মধ্যপ্রাচ্য

মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানিকেন্দ্রিক নতুন সংঘাত: যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা চরমে

তেহরান, ২০ মার্চ – মার্কিন প্রতিরক্ষাসচিব পিট হেগসেথ বৃহস্পতিবার মন্তব্য করেছেন যে শত্রুদের মোকাবেলা করতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়। পেন্টাগন ইরান যুদ্ধের জন্য ২০০ বিলিয়ন ডলার তহবিলের অনুরোধ করেছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি এই কথা বলেন। এখন পর্যন্ত ঠিক কত টাকা খরচ হয়েছে তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।

তবে যুদ্ধ কত দিন চলবে তার ওপরই চূড়ান্ত খরচের পরিমাণ নির্ভর করবে। পেন্টাগনের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী যুদ্ধের প্রথম ছয় দিনেই প্রায় ১১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। বিশেষজ্ঞ ড্যানিয়েল স্নাইডারম্যান এই খরচের পরিমাণকে বাস্তবসম্মত বলে উল্লেখ করেছেন। কারণ যুদ্ধের সময় অত্যাধুনিক অস্ত্র, বিমান হামলা, জ্বালানি এবং বিমানবাহী রণতরি পরিচালনায় প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হয়। তিনি জানান ক্রুজ মিসাইল, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, বিমান থেকে নিক্ষেপযোগ্য বোমা, রণতরি ও যুদ্ধবিমান চালানো সবকিছু মিলিয়ে সামরিক খরচ খুব দ্রুত বেড়ে যায়।

ফলে ইরান সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অন্যতম ব্যয়বহুল যুদ্ধে পরিণত হতে পারে। হেগসেথ জানান তারা কংগ্রেসের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করছেন যাতে বর্তমান ও ভবিষ্যতের যুদ্ধ খরচের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ পাওয়া যায় এবং ব্যবহৃত গোলাবারুদের ঘাটতি দ্রুত পূরণ করা সম্ভব হয়। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন শুধু ইরান নয় বরং বিশ্ব পরিস্থিতি ক্রমশ অস্থিতিশীল হওয়ায় আরও বিভিন্ন কারণে এই অর্থের প্রয়োজন রয়েছে। তিনি বলেন যুক্তরাষ্ট্রের শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে প্রচুর গোলাবারুদ মজুত রাখা অপরিহার্য।

যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাবে বিশ্ববাজারেও বড় ধরনের চাপ পড়েছে। ইরান হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দেওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে এবং গ্যাসের দামেও এর মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। এই যুদ্ধের একটি নতুন মাত্রা তৈরি হয়েছে। ইসরায়েলের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে হামলার জবাবে ইরান উপসাগরীয় কয়েকটি দেশের জ্বালানি স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালিয়েছে। এর ফলে পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে। সংঘাতটি একটি বড় ধরনের আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে বলে গভীর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বৃহস্পতিবার ভোরে ইরান কাতারের রাস লাফান এলএনজি স্থাপনায় আকস্মিক হামলা চালায়। এর পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোতেও আঘাত হানা হয়। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে চরম উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সাউথ পার্স বিশ্বের সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত। এটি কাতারের নর্থ ডোম গ্যাসক্ষেত্রের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ইরানের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো এই গ্যাসক্ষেত্র। বুশেহরের আসালুয়েহ এই গ্যাস ব্যবস্থার মূল কেন্দ্র যেখানে উৎপাদন থেকে শুরু করে রপ্তানি পর্যন্ত সবকিছু পরিচালিত হয়।

তাই এখানে বড় ধরনের হামলা হলে পুরো জ্বালানি ব্যবস্থাই ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর আগে ইসরায়েল ইরানের গোয়েন্দামন্ত্রী ইসমাইল খাতিবকে হত্যা করে এবং গ্যাস স্থাপনাতেও হামলা চালায় বলে জোরালো অভিযোগ রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কড়া সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন ইরান যদি কাতারে হামলা অব্যাহত রাখে তবে ইরানের সাউথ পার্সের পুরো এলাকা ধ্বংস করে দেওয়া হতে পারে।

যদিও তিনি দাবি করেছেন ওই নির্দিষ্ট গ্যাসক্ষেত্রে হামলার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন তাদের জ্বালানি স্থাপনায় হামলার জবাবে এখন পর্যন্ত খুব সীমিত মাত্রায় শক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। তবে হামলা চলতে থাকলে ইরান আর কোনো ধরনের সংযম দেখাবে না বলে তিনি স্পষ্টভাবে সতর্ক করেন। সার্বিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি অবকাঠামোকে কেন্দ্র করে এই হামলা ও পাল্টা হামলা এখন পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলকে এক ভয়াবহ সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের ওপর প্রতিশোধমূলক কোনো হামলা চালাবে কি আধুনিক তা এখনো পুরোপুরি অনিশ্চিত। তবে এমন কিছু ঘটলে এই সংঘাতে সম্পূর্ণ নতুন এক অধ্যায় শুরু হতে পারে।

বুধবার সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ রিয়াদে ১২টি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে জানান প্রয়োজনে তারা সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণের পূর্ণ অধিকার রাখেন। তিনি ইরানকে সতর্ক করে বলেন এই ধরনের চাপ রাজনৈতিক ও নৈতিকভাবে সম্পূর্ণ বিপরীত ফল বয়ে আনতে পারে। বৃহস্পতিবার তিনি আরও বলেন সৌদি আরব এবং প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোর তাদের ওপর হামলা সহ্য করার ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত এবং তেহরানকে অবিলম্বে তাদের কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে হবে।

কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁর সঙ্গে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেছেন। পরবর্তীতে জানানো হয় নেতারা ইরানের এই হামলাকে বিপজ্জনক উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষক মেহরান কামরাভা মনে করেন ইরানের বাড়তে থাকা হামলায় উপসাগরীয় দেশগুলো কূটনৈতিকভাবে অত্যন্ত কঠিন এক অবস্থায় পতিত হয়েছে।

একদিকে তারা প্রতিক্রিয়া দেখাতে ইচ্ছুক আবার অন্যদিকে সরাসরি যুদ্ধে জড়ালে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। বিশেষ করে যদি ডোনাল্ড ট্রাম্প হঠাৎ আমেরিকার বিজয় ঘোষণা করে সেখান থেকে সরে যান তাহলে এই দেশগুলোকে সম্পূর্ণ একা লড়াই করতে বাধ্য হতে হবে। বিশ্লেষকদের মতে ইসরায়েল এখন শুধু সামরিক বা পারমাণবিক স্থাপনা নয় বরং ইরানের অর্থনৈতিক মূল অবকাঠামোকেও প্রধান লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে যা এই সংঘাতকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা আরও জানান কাতারের নর্থ ডোম গ্যাসক্ষেত্র ইউরোপ ও এশিয়ায় এলএনজি সরবরাহের বড় একটি অংশ পূরণ করে। ইরানের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে অস্থিরতা বাড়লে এটি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকেও মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করতে পারে। এ ছাড়া ইসরায়েলের নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্র লেভিয়াথান, তামার ও কারিশ প্রতিশোধমূলক হামলার চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।

এর ফলে পূর্ব ভূমধ্যসাগর অঞ্চলেও একটি বড় ধরনের জ্বালানি সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। গ্যাস স্থাপনাগুলোতে ইসরায়েলের এই হামলা প্রমাণ করছে যে চলমান সংঘাতটি এখন কেবল সামরিক সংঘর্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই বরং এটি একটি জ্বালানিকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক যুদ্ধে মোড় নিয়েছে।

এ এম/ ২০ মার্চ ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language