
২০২৬ সালের ২ মার্চের সকাল। ঢাকা থেকে নিউইয়র্ক, সিলেট থেকে নিউ জার্সি, চট্টগ্রাম থেকে টেক্সাস। ভিন্ন ভিন্ন শহরে ছড়িয়ে থাকা হাজারো পরিবারের ফোনে একই নোটিফিকেশন, একই প্রশ্ন, একই দীর্ঘশ্বাস। কারও কেস নম্বর বহু মাস ধরে “ডকুমেন্টস কমপ্লিট” অবস্থায়, কারও সাক্ষাৎকারের তারিখ ঠিক হয়েও পিছিয়েছে, কারও আবার সবকিছু শেষ, শুধু ভিসা ইস্যুর অপেক্ষা। ঠিক এমন সময় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক সিদ্ধান্ত তাদের ভবিষ্যৎকে স্থগিতচিহ্নের ভেতর আটকে দিল।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ঘোষণায় বলা হয়, বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে থামিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের মূলে রয়েছে একটি রূঢ় বাস্তবতা। ‘পাবলিক বেনিফিট’ বা সরকারি সহায়তার ওপর অভিবাসীদের একটি বড় অংশের মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এবং সিস্টেমকে ফাঁকি দিয়ে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার প্রবণতা। আমেরিকান আইনের ভাষায় ‘পাবলিক চার্জ’ বলতে এমন ব্যক্তিকে বোঝায়, যিনি নিজের ভরণপোষণে অক্ষম এবং জীবনধারণের জন্য পুরোপুরি রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা গেছে, বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের অনেক অভিবাসী যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের পরপরই কাজ করার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কৌশলে সরকারি সাহায্যের তালিকায় নাম লিখিয়েছেন।
এপি নিউজ জানিয়েছে, পররাষ্ট্র দপ্তর ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ এ এই স্থগিতাদেশের কথা জানায় এবং যুক্তি হিসেবে তুলে ধরে, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নাগরিকরা যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকালে তুলনামূলকভাবে বেশি হারে পাবলিক অ্যাসিস্ট্যান্স গ্রহণ করে থাকে। এই সিদ্ধান্তকে ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতির কড়াকড়ির একটি নতুন ধাপ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। কমিউনিটি পর্যায়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি হলো, অনেকেই নগদ অর্থে (ক্যাশ পেমেন্ট) কাজ করেন, যার কোনো দাপ্তরিক রেকর্ড থাকে না। ট্যাক্স রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় তারা নিজেদের বার্ষিক আয় দারিদ্র্যসীমার নিচে দেখান। এতে একদিকে পকেটে নগদ ডলার আসে, অন্যদিকে কাগজে কলমে ‘দরিদ্র’ সেজে ফুড স্ট্যাম্প (SNAP), স্বল্পমূল্যের আবাসন (Section 8 housing) এবং বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা (Medicaid) গ্রহণ করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে ইমিগ্র্যান্ট হয়ে আসার বড় একটি শর্ত হলো একজন স্পনসর থাকা এবং সেই স্পনসরের স্বাক্ষরিত ‘অ্যাফিডেভিট অব সাপোর্ট’, যেখানে নবাগত অভিবাসী রাষ্ট্রের ওপর বোঝা হবেন না বলে অঙ্গীকার করা হয়। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে এই দায়বদ্ধতা কাগজে সীমাবদ্ধ থেকে যায়। অভিযোগ আছে, আমেরিকায় পৌঁছানোর কিছুদিনের মধ্যেই কেউ কেউ স্পনসরের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের পরিস্থিতি তৈরি করে সরকারি দপ্তরে নিজেদের ‘নিরাশ্রয়’ দাবি করেন, ফলে সহায়তার দায়িত্ব গিয়ে পড়ে রাষ্ট্রের কাঁধে।
