
ইংল্যান্ডের হৃদয়ে, ইতিহাস ও আধুনিকতার সংমিশ্রণে গড়া এক প্রাণবন্ত নগরীর নাম লিডস। এ শহরে রয়েছে শিল্পবিপ্লবের উত্তরাধিকার, শিক্ষার উজ্জ্বল দ্যুতি, এবং নানা জাতি-ভাষার মানুষের সহাবস্থান।
লিডস এমন এক শহর, যেখানে অতীত কখনও বিলীন হয় না; বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন মুখে ফিরে আসে। ভিক্টোরিয়ান স্থাপত্যের গাম্ভীর্য, নদীর তীরের সবুজ আবহ, আধুনিক আকাশচুম্বী ভবন, সব মিলিয়ে লিডস যেন ইতিহাস ও মানবপ্রয়াসের মিলনে গড়া এক সজীব নগরনাট্য।

লিডস অবস্থিত ইংল্যান্ডের উত্তরাংশে, ওয়েস্ট ইয়র্কশায়ার (West Yorkshire) কাউন্টির প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে। এটি River Aire-এর তীরে গড়ে ওঠা এক ঐতিহাসিক নগরী, যা পাহাড়ি উপত্যকা ও সবুজ প্রান্তর ঘেরা এক মোহনীয় অঞ্চল।
লন্ডন থেকে প্রায় ২৭০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত এই শহরটি রেল ও সড়ক যোগাযোগে ব্রিটেনের অন্যতম ব্যস্ত কেন্দ্র। এই শহরে প্রতিদিন শত শত ট্রেন চলাচল করে; লন্ডন, ম্যানচেস্টার, ইয়র্ক, নিউক্যাসল ও এডিনবরার সঙ্গে সহজ যোগাযোগ স্থাপন করেছে।

১৭শ শতাব্দীতে শুরু হওয়া শিল্পবিপ্লব লিডসের ভাগ্য বদলে দেয়। এখানে গড়ে ওঠে অসংখ্য বস্ত্রকল, উলের কারখানা, লোহা ও মেশিন শিল্প। নদী এয়ারের জলপথ ব্যবহার করে পণ্য পরিবহন হতো লন্ডন ও ইউরোপের বিভিন্ন বন্দরনগরে। ১৯শ শতাব্দীতে রেলওয়ে সংযোগ স্থাপনের পর লিডস উত্তর ইংল্যান্ডের অন্যতম শিল্পনগরীতে পরিণত হয়। লন্ডনের বাইরে যুক্তরাজ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যাংকিং ও ইনস্যুরেন্স সেক্টর এখানেই।
লিডস এখন ওয়েস্ট ইয়র্কশায়ার কাউন্টির সবচেয়ে বড় শহর এবং ইউরোপের অন্যতম শিক্ষানগরী। ১৮৭৪ সালে প্রতিষ্ঠিত University of Leeds এখন যুক্তরাজ্যের শীর্ষ গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি। এখানে বিশ্বের নানা দেশ থেকে ছাত্রছাত্রী উচ্চশিক্ষার জন্য আসে।

এছাড়া রয়েছে Leeds Beckett University, Leeds Trinity University, এবং বহু কলেজ ও টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট। প্রতি বছর প্রায় এক লাখ শিক্ষার্থী এখানে অধ্যয়ন করে, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আন্তর্জাতিক ছাত্র।
বাংলাদেশ থেকেও অসংখ্য তরুণ-তরুণী এখানে আসে উচ্চশিক্ষার জন্য। বিশেষ করে বিজনেস ম্যানেজমেন্ট, কম্পিউটার সায়েন্স, ফার্মেসি ও পাবলিক হেলথ বিষয়ে। এদের মধ্যে অনেকে পরবর্তীতে এখানেই স্থায়ীভাবে কর্মজীবন গড়ে তুলছে।
লিডস এক প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক শহর। এখানে সারা বছর চলে সংগীত উৎসব, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী ও নাট্যমেলা। Leeds International Film Festival, Leeds West Indian Carnival, Light Night Leeds—এসব আয়োজন শহরকে উৎসবের নগরীতে রূপ দেয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর লিডস অভিবাসীদের জন্য এক নতুন ঠিকানা হয়ে ওঠে। প্রথমে ক্যারিবিয়ান, আফ্রিকান ও দক্ষিণ এশীয়রা এখানে আসে, পরবর্তীতে পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশ থেকে বড় পরিসরে অভিবাসন ঘটে।
বাংলাদেশিদের আগমন শুরু হয় মূলত ১৯৭০-এর দশকে। প্রথম প্রজন্মের অভিবাসীরা এসেছিলেন সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলা থেকে। তারা প্রথমে টেক্সটাইল ফ্যাক্টরি, রেস্টুরেন্ট ও ট্যাক্সি সার্ভিসে কাজ শুরু করেন। ধীরে ধীরে অনেকে ব্যবসায় ও উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান।

Harehills, Beeston Hill, Burley, Chapel Allerton ও Hyde Park এলাকায় আজ অসংখ্য বাংলাদেশি পরিবার বসবাস করছে। গ্রোসারি দোকান, রেস্টুরেন্ট, মসজিদ ও সাংস্কৃতিক সংগঠন মিলিয়ে এখানে যেন ছোট্ট এক বাংলাদেশ গড়ে উঠেছে। নতুন প্রজন্মের অনেকে ডাক্তার, আইনজীবী, শিক্ষক ও ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে স্থানীয় সমাজে কাজ করছেন।
লিডস ও আশপাশের অঞ্চলে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতদের রাজনৈতিক অগ্রযাত্রা আজ সুস্পষ্ট। স্থানীয় কাউন্সিল নির্বাচনে অংশ নিয়ে তাঁরা শুধু নিজেদের প্রতিনিধিত্বই করছেন না, বরং প্রমাণ করছেন অভিবাসী সমাজও মূলধারার ব্রিটিশ রাজনীতির অংশীদার। কাউন্সিলর আবদুল হান্নান, মথিন আলী, সালমা আরিফ ও আসগর আলী স্থানীয় রাজনীতিতে দায়িত্ব পালন করছেন।
লিডসের জীবনযাত্রা শান্ত, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী। ছাত্র, পরিবার ও পেশাজীবীদের জন্য এটি এক আদর্শ শহর।









