
অ্যাটলান্টিক উপকূলের ওপারে, ইতিহাসের গভীর স্রোতে গড়া এক রাজ্যের নাম ভার্জিনিয়া। এই রাজ্যই এক সময় আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের পীঠস্থান ছিল, এখান থেকেই জন্ম নিয়েছিল জর্জ ওয়াশিংটনের নেতৃত্বে নতুন এক রাষ্ট্রের স্বপ্ন। সেই রাজ্যের রাজনৈতিক মানচিত্রে আজ এক নতুন অধ্যায় লিখছেন দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত এক নারী গাজালা ফেরদৌস হাশমী।
গাজালা হাশমীর জন্ম ১৯৬৪ সালের ৫ জুলাই, ভারতের ঐতিহাসিক শহর হায়দরাবাদে। মাত্র চার বছর বয়সে তিনি মা ও বড় ভাইয়ের সঙ্গে পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। সে সময় কেউ কল্পনাও করেনি, এই ছোট্ট মেয়েটি একদিন আমেরিকার রাজনীতির মঞ্চে দক্ষিণ এশীয় নারীর পথপ্রদর্শক হয়ে উঠবে।
গাজালার শিক্ষাজীবন ছিল সাহিত্য ও মানবিকতার আলোয় ভরপুর। তিনি জর্জিয়া সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি থেকে ইংরেজি বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেন এবং পরবর্তীতে আটলান্টার এমোরি ইউনিভার্সিটি থেকে ইংরেজি সাহিত্যে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
২০১৯ সালে গাজালা হাশমী প্রথমবারের মতো ভার্জিনিয়ার সিনেট নির্বাচনে অংশ নেন। তিনি ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থী হিসেবে রিচমন্ডের দক্ষিণাংশের ১০ নম্বর জেলা থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং সে নির্বাচনে তিনি জয়লাভ করেন। এই বিজয় কেবল তাঁর ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং বহুত্ববাদী আমেরিকার সামাজিক ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের সূচনা।
গাজালা হাশমী শিক্ষা সংস্কারে দৃঢ় বিশ্বাসী। তার প্রস্তাবিত নীতিগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো পাবলিক স্কুলে সমান অর্থায়ন, উচ্চশিক্ষায় ব্যয় হ্রাস, এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ।
তিনিই প্রথম একজন যিনি কমিউনিটি কলেজে টিউশন ফি মওকুফ কর্মসূচির পক্ষে সোচ্চার হন, যাতে নিম্নবিত্ত ও অভিবাসী পরিবারের সন্তানরাও উচ্চশিক্ষায় প্রবেশাধিকার পায়।
স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে তিনি ‘affordable healthcare for all’ নীতিকে সমর্থন করেছেন। তিনি বলেছেন, “একটি সমাজ তখনই মানবিক হয়, যখন তার প্রতিটি নাগরিক চিকিৎসা পাওয়ার নিশ্চয়তা অনুভব করে।”
গাজালা হাশমী পরিবেশগত ন্যায়বিচার নিয়েও সক্রিয়। তিনি জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইকে নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে দেখেন। ভার্জিনিয়ার উপকূলীয় অঞ্চলগুলোকে বন্যা ও সমুদ্রস্তর বৃদ্ধির ঝুঁকি থেকে রক্ষায় তিনি নানা প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন।
২০২৫ সালের ১৭ জুন অনুষ্ঠিত হয় ভার্জিনিয়ার লেফটেন্যান্ট গভর্নর পদে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রাইমারি নির্বাচন। এই নির্বাচনে গাজালা ফেরদৌস হাশমী ঘনিষ্ঠ প্রতিদ্বন্দ্বী লেভার স্টোনি ও অ্যারন রাউসকে পরাজিত করেন।
এরপর ৪ নভেম্বর ২০২৫ সালে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে গাজালা হাশমী রিপাবলিকান প্রার্থী জন রিডকে পরাজিত করে ভার্জিনিয়ার নতুন লেফটেন্যান্ট গভর্নর হিসেবে নির্বাচিত হন। এর মধ্য দিয়ে ভার্জিনিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত মুসলিম নারী রাজ্য পর্যায়ের নির্বাহী পদে বিজয়ের মুকুট অর্জন করেন।

গাজালা হাশমীর স্বামী আজহার রফিক একজন শিক্ষাবিদ ও লেখক। তাদের দুই কন্যা সন্তান রয়েছে, যারা নিজেদের পেশাগত জীবনে মায়ের নৈতিক আদর্শে অনুপ্রাণিত। পরিবার, শিক্ষা ও সমাজের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার এক অনন্য উদাহরণ তিনি।
গাজালা হাশমী আজ কেবল ভার্জিনিয়ার রাজনীতিতে নয়, সমগ্র আমেরিকায় অভিবাসী নারীদের অনুপ্রেরণার প্রতীক। তিনি মনে করেন, যে কেউ, যে পটভূমিতেই জন্মাক না কেন, যদি ন্যায় ও অধ্যবসায়ের পথে অবিচল থাকে, তবে একদিন পরিবর্তনের ইতিহাস সে-ও লিখতে পারে।









