ‘মেডিকেল ইমার্জেন্সি’ ঘোষণা এবং কয়েকটি হাসপাতালকে হামের জন্য বিশেষায়িত করার দাবি জানান। কারো গাফিলতি থাকলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।
ফারাক্কা দিবসে হুঙ্কার: “প্রয়োজন হলে সীমান্ত লংমার্চ হবে”
ঐতিহাসিক ফারাক্কা দিবসে মওলানা ভাসানীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নাহিদ ইসলাম ভারতের পানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “স্বাধীনতার পর থেকেই ভারত অভিন্ন নদীগুলো থেকে পানি প্রত্যাহার করে আমাদের ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত করছে। এ বছরই গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি শেষ হচ্ছে। আমরা দেখতে চাই নতুন সরকার ভারতীয় আধিপত্যের বাইরে গিয়ে পানির অধিকার নিশ্চিত করতে পারে কিনা, নাকি আওয়ামী লীগের মতো নতজানু চুক্তি করে!”
সীমান্ত হত্যা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত পৃথিবীর সবচেয়ে রক্তাক্ত সীমান্ত। আমাদের হাজারের বেশি নাগরিককে হত্যা করা হয়েছে। মওলানা ভাসানী ফারাক্কা লংমার্চ করেছিলেন; যদি প্রয়োজন হয়, আমরা সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সীমান্ত লংমার্চের ঘোষণা দেবো।”
“দেশ কোনো পরাশক্তির প্লে-গ্রাউন্ড হবে না”
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাম্প্রতিক জ্বালানি ও বাণিজ্য চুক্তির তীব্র সমালোচনা করে নাহিদ বলেন, “বর্তমান সরকার কোথায় মাথা বন্ধক রেখে ক্ষমতায় এসেছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। এক দল আগে ভারতের মুখাপেক্ষী ছিল, এখন সরকার অন্য কোনো পরাশক্তির মুখাপেক্ষী হয়ে দেশ চালাবে—এটা জনগণ মেনে নেবে না।” এই চুক্তিগুলো অসম কিনা তা যাচাইয়ের জন্য এগুলো সংসদে উন্মুক্ত আলোচনার দাবি জানান তিনি।
একই সাথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, “রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমান যতটা সফল ছিলেন, তারেক রহমান ততটা ব্যর্থ হওয়ার পথে। পিআর (PR) দিয়ে দেশ চলে না। পিআর স্ট্র্যাটেজিস্ট হতে চাইলে নাটক-সিনেমা করেন, থিয়েটারে যান, দেশ চালানোর প্রয়োজন নেই।” তিনি দলের ‘ক্যাশিয়ারদের’ মন্ত্রিত্ব থেকে বাদ দিয়ে সৎ মানুষদের হাতে দায়িত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।
আওয়ামী লীগের মিছিল ও কারিনা কায়সারের মৃত্যু নিয়ে ক্ষোভ
নাহিদ ইসলাম দেশের বিভিন্ন স্থানে পতিত ফ্যাসিবাদের (আওয়ামী লীগ) মিছিলের তীব্র নিন্দা জানান এবং এর পেছনে কাদের ছত্রছায়া রয়েছে তা খতিয়ে দেখতে প্রশাসনকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার ঘোষণা দেন।
সম্প্রতি জুলাই যোদ্ধা কারিনা কায়সারের মৃত্যুর পর ফ্যাসিবাদীদের বুনো উল্লাসের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমরা হাদি ভাইয়ের মতো ইনসাফ চাই, তবে এই উল্লাস আমরা মনে রাখবো।” এছাড়া সীমান্তে হিন্দুত্ববাদের উত্থান এবং বাংলাদেশে ‘পুশ ইন’ করার চক্রান্ত রুখতে সরকার ব্যর্থ বলে দাবি করেন তিনি।
জাতীয় যুবশক্তির সভাপতি অ্যাডভোকেট তরিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় দলের অন্য কেন্দ্রীয় নেতারাও উপস্থিত ছিলেন, যেখানে তারুণ্যের ঐক্যকে নতুন বাংলাদেশের মূল শক্তি হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়।
এনএন/ ১৬ মে ২০২৬









