ইসলামে নারীর মর্যাদা: অধিকার ও দায়িত্বের ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি

, ৮ মার্চ – মানবসভ্যতার ইতিহাসে নারীকে কেন্দ্র করে যুগে যুগে নানা মত ও দর্শন গড়ে উঠেছে। কখনো নারীকে চরমভাবে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে আবার কোথাও তাকে অবাধ স্বাধীনতার নামে ভোগ্যপণ্যে রূপান্তর করা হয়েছে।
এই দুই চরম প্রান্তের মধ্যবর্তী স্থানে দাঁড়িয়ে ইসলাম নারীর জন্য উপস্থাপন করেছে অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ এক জীবনব্যবস্থা। ইসলাম নারীকে কেবল অধিকারই প্রদান করেনি বরং তার সম্মান ও দায়িত্বের এমন একটি কাঠামো তৈরি করে দিয়েছে যা ব্যক্তি এবং সমাজকে সুশৃঙ্খল করতে সহায়তা করে।
ইসলাম আগমনের পূর্বে তৎকালীন আরব সমাজে নারীদের অবস্থা ছিল বর্ণনাতীত করুণ। কন্যাসন্তান জন্মদানকে তখন চরম লজ্জার বিষয় বলে গণ্য করা হতো এবং জীবন্ত কন্যাশিশুকে মাটিতে পুঁতে ফেলার মতো নিষ্ঠুর প্রথা প্রচলিত ছিল।
পবিত্র কোরআনে সেই ভয়াবহতার চিত্র তুলে ধরে প্রশ্ন করা হয়েছে যে কোন অপরাধে তাদের হত্যা করা হয়েছিল। এমন এক অমানবিক প্রেক্ষাপটে ইসলাম ঘোষণা করে যে নর ও নারী নির্বিশেষে মানুষের মর্যাদা সমান। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে উল্লেখ করেছেন যে তিনি মানুষকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকেই সৃষ্টি করেছেন। এই ঘোষণার মাধ্যমে মানবজাতির মৌলিক ঐক্যের বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং নারীর অধিকারকে আল্লাহপ্রদত্ত অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। নারীর অর্থনৈতিক অধিকারের বিষয়েও ইসলাম সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে।
পুরুষের উপার্জনে যেমন তার অধিকার রয়েছে তেমনি নারীর উপার্জনেও তার নিজস্ব অধিকার সাব্যস্ত করা হয়েছে। ইসলাম নারীর সম্পদের স্বাধীন মালিকানা নিশ্চিত করেছে যা প্রাচীন অনেক সভ্যতায় ছিল অনুপস্থিত। একজন নারী তার উপার্জন বা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদের পূর্ণ মালিক হওয়ার অধিকার রাখেন। বিবাহের ক্ষেত্রেও নারীর সম্মতিকে ইসলাম অপরিহার্য শর্ত হিসেবে গণ্য করেছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্ট করে বলেছেন যে কোনো নারীকে তার অনুমতি বা মতামত ছাড়া বিবাহ দেওয়া যাবে না।
তবে ইসলাম কেবল অধিকার দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি বরং দায়িত্বের কথাও সমান গুরুত্বের সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। কারণ অধিকার ও দায়িত্বের সমন্বয় ছাড়া কোনো সমাজ টেকসই হতে পারে না। একজন নারী তার স্বামীর গৃহের দায়িত্বশীল এবং তিনি তার এই দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবেন। সন্তানের নৈতিকতা এবং ঈমানি বুনিদ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে মায়ের ভূমিকা অনস্বীকার্য। ইসলামের ইতিহাসে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের বহু নজির রয়েছে। উম্মুল মুমিনীন খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা ছিলেন ইসলামের প্রথম যুগের এক বিশাল স্তম্ভ।
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা ছিলেন জ্ঞান ও ফিকহ শাস্ত্রের উজ্জ্বল নক্ষত্র যার কাছ থেকে অসংখ্য সাহাবি শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। জ্ঞান অর্জন করা নর ও নারী উভয়ের জন্যই ইসলামে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বর্তমান আধুনিক বিশ্বে নারীর অধিকার নিয়ে প্রচুর আলোচনা হলেও ভোগবাদী সংস্কৃতিতে নারীকে অনেক সময় পণ্যে পরিণত করার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। এর বিপরীতে ইসলাম নারীর সম্মান ও নিরাপত্তাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়।
পুরুষদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন তারা নারীদের সঙ্গে সদ্ভাবে জীবনযাপন করে। আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রেক্ষাপটে মুসলিম সমাজের জন্য নারীর প্রকৃত মর্যাদা অনুধাবন করা জরুরি। ইসলাম নারীকে যে সম্মান ও অধিকার দিয়েছে তা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে পরিবার ও সমাজ শক্তিশালী হবে। নারীর মর্যাদা কোনো বিশেষ দিবসের ফ্রেমে বন্দি নয় বরং এটি একটি চিরন্তন মূল্যবোধ।
এম ম/ ৮ মার্চ ২০২৬









