উত্তর আমেরিকা

কোনো মার্কিন সেনা না মরলে যুদ্ধ নয়! ইরানের রক্তচক্ষুর সামনে ‘ধৈর্যের পরীক্ষা’ দিচ্ছেন ট্রাম্প

ওয়াশিংটন, ৪ জুন – মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বারুদের গন্ধ, হরমুজ প্রণালিতে রণপ্রস্তুতি আর দফায় দফায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি যখন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে মোড় নিচ্ছে, ঠিক তখনই এক চমকপ্রদ তথ্য সামনে এল। ইরানের সঙ্গে চরম উত্তেজনা ও প্রকাশ্য সামরিক সংঘাত চললেও, এই মুহূর্তে তেহরানের বিরুদ্ধে কোনো বড় ধরনের বা সর্বাত্মক যুদ্ধে জড়াতে চান না মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

মার্কিন প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বরাতে প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ (The Wall Street Journal) এই চাঞ্চল্যকর খবরটি প্রকাশ করেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের ব্যক্তিগতভাবে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন—”তেহরানের হামলায় যদি কোনো মার্কিন সেনা মারা না যান, তবে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে এই মুহূর্তে কোনো বড় সামরিক অভিযানে যাবেন না।”

মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দুই পক্ষের মধ্যে ভয়াবহ হামলা-পাল্টা হামলা অব্যাহত থাকলেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি পুরোপুরি ভেঙে দিতে অনিচ্ছুক। মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি, ব্যয়বহুল ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিপূর্ণ যুদ্ধ এড়াতে ট্রাম্প প্রশাসন এখন এক ধরনের ‘ধৈর্যের নীতি’ অবলম্বন করছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে তারা ইরানের ছোটখাটো উসকানি বা সীমিত আকারের সংঘর্ষ আরও কয়েক সপ্তাহ বা মাসব্যাপী সহ্য করতেও রাজি আছে।

চলতি সপ্তাহের শুরুতে এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘর্ষে জড়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। ইরান ও তার আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলো মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটি এবং কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়, যাতে একজন সাধারণ মানুষ নিহত হন।

বিশেষ করে কৌশলগতভাবে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালি’র নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের এই লড়াই আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল এবং বিশ্ব জ্বালানি বাজারে ব্যাপক বিপর্যয় ডেকে এনেছে। তেহরান এই জলপথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সচল রাখার ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। এর জবাবে ওয়াশিংটনও ইরানের বন্দরগুলোতে জাহাজ আসা-যাওয়ার পথে কঠোর নৌ-অবরোধ জারি করেছে। ফলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

হোয়াইট হাউজ বারবার দাবি করছে যে ইরানের সঙ্গে একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার পথে। তবে বিষয়টি নিয়ে খোদ মার্কিন প্রশাসনের ভেতরে ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে তীব্র সংশয় দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের অনড় অবস্থানের কারণে ট্রাম্প এক ধরনের কূটনৈতিক ফাঁদে বা গ্যাঁড়াকলে আটকে গেছেন।

আন্তর্জাতিক থিংক ট্যাংক ‘কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস’-এর মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সিনিয়র ফেলো স্টিভেন কুক এই পরিস্থিতির ব্যবচ্ছেদ করে বলেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই মুহূর্তে বেশ অসহায় অবস্থায় আছেন বলে মনে হচ্ছে। ইরানিরা স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিয়েছে যে তারা আমেরিকার সব ধরনের অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ সহ্য করতে প্রস্তুত, কিন্তু কোনোভাবেই মাথা নত করবে না। এই অনড় মনোভাব মার্কিন প্রেসিডেন্টকে মারাত্মক এক জটিল পরিস্থিতিতে ফেলে দিয়েছে।”

গত বুধবার প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজে ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানের ওপর আমেরিকার এই কঠোর নৌ ও অর্থনৈতিক অবরোধ আগামী সেপ্টেম্বর মাসের ‘লেবার ডে’ (শ্রমিক দিবস) পর্যন্ত গড়াতে পারে। তবে পর্দার আড়ালে তিনি দ্রুত এই সংকটের একটি সম্মানজনক সমাধান খুঁজছেন, যাতে আমেরিকার কোনো বড় সামরিক বা আর্থিক ক্ষতি না হয়।

এনএন/ ৪ জুন ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language