
উত্তর আমেরিকার দীর্ঘতম সীমান্তরেখা এক সময় ছিল ভরসার প্রতীক। দুই প্রতিবেশী দেশ নিজেদের মতভেদ মিটিয়েছে টেবিলে, আদালতে, চুক্তির পাতায়। কিন্তু এখন সেই সীমান্তের হাওয়ায় কথার বিষ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফিরে আসার পর কানাডাকে “যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম রাজ্য” বানানোর কথা বারবার তোলেন। তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র নাকি প্রতিবছর কানাডাকে ‘শত শত বিলিয়ন ডলারের ভর্তুকি’ দেয়, আর সেটি না থাকলে কানাডা টিকে থাকতে পারবে না। কানাডা এই বক্তব্যকে শুধু অপমান হিসেবে নয়, নিজেদের সার্বভৌমত্বের প্রতি প্রকাশ্য হুমকি হিসেবেও দেখছে।
এই প্রেক্ষাপটে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি পাল্টা ভাষা বেছে নিয়েছেন আত্মমর্যাদার। ট্রাম্পের বক্তব্যের জবাবে তিনি বলেন, “কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের দয়ায় টিকে নেই, কানাডা টিকে আছে নিজেদের মূল্যবোধ ও পরিচয়ে। আমরা কানাডীয়, আমাদের ঘরের মালিক আমরাই।” মার্ক কার্নির এই বক্তব্য দ্রুত কানাডীয় রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। শুধু তাঁর দলীয় সমর্থকদের নয়, প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক শিবিরের কিছু অংশের কাছ থেকেও এটি ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পেয়েছে। ফলে বিষয়টি এখন দলীয় বিতর্ক ছাড়িয়ে কানাডার জাতীয় মর্যাদার প্রশ্নে রূপ নিয়েছে।
কানাডার সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে এখন দেশপ্রেমের এক নতুন জোয়ার দেখা যাচ্ছে। ট্রাম্পের বক্তব্য ও শুল্ক হুমকির জবাবে অনেকেই মার্কিন পণ্য বর্জন এবং ‘বাই কানাডীয়’ (Buy Canadian) প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন। রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, কানাডিয়দের মাঝে যুক্তরাষ্ট্র সফর ও মার্কিন পণ্যের প্রতি আগ্রহ কমেছে এবং দেশীয় পণ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মনোভাব জোরালো হয়েছে। রাস্তায়, দোকানে, সামাজিক মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে এক ধরনের নতুন জাতীয় সংহতি। সাধারণ মানুষের মন্তব্য, “আমরা যুক্তরাষ্ট্রের কোনো উপনিবেশ নই।” প্রধানমন্ত্রী কার্নিও ভিডিও বার্তায় বলেছেন, বাইরের চাপের মধ্যে কানাডিয়ানরা যেটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সেটাই করবে, নিজেদের অর্থনীতির সেরা ক্রেতা নিজেরাই হবে।
এই উত্তেজনার পেছনে কয়েকটি কারণ একসঙ্গে কাজ করছে, আর প্রতিটি কারণই আলাদা করে বিস্ফোরক। প্রথম কারণ, সার্বভৌমত্ব নিয়ে ট্রাম্পের উসকানি। কানাডাকে ৫১তম রাজ্য করার কথা তিনি ২০২৪ নির্বাচন জয়ের পর থেকেই তুলছেন, সাম্প্রতিক সময়েও সেই সুর থামেনি। তাঁর বক্তব্য ও সামাজিক মাধ্যমের প্রচার কানাডায় ক্ষোভ বাড়িয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ কমেছে, মার্কিন পণ্য বর্জনের প্রবণতা বেড়েছে, আর “কানাডিয়ান পণ্য কিনুন” মনোভাব শক্ত হয়েছে।
দ্বিতীয় কারণ, শুল্ককে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার। ২০২৬ সালের ২৪ জানুয়ারি ট্রাম্প হুমকি দেন, কানাডা যদি চীনের সঙ্গে বাণিজ্য সমঝোতা বাস্তবায়নের পথে যায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র কানাডার সব পণ্যের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক দিতে পারে। এই এক ঘোষণাই ব্যবসা, বিনিয়োগ, চাকরি এবং বাজারকে একসঙ্গে কাঁপিয়ে দিয়েছে।
তৃতীয় কারণ, কানাডার চীন নীতিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সন্দেহ। প্রধানমন্ত্রী কার্নি অতি সম্প্রতি চীনে গিয়ে একটি বড় ধরনের বাণিজ্য সমঝোতা করেন। রয়টার্সের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এর আওতায় কানাডা প্রথম ধাপে সর্বোচ্চ ৪৯,০০০ চীনা ইলেকট্রিক ভেহিকল (EV) ৬.১ শতাংশ এমএফএন শুল্কে আমদানির সুযোগ দেবে, যা আগের ১০০ শতাংশ শুল্কের তুলনায় বড় পরিবর্তন। বিনিময়ে কানাডার কৃষিপণ্য চীনের বাজারে উল্লেখযোগ্য সুবিধা পাবে। ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হয়ে বলেছেন, কানাডা চীনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ‘ড্রপ অফ পোর্ট’ হিসেবে কাজ করতে চাইছে।
