
ইউরোপের মানচিত্রে সীন নদীর বুকে ভেসে ওঠা এক স্বপ্নলোকের নাম প্যারিস। ভৌগলিকভাবে এটি ফ্রান্সের উত্তর-মধ্যভাগে অবস্থিত, যার চারপাশে ছড়িয়ে আছে ছোট ছোট শহর, শিল্পাঞ্চল ও আঙুরের খামার। নদী, সেতু আর অগণিত গলি-ঘুপচির শহরটি ইতিহাসে বারবার স্থান করে নিয়েছে সাম্রাজ্য, বিপ্লব, প্রেম আর শিল্পকলার অনন্য প্রতীক হয়ে। ফরাসি বিপ্লব থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের সংস্কৃতি বিশ্বজুড়েই প্যারিসের নাম উচ্চারিত হয়।
গত সোমবার (২২ সেপ্টেম্বর) সুইজারল্যান্ডের লুজান শহর থেকে রেলযোগে চলে এলাম ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে। কয়েক ঘন্টার এই রেলভ্রমণ ছিল মনোমুগ্ধকর। ট্রেনের জানালা দিয়ে ভেসে আসছিল পাহাড়, লেক আর কৃষিজমির সবুজ গালিচা। ওয়াইফাই সুবিধা থাকায় সারাক্ষণ ল্যাপটপে কাজও করছিলাম। স্টেশনে নেমে মনে হলো আমি যেন ইতিহাসের বুক ছিঁড়ে এক শিল্পগ্যালারিতে ঢুকে পড়েছি।
রেলস্টেশনে আমাদের রিসিভ করতে এসেছিলো আমার সহযাত্রী মুনির ভাইয়ের গ্রামের তরুণ ব্যবসায়ী আজিজুর রহমান। পরম উষ্ণতায় সে আমাদের নিয়ে গেলো বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকায়। দুপুরে ‘ইষ্টিকুটুম’ নামের এক রেস্টুরেন্টে মধ্যাহ্ন ভোজ সারলাম। এখানে অনেকের সঙ্গে পরিচয় হলো। বিশেষ করে আমার আগমনের সংবাদে কাজ থেকে ছুটে আসে ভাগনে মারুফ অমিত। মারুফ একজন ভাল সংগঠক। ঢেকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে এ প্রবাদটি তার বেলায় খুবই প্রযোজ্য। প্যারিসের মতো শহরে যেখানে লক্ষাধিক বাংলাদেশির বসবাস সেখানে মারুফ চৌধুরি অমিত তার মেধা ও যোগ্যতা দিয়ে কমিউনিটিতে বিশেষ স্থান করে নিয়েছে।

সন্ধ্যায় আজিজ আমাদের নিয়ে বেরিয়ে পড়লো রাতের শহর ঘুরে দেখাতে। আলোকসজ্জায় মোড়া আইফেল টাওয়ারের দিকে তাকিয়ে মনে হলো আকাশে কোনো জোনাকির দল নেমেছে। দিনের তুলনায় রাতে টাওয়ারটির সৌন্দর্য আরও রহস্যময়। কিন্তু বৃষ্টি আমাদের আনন্দে অবিরত বাগড়া দিতে লাগলো। তারপরও আমরা থামবার পাত্র নই। আমরা আবারো বেরিয়ে পড়লাম। চারদিকে ঝলমলে আলো, সেতুর নিচে বয়ে চলা সীন নদী, দূরে নোত্র-দাম ক্যাথেড্রালের গম্ভীর অবয়ব সব মিলিয়ে এক অপার্থিব দৃশ্য। গভীর রাত পর্যন্ত প্যারিসের বিভিন্ন এলাকা আমরা ঘুরে ঘুরে দেখলাম।
আজিজুর রহমান এখানে একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। রেস্টুরেন্ট ইন্ডাস্ট্রিতে সে একজন সফল ব্যক্তি। ব্যবসার ফাঁকে-ফাঁকে ফ্রান্সে বাঙালিদের অভিবাসন সম্পর্কিত নানান গল্প শোনালো।
এক সময় সাংবাদিকতা পেশায় সোচ্চার ছিলো এ এম সি রুমেল। সে অল ইউরোপিয়ান জার্নালিষ্ট এসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক। করোনাকালে ‘দেশে বিদেশে টিভি’র টকশোতে প্রায়ই অংশগ্রহণ করতো। বর্তমানে চাকুরি আর সংসার নিয়ে ব্যস্ত। বাড়ি কিনেছে। এবং এটাকে এয়ারবিএনবি করে নতুন একটি ব্যবসার সূচনা করেছে। আসার আগে তার সাথে যোগাযোগ হলে সে তার ফ্লাটে আমাদের থাকার সু-ব্যবস্থা করে।

