সম্পাদকের পাতা

তিন সংস্কৃতির মিলনভূমি ত্রিয়েস্তে

নজরুল মিন্টো

ইতালির উত্তর-পূর্ব প্রান্তে আড্রিয়াটিক সাগরের নীল জলরাশি ছুঁয়ে থাকা এক নগরীর নাম ত্রিয়েস্তে (Trieste)। ভৌগলিকভাবে এটি যেন তিন সংস্কৃতির মিলনস্থল; একদিকে ইতালি, অন্যদিকে স্লোভেনিয়া আর কয়েক ঘণ্টার পথেই অস্ট্রিয়া। এই মিলনভূমির কারণে শহরটির ইতিহাস ও ঐতিহ্যে আছে বৈচিত্র্য ও বর্ণিলতা। প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের যুগ থেকে ত্রিয়েস্তে ছিল এক সমৃদ্ধ বাণিজ্যকেন্দ্র। মধ্যযুগে ভেনিস প্রজাতন্ত্র ও অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যের প্রভাব শহরটিকে গড়ে তোলে এক আন্তর্জাতিক সমুদ্রবন্দরে। অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় আমলে এটি ছিল সাম্রাজ্যের প্রধান বন্দর; কফি আমদানি, বাণিজ্য, সাহিত্য ও শিল্পকলায় ত্রিয়েস্তে তখনকার ইউরোপে এক ব্যস্ততম শহর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে কিছু সময় আন্তর্জাতিক প্রশাসনের অধীনে থাকার পর অবশেষে ১৯৫৪ সালে এটি ইতালির সঙ্গে যুক্ত হয়।

ভেনিস থেকে ট্রেনে এসে যখন আমরা ত্রিয়েস্তে সেন্ট্রাল স্টেশনে পা রাখি, শহরের প্রাণচাঞ্চল্য আমাদের প্রথমেই মুগ্ধ করে। আমাদের স্বাগত জানান আইরিন পারভীন খান, যিনি প্রায় দুই দশক ধরে এ শহরে বসবাস করছেন এবং এখানে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন। আইরিন ইতালিয়ান ভাষায় সাবলীল; তাঁর সঙ্গে শহর ঘুরে দেখা ছিল এক বিশেষ অভিজ্ঞতা। তিনি শুধু দর্শনীয় স্থানগুলোই দেখাননি, ত্রিয়েস্তের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং এখানকার অভিবাসী জীবনের নানা গল্পও শোনালেন।

আইরিন এখানকার নতুন অভিবাসীদের বিভিন্নভাবে সাহায্য করে থাকেন। এখানকার বাংলাদেশি সকলে তাকে চেনে, তাকে ভরসা করে। তার অতিথিপরায়ণতা আমাদের ভ্রমণকে আরও স্মরণীয় করে তুলল।

ত্রিয়েস্তে এমন এক নগরী, যেখানে ইতিহাস, ভূগোল আর সংস্কৃতি হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে আছে। পাহাড়, সমুদ্র আর পুরোনো দুর্গ মিলে যেন রঙিন এক ক্যানভাস। শহরের কেন্দ্রে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে ‘Piazza Unità d’Italia’—যা ইউরোপের সবচেয়ে বড় সমুদ্র-সংলগ্ন চত্বর। সাদা মার্বেলের ফ্লোর, চারপাশে দৃষ্টিনন্দন ভবন আর সামনে উন্মুক্ত অ্যাড্রিয়াটিক সাগর। এই স্কয়ার শুধু স্থাপত্য নয়, ত্রিয়েস্তের রাজনৈতিক ইতিহাসেরও প্রতীক। অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় যুগের প্রাসাদোপম ভবনগুলো আজও শহরের গৌরব বহন করে।

বিকেলে আমরা গেলাম সাগরের ধারে অবস্থিত Miramare Castle-এ। উনিশ শতকে অস্ট্রিয়ান আর্চডিউক ফার্ডিনান্ড ম্যাক্সিমিলিয়ান নিজের প্রেয়সীর জন্য এই প্রাসাদ নির্মাণ করেছিলেন। সাদা রঙের দুর্গটি সমুদ্রের ঢেউ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দুর্গের বাগান থেকে দূরে দিগন্তজোড়া সমুদ্রের দৃশ্য মনে গেঁথে থাকার মতো।

ত্রিয়েস্তে শুধু বাণিজ্যনগরী নয়, এটি এক সাহিত্যিক কেন্দ্রও। আইরিশ লেখক জেমস জয়েস এখানে বহু বছর কাটিয়েছেন। ইতালীয় লেখক ইতালো সভেভো-র জন্ম এই শহরে। এখনও শহরের অলিগলিতে কফিহাউসে বসে মানুষ সাহিত্যচর্চা করে। ত্রিয়েস্তে বিশেষভাবে কফির জন্য বিখ্যাত। আন্তর্জাতিক কফি কোম্পানির সদর দপ্তর এখানেই। স্থানীয় একটি ক্যাফেতে বসে কফি খেতে খেতে অনুভব করলাম শহরের বিশেষ আবহ।

আমরা বাসে করে শহর ঘুরলাম, কখনো আবার হেঁটে হেঁটে শহরের রাস্তায় ঘুরেছি। পাহাড়ের উপর থেকে শহর ও সমুদ্রের যে দৃশ্য দেখা যায়, তা মনকে প্রশান্ত করে। প্রতিটি মোড়ে, প্রতিটি গলিতে লুকিয়ে আছে ইতিহাসের টুকরো।

ত্রিয়েস্তে ভ্রমণে এক বিশেষ অভিজ্ঞতা ছিল এখানে বসবাসরত বাংলাদেশি অভিবাসীদের সঙ্গে দেখা হওয়া। অনেকেই ছোট ছোট দোকান চালান, কেউ রেস্টুরেন্টে কাজ করেন, কেউবা বাইকে খাবার সরবরাহ করেন। তাদের জীবনে সংগ্রাম অনেক, কিন্তু পরিশ্রমী মানুষগুলো ভালো আয় করছেন। অনেকে বৈধভাবে কাজের অনুমতি পেয়েছেন, আবার অনেকে এখনও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মধ্যে রয়েছেন।

আমাদের সঙ্গে গল্প করতে করতে তারা জানালেন, কীভাবে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তারা এখানে পৌঁছেছেন। কেউ তুরস্ক হয়ে, কেউবা গ্রিসের পাহাড়-পর্বত পেরিয়ে ইতালিতে প্রবেশ করেছেন। পথ ছিল বিপজ্জনক, কষ্ট ছিল অসীম; ক্ষুধা, তৃষ্ণা, পুলিশের ভয় আর পাহাড়ি পথের ক্লান্তি। কিন্তু স্বপ্ন ছিল একটাই—একটি ভালো জীবনের। আজ তারা যখন নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন, তখন সেই কষ্টের দিনগুলো তাদের স্মৃতি হয়ে আছে বলে জানালেন।

পরবর্তী গন্তব্য: লিউব্লিয়ানা (স্লোভেনিয়া)


Back to top button
🌐 Read in Your Language