আগামী ১৫ বছরে বিশ্বে ১২০ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান ঘাটতির আশঙ্কা: বিশ্বব্যাংক

ওয়াশিংটন, ১৩ এপ্রিল – মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের অবসান হলেও আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রায় ১২০ কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা এই গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি জানান যে বর্তমান পরিস্থিতি চলতে থাকলে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মাত্র ৪০ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করা সম্ভব হবে। এর ফলে প্রায় ৮০ কোটি মানুষ বেকারত্বের শিকার হতে পারেন।
মাস্টারকার্ডের সাবেক এই প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জানান কোভিড ১৯ মহামারির পর থেকে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছে তার রেশ এখনো কাটেনি। এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধসহ ধারাবাহিক স্বল্পমেয়াদি ধাক্কার কারণে বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে দীর্ঘমেয়াদি বিষয়ে মনোযোগ দেওয়া বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। অজয় বাঙ্গা মনে করেন আর্থিক খাতের নীতিনির্ধারকদের উচিত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিদ্যুৎ গ্রিডের সম্প্রসারণ এবং বিশুদ্ধ পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার মতো দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জগুলোতে মনোযোগ ধরে রাখা।
তিনি বলেন এখন বিশ্ব অর্থনীতি একটি ধীর গতির চক্রের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের প্রধান উপায় হলো কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান উত্তেজনার মধ্যেই বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বসন্তকালীন বৈঠকে যোগ দিতে ওয়াশিংটনে জড়ো হচ্ছেন বিশ্বের হাজার হাজার অর্থ কর্মকর্তা। বর্তমান সংঘাতময় পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির হার কমে যাচ্ছে এবং মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পাচ্ছে। অর্থনীতিতে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব অনেকটাই নির্ভর করবে সম্প্রতি ঘোষিত যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্বের ওপর।
বিশ্বব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য নীতি ও শর্তাবলি সহজ করার একটি পরিকল্পনা তুলে ধরেছে। কারণ কঠোর শর্তের কারণে বছরের পর বছর ধরে বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। অজয় বাঙ্গা জানান নতুন আলোচনায় স্বচ্ছতা, দুর্নীতি দমন, শ্রম ও ভূমি আইন সংস্কার, ব্যবসা পরিচালনার প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং উন্নত বাণিজ্য ব্যবস্থার মতো বিষয়গুলো প্রাধান্য পাবে। তরুণ প্রজন্মের জন্য সম্মানজনক কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে এবং বেসরকারি সংস্থাগুলোর জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে কার্যকরী সমাধান খুঁজে পাওয়া যাবে বলে তিনি আশাবাদী।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন আগামী ১৫ বছরের মধ্যে সবার চাহিদা মেটানোর মতো কোনো আদর্শ পরিস্থিতি তৈরি করা সম্ভব না হলে অবৈধ অভিবাসন এবং বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতা মারাত্মক আকার ধারণ করবে। জাতিসংঘের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২৫ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে ১১ কোটির বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হবে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভারত ও নাইজেরিয়াসহ বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশের বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বব্যাপী তাদের ব্যবসার প্রসার ঘটাচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জানান উন্নয়নশীল দেশগুলোর কর্মকর্তারা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আরও উন্নত মানের কর্মসংস্থান তৈরিতে অত্যন্ত আগ্রহী। এর পাশাপাশি নিরাপদ পানির সরবরাহ নিশ্চিত করাও একটি বড় লক্ষ্য। বিশ্বব্যাংক এবং অন্যান্য উন্নয়ন সংস্থা মিলে আরও ১০০ কোটি মানুষের জন্য বিশুদ্ধ পানি এবং আফ্রিকার ৩০ কোটি পরিবারের জন্য বিদ্যুৎ সংযোগ নিশ্চিত করার একটি যৌথ উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে।
বিশ্বব্যাংক এমন পাঁচটি সম্ভাবনাময় খাত চিহ্নিত করেছে যেগুলো বৈশ্বিক বাণিজ্য বা উন্নত দেশগুলোর আউটসোর্সিংয়ের ওপর নির্ভরশীল নয়। এই খাতগুলো হলো অবকাঠামো, ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য কৃষি ব্যবস্থা, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, পর্যটন এবং মূল্য সংযোজিত উৎপাদন। অজয় বাঙ্গার মতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত প্রসারের ফলেও এই খাতগুলো তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা কম। তিনি জোর দিয়ে বলেন এই বিশাল কর্মযজ্ঞ কোনো একক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। বিপুল জনসংখ্যার কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হলে সম্মিলিতভাবে কাজ করার কোনো বিকল্প নেই।
এস এম/ ১৩ এপ্রিল ২০২৬