পরদিন বাঙালি অধ্যুষিত এলাকায় দাঁড়িয়ে গল্প করছিলাম। হঠাৎ এক তরুণ এসে মুনির ভাইকে জড়িয়ে ধরল। নাম মঈনউদ্দিন মঞ্জু। পাশের বাড়ির মানুষ হলেও তারা কেউ কাউকে আগে কখনও দেখেনি। এমন অপ্রত্যাশিত সাক্ষাতে আমরা অবাক হয়ে গেলাম।
এদিন আমরা নেদারল্যান্ডে যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু বৈরি আবহাওয়ার কারণে আমরা প্রোগ্রামটি ক্যান্সেল করে শহরেই ঘোরাঘুরি করতে বেরিয়ে পড়ি। পরপর দুইদিন মঞ্জু আমাদের সার্বক্ষণিক সঙ্গি ছিল। খাওয়া দাওয়া, বিভিন্ন দর্শণীয় স্থানে ঢোকার টিকিট সব তার খাতায়। আমাদের খরচ করার সুযোগই দিলো না। এরকম মঞ্জু যদি আমরা প্রতিটি শহরে পাই তাহলে আমাদের ভ্রমণ আরও দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে পারে বলে আগেই জানিয়ে রাখলাম।
সীন নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা নোত্র-দাম ক্যাথেড্রালকে প্রথম দেখাতেই এক ধরনের শিহরণ জাগে। গথিক স্থাপত্যের সেই বিশাল গম্বুজ, বিশালাকার দরজা আর ভাস্কর্য যেন ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে। তবে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর এখনো পুনর্নির্মাণের কাজ চলছে। দূর থেকে তাকিয়েই কেবল মুগ্ধ হতে হলো। ভেতরের শান্ত পরিবেশের গল্প শুনে মনে হলো, একদিন আবার ফিরে আসতে হবে।

ড. আবু জুবায়ের মোহাম্মদ। তিনি একজন কবি, লেখক ও গবেষক। দীর্ঘদিন ধরে প্যারিসে আছেন। তিনি আমাদের ফ্রান্সের বিখ্যাত লুভর মিউজিয়াম ঘুরে দেখাবার প্রস্তাব দিলেন।
প্যারিসে এলে লুভর না দেখলে ভ্রমণ অসম্পূর্ণ। বিশাল পিরামিড প্রবেশদ্বার পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই মনে হলো আমরা যেন শিল্প-সভ্যতার এক মহাসমুদ্রে ভেসে গেছি। মোনালিসার সামনে মানুষের ঢল উপচে পড়ছে। লিওনার্দো দা ভিঞ্চি থেকে শুরু করে রেমব্রান্ট(Rembrandt), দেলাক্রোয়া(Delacroix)সহ অসংখ্য মহান শিল্পীর কাজ এখানে স্থান পেয়েছে।
প্যারিস শুধু ইতিহাস বা শিল্পের শহর নয়, এটি শিল্পী-সাহিত্যিকদের বোহেমিয়ান জীবনের প্রাণকেন্দ্র। মন্টমার্ট্রের শিল্পীদের চত্বর যেন উন্মুক্ত ক্যানভাস। পথে পথে চিত্রশিল্পী বসে আছে, আঁকছে পর্যটকদের প্রতিকৃতি। ক্যাফেগুলোতেও সেই একই সজীবতা। অ্যামেলি পুলেনের সিনেমায় দেখা সেই ক্যাফেগুলোর একটিতে বসে কফি খাওয়ার সময় এক তরুণের সঙ্গে পরিচয় হলো। শার্টের ব্যাজে লেখা ফ্রেঞ্চ নাম আরশে (এরশাদ), দক্ষিণ ভারত থেকে আসা এক আন্তর্জাতিক ছাত্র। দোকান বন্ধের পরও সে আমাদের যত্ন করে কফি খাওয়াল এবং ঘরে ফেরার পথে হাতে ধরিয়ে দিল দুই ব্যাগ পেস্ট্রি আর স্যান্ডউইচ। সেই মাকারঁ, একলেয়ার, নানা রঙের পেস্ট্রির স্বাদ আজও জিভে লেগে আছে।