চতুর্থ কারণ, বিশ্বব্যবস্থা ও ভূরাজনীতি নিয়ে কার্নির অবস্থান। সম্প্রতি দাভোসে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের মঞ্চে কার্নি বলেছেন নিয়মভিত্তিক বৈশ্বিক শৃঙ্খলা আগের মতো নেই, শক্তিধর দেশগুলো অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরতাকে চাপের হাতিয়ার বানাচ্ছে, তাই মধ্যম শক্তিগুলোকে একসঙ্গে দাঁড়াতে হবে। এই বক্তব্য দাভোসে বিশাল প্রশংসা পেয়েছে, এমনকি দাঁড়িয়ে অভিবাদনও হয়েছে। ট্রাম্প পাল্টা বলে বসেন, কানাডা নাকি যুক্তরাষ্ট্রের কারণেই টিকে আছে। কার্নি প্রকাশ্যে তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং বলেন কানাডা কানাডীয়ান বলেই সমৃদ্ধ।
পঞ্চম কারণ, ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ‘গোল্ডেন ডোম’ বা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সেখানে একটি বিশাল রাডার ও প্রতিরক্ষা ঢাল তৈরি করতে চান, যা উত্তর আমেরিকাকে সুরক্ষা দেবে। কানাডা এই প্রকল্পের বিশাল ব্যয়ভার বহন করতে এবং উত্তর মেরুর সামরিকীকরণে অনীহা প্রকাশ করায় ট্রাম্প কানাডাকে ‘অকৃতজ্ঞ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। ট্রাম্পের বক্তব্য কার্নি সরকারের সঙ্গে আরও মতপার্থক্য বাড়িয়েছে।
এই উত্তেজনার ভেতরেও বাস্তবতা হলো, কানাডা যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের শেকড় খুব গভীর। ১৯০৯ সালের বাউন্ডারি ওয়াটার্স ট্রিটি সীমান্তবর্তী পানি ব্যবস্থাপনায় নিয়ম তৈরি করে এবং দুই দেশের মধ্যে স্থায়ী সমন্বয়ের ভিত্তি গড়ে তোলে। ১৯৫৮ সালের ‘নর্যাড’ (NORAD) চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশ তাদের আকাশসীমা রক্ষার দায়িত্ব ভাগ করে নিয়েছিল।
অর্থনীতির ভাষায় বললে, এই দুই দেশ একে অপরের রক্তনালীর মতো। প্রতিদিন এই সীমান্তে প্রায় ৩.৬ বিলিয়ন কানাডিয় ডলারের পণ্য ও সেবা আদান-প্রদান হয়। ১৯৮৮ সালের ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট (FTA) থেকে শুরু করে ১৯৯৪ সালের নাফটা (NAFTA) এবং বর্তমানে কার্যকর থাকা ইউএসএমসিএ (USMCA), প্রতিটি চুক্তিই দুই দেশের ব্যবসাকে সমন্বিত বাজারের রূপ দিয়েছে। কানাডার মোট রপ্তানির প্রায় ৭৫ শতাংশই যায় যুক্তরাষ্ট্রে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ৩৬টিরও বেশি অঙ্গরাজ্যের প্রধান রপ্তানি গন্তব্য হলো কানাডা। কিন্তু এই অটুট বন্ধনেই আজ দেখা দিয়েছে বড় ধরনের ফাটল।
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার এই নজিরবিহীন বিরোধ বিশ্ব রাজনীতিতেও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ইউরোপীয় কূটনৈতিক মহলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, ঘনিষ্ঠ মিত্রদের এমন টানাপোড়েন বৈশ্বিক বাণিজ্য ও নিরাপত্তা সহযোগিতার কাঠামোকে আরও অনিশ্চিত করে তুলতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘে কানাডার প্রতিনিধি বব রে ট্রাম্পের প্রস্তাবকে ‘প্রটেকশন র্যাকেট’ বা চাঁদাবাজির সাথে তুলনা করেছেন।
বিশ্বের অনেক দেশই মনে করছে, যদি যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মতো ঘনিষ্ঠতম মিত্রদের সম্পর্ক যদি এতটা টালমাটাল হয়ে ওঠে, তবে বিশ্বের কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তিই আর নিরাপদ নয়। এর ফলে বিশ্ব ধীরে ধীরে এমন এক বাস্তবতার দিকে এগোতে পারে, যেখানে প্রতিটি দেশ কেবল নিজের স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দেবে, আর বহুপাক্ষিক সহযোগিতার পরিসর সংকুচিত হয়ে যাবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার এই টানাপোড়েন কেবল বাণিজ্যের অঙ্ক নয়, এটি সম্মান, পরিচয়, আর সার্বভৌমত্বের ভাষা। সীমান্তের ওপারে যদি কেউ বলে, তোমার ঠিকানা বদলে দেবে, এপারের মানুষ তখন কেবল শুল্কের হিসাব করে না, তারা নিজেদের অস্তিত্বের হিসাব করে। ২০২৬ সালের ১ জুলাই ইউএসএমসিএ চুক্তির প্রথম যৌথ পুনর্মূল্যায়নের সময় এই সম্পর্কের চূড়ান্ত অগ্নিপরীক্ষা হবে।
তথ্যসূত্র:
Reuters (২৪ জানুয়ারি ২০২৬)
AP News (২৪ জানুয়ারি ২০২৬)
The Washington Post (২৪ জানুয়ারি ২০২৬)
Government of Canada
Congressional Research Service