অভিযোগের তালিকায় আরও কিছু বিষয় ঘুরে ফিরে আসে। যেমন, অনেক বাংলাদেশি অভিবাসী বাংলাদেশে তাদের স্থাবর সম্পত্তি বা বড় অংকের ব্যাংক ব্যালেন্সের তথ্য যথাযথভাবে প্রকাশ করেন না, কিংবা যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে নিজের আর্থিক অবস্থাকে বাস্তবের চেয়ে দুর্বল হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেন। আমেরিকার নিয়ম অনুযায়ী, সম্পদ থাকলে সরকারি সুবিধা পাওয়া যায় না। অথচ বাংলাদেশে অঢেল সম্পদ থাকার পরেও অনেকে আমেরিকায় এসে নিজেদের নিঃস্ব প্রমাণ করে সোশ্যাল সিকিউরিটি বেনিফিট আদায়ের প্রতিযোগিতায় নামেন। আবার কোথাও কোথাও কৃত্রিমভাবে ডিভোর্স বা পারিবারিক কলহ দেখিয়ে আলাদা বাসা এবং অতিরিক্ত ভাতা আদায়ের মতো অনৈতিক কাজও করে থাকেন।
প্রশাসনের দৃষ্টিতে এ ধরনের পরিকল্পিত প্রতারণা মার্কিন করদাতাদের অর্থের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। বাংলাদেশে মার্কিন দূতাবাসের ইমিগ্র্যান্ট ভিসা সংক্রান্ত নোটিশেও স্থগিতাদেশের ব্যাখ্যায় এই উদ্বেগের কথাই উল্লেখ করা হয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরও একটি তীক্ষ্ণ দিক উঠে আসে। স্টেট ডিপার্টমেন্টের একটি কেবল অনুসারে কনস্যুলার কর্মকর্তাদের এমন আবেদনও ফিরিয়ে দিতে বলা হয়েছে, যেগুলো আগে প্রিন্ট অথরাইজড ছিল কিন্তু ভিসা ছাপা হয়নি, অথবা ছাপা হলেও কনস্যুলার সেকশন থেকে এখনও ছাড় পায়নি। ফলে বহু মানুষের কাছে যে ফাইলটি প্রায় শেষ দরজায় পৌঁছেছিল, সেটিও এক মুহূর্তে পিছিয়ে যায়। কাগজে কলমে এটি প্রশাসনিক বিরতি, কিন্তু বাস্তবে এর সবচেয়ে বড় অভিঘাত পড়ে পরিবার পুনর্মিলনের ওপর। যাদের জীবন দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশে ভাগ হয়ে আছে, তাদের অপেক্ষা শুধু দীর্ঘ হয় না, অপেক্ষার ভেতরে ঢুকে পড়ে নতুন অনিশ্চয়তা। সন্তানকে কাছে নেওয়ার স্বপ্ন, জীবনসঙ্গীকে পাশে পাওয়ার আশা, কিংবা বাবা মাকে শেষ বয়সে পাশে টানার আকুতি সবকিছুই যেন একটি স্থগিতচিহ্নের নিচে আটকে যায়।
স্বার্থান্বেষী মহলের এই জালিয়াতির খেসারত দিতে হচ্ছে পুরো জাতিকে। বাংলাদেশি পাসপোর্টের মর্যাদা আজ তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। মার্কিন কনস্যুলার অফিসাররা এখন প্রতিটি বাংলাদেশি আবেদনকারীকে সন্দেহের চোখে দেখছেন। এই স্থগিতাদেশের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সেই সব প্রকৃত স্বপ্নবাজ তরুণ, যারা মেধাবী ছাত্র হিসেবে বা উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী হিসেবে আমেরিকায় গিয়ে দেশের মুখ উজ্জ্বল করতে চেয়েছিলেন। যারা আইন মেনে চলতে চান, তাদের ভবিষ্যৎ আজ অনিশ্চয়তার অন্ধকারে।
একসময় বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মনে এমন এক ভ্রান্ত ধারণা কাজ করত যে, যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করা বুঝি তাদের এক প্রকার অধিকার। কিন্তু এই ‘অধিকার’ আদায়ের নামে যে অনৈতিক সংস্কৃতির চর্চা শুরু হয়েছে, তার ফলে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি দারুণভাবে ক্ষুন্ন হয়েছে এবং দেশটি আজ ‘উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ’ দেশের তালিকায় স্থান পেয়েছে।
তথ্যসূত্র:
U.S. Embassy in Bangladesh (২ মার্চ ২০২৬)
Reuters (২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)
AP News (১৪ জানুয়ারি ২০২৬)