রাতে ভাগনে অমিত এসে আমাদের সাথে যোগ দিলো। প্যারিসের ঐতিহাসিক স্থানগুলো তার নখদর্পনে। সে আমাদের নিয়ে এলো ল্যাটিন কোয়ার্টারে। ইতিহাসে বিদ্রোহী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্র এ অঞ্চল। এখানেই শেকসপিয়ার অ্যান্ড কোম্পানি বইয়ের দোকান, যেখানে এখনো পুরনো বইয়ের গন্ধ ভেসে আসে। লেস ডিউক্স ম্যাগো নামের ঐতিহাসিক ক্যাফেতে বসে একসময় জাঁ-পল সার্ত্র আর সিমোন দ্য বোভোয়ার চিন্তাধারার জন্ম দিয়েছিলেন। বই আর কফির মিশেলে যেন সময় থেমে থাকে এখানে।
ফ্রান্সে বাংলাদেশি অভিবাসীর সংখ্যা দেড় লাখেরও বেশি। বেশিরভাগ অভিবাসী রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী। কেউ আবার পর্তুগালের কাগজপত্র(পিআর) নিয়ে এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করছে। সমগ্র ইউরোপ থেকে বাঙালিরা বিভিন্ন পথে ছুটে আসছে ফ্রান্সে। কারণ একটাই—এদেশে কাজ আছে। রোজগারও ইউরোপের অন্যান্য দেশের চাইতে মন্দ না। জানতে পারলাম কেবল প্যারিস শহরে বাংলাদেশি রেস্টুরেন্টের সংখ্যা এখন প্রায় আট শতাধিক। এছাড়া শহরের বিভিন্ন স্থানে, অলি-গলিতে রয়েছে বাংলাদেশি মালিকানাধীন হাজার খানেক ছোটো-বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান।

সিরাজুল ইসলাম। আমার এলাকার মানুষ। দেশে শিক্ষকতা করতেন। ৩৭ বছরের বেশি সময় ধরে প্যারিসে আছেন। এ শহরে তার কয়েকটি রেষ্টুরেন্ট ছিল। একজন সফল অভিবাসী জীবনের প্রতীক সিরাজ। আজ তার হাতে আছে সাত সাতটি বাড়ি। বাড়ি ভাড়া ও একটি ফোনটেক দোকানের আয়ে তার জীবন খুবই ভাল চলছে। প্রতি বছর একবার/দু’বার দেশ থেকে ঘুরে আসেন। তার বাড়িতে জায়গা থাকতে আমরা অন্য জায়গায় থাকার আয়োজন করেছি শুনে তিনি অভিমান করলেন। কথা দিলাম পরেরবার আসলে তার আতিথেয়তা গ্রহণ করবো।

প্যারিস শুধু দর্শনীয় স্থানের শহর নয়; এর আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে দৈনন্দিন জীবনে। সীন নদীর তীরে হাঁটা, পন্ট নেফ ব্রিজ থেকে নদীর দৃশ্য দেখা, ট্যুরিস্ট ওয়াটার বাসে করে নগর ভবনের পাশ দিয়ে যাওয়া সবই একেকটি অভিজ্ঞতা। সাবওয়ে বা মেট্রোতে ভ্রমণ করতে গিয়ে দেখেছি মানুষের ভিন্ন ভিন্ন রঙ। প্রতিটি স্টেশন যেন শিল্পকর্মে ভরপুর।

ফরাসীদের জীবনযাত্রা আলাদা ধাঁচের। তাদের ফ্যাশন সচেতনতা অসাধারণ, কিন্তু আচরণে একধরনের সংযম আছে। ভাষার ব্যাপারে অবশ্য তারা কঠোর। দোকানের সাইনবোর্ড থেকে শুরু করে মেট্রোর নাম সব ফরাসি ভাষায়। এর ফলে এ ক’দিন প্রায়ই ভুল রুটে চলে যেতাম, ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নষ্ট হয়েছে। তবে কারও কাছে জিজ্ঞেস করলে সহায়তা না পাওয়ার নজির নেই। অনেকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। স্বীকার করতে হবে সৌজন্যতা প্রদর্শনে ফরাসীরা নম্বর ওয়ান।

প্রথমদিন থেকে প্যারিসে বৃষ্টি আমাদের সঙ্গী। শার্ট-প্যান্ট, জুতা-হ্যাট ভিজে একাকার। শেষ পর্যন্ত ছাতা কিনতে হলো। সেই ভেজা বৃষ্টির মধ্যেই ক্যাফের টেবিলে বসে স্থানীয় এক বৃদ্ধের সঙ্গে আলাপ হলো। তিনি বললেন, প্যারিসে যদি থাকতে হয়, তবে আকাশের খামখেয়ালির সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে জানতে হবে। কথাটি কানে লেগে রইল।

পরবর্তী গন্তব্য: ভেনিস (ইতালি)









