জাতীয়

মধ্যপ্রাচ্য সংকটে জ্বালানি বাজার অস্থির, ঝুঁকিতে বাংলাদেশের অর্থনীতি

ঢাকা, ২৭ মার্চ – মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের সংকট ঘনিয়ে আসছে। অপরিশোধিত তেলের দাম এরই মধ্যে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে ১২০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের তেল ও গ্যাস অবকাঠামো ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। এর পাশাপাশি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে কাতারের রাস লাফান শিল্প কমপ্লেক্স মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কারখানাটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি কারখানা যা বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় এক পঞ্চমাংশ জোগান দেয়। ফলস্বরূপ আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম তীব্রভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বিশ্লেষকরা সতর্ক করে জানিয়েছেন যে সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়লে বা হরমুজ প্রণালি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য জ্বালানি মজুত সক্ষমতা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। পর্যাপ্ত মজুতের অভাবে দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে। ইরান তেলের দাম ২০০ ডলারে ওঠার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন সংঘাত শেষ হলে দাম কমবে। কিন্তু লন্ডনভিত্তিক ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের মতে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলে দাম কমার কোনো সম্ভাবনা নেই। জ্বালানি মজুত একটি দেশের অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রথম প্রতিরক্ষা।

আন্তর্জাতিক এনার্জি এজেন্সি বা আইইএ এর মানদণ্ড অনুযায়ী একটি দেশের অন্তত ৯০ দিনের জ্বালানি মজুত থাকা প্রয়োজন। বর্তমানে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান জ্বালানি মজুতে শীর্ষস্থানে রয়েছে। জাপানের মজুত ২০০ থেকে ৩০০ দিনের বেশি এবং চীনের মজুত ৯০ থেকে ২২০ দিন পর্যন্ত রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের অবস্থা এ ক্ষেত্রে বেশ শোচনীয়। দেশে গড়ে ৩০ থেকে ৪৫ দিনের মজুত সক্ষমতা রয়েছে যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের অনেক নিচে। সাম্প্রতিক সংকটে ডিজেলের মজুত ১০ থেকে ১৫ দিনের নিচে নেমে এসেছে। বিপিসির অধীন ২৭টি ডিপো এবং একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির ট্যাংকগুলোতেই প্রধানত এই মজুত রাখা হয়।

বিপিসির তথ্য অনুসারে ডিজেলের মোট সক্ষমতা ছয় লাখ ২৪ হাজার ১৮৯ টন। দেশে জ্বালানি তেলের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। ২০১৯ এবং ২০২০ অর্থবছরে ৫৫ লাখ টন থেকে চাহিদা বেড়ে বর্তমানে ৭৫ লাখ টনে দাঁড়িয়েছে। সরকার ২০২০ সালে কমপক্ষে ৬০ দিনের জ্বালানি মজুত সক্ষমতা গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিলেও তা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। পুরনো শোধনাগারের ওপর নির্ভরতাও একটি বড় সমস্যা। ১৯৬৩ সালে নির্মিত ইস্টার্ন রিফাইনারির বার্ষিক সক্ষমতা মাত্র ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল পরিশোধন। এই নির্ভরতা কমাতে সরকার ইআরএলের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প হাতে নিয়েছে যার বাস্তবায়ন শেষ হবে ২০৩০ সালের জুনে।

জ্বালানি তেলের পাশাপাশি দেশে গ্যাস সংকটও তীব্র হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন সংকট উত্তরণে সৌর ও বায়ু শক্তিতে বিপুল বিনিয়োগ করা জরুরি। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও চাপ বাড়ছে। তেলের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। দীর্ঘ মেয়াদে মজুত সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে মজুত ট্যাংক নির্মাণ ত্বরান্বিত করা এবং এলএনজি সঞ্চয়াগার সম্প্রসারণ করার দিকে নজর দিতে হবে। আপৎকালীন পদক্ষেপ হিসেবে সরকারি ছুটি বাড়ানো, অনলাইনে অফিসের কাজ সম্পন্ন করা এবং ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আনার মতো বিষয়গুলো বিবেচনা করা যেতে পারে। সামগ্রিকভাবে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।

এস এম/ ২৭ মার্চ ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language