
চলচ্চিত্র কেবল বিনোদন নয়, এটি একাধারে সমাজের আয়না, ইতিহাসের দলিল, আবার মানুষের মনের অজানা আর্তিরও ভাষা। একটি ভালো সিনেমা দর্শককে নিয়ে যায় সময় ও স্থানের সীমানা পেরিয়ে, ভিন্ন মানুষের জীবনে, অন্য সংস্কৃতির ভেতরে। তাই সিনেমা কেবল রুপালি পর্দার আলোকছটা নয়—এটি এক মহান শিল্প, যা মানুষকে মানুষে, সংস্কৃতিকে সংস্কৃতিতে যুক্ত করার সেতু।
এই দর্শনের আলো থেকেই উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় শহর টরন্টোতে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে টরন্টো মাল্টিকালচারাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল। এখানে সহাবস্থান করছে শতাধিক ভাষা, অগণিত সংস্কৃতি ও অসংখ্য অভিবাসীর স্বপ্ন। টরন্টোর আকাশে তাই প্রায়শই শোনা যায় বহুত্বের সঙ্গীত, দেখা যায় সংস্কৃতির রঙিন কোলাজ। সেই বহুত্বের উৎসবই হয়ে উঠেছে এই ফেস্টিভ্যাল।যা কেবল চলচ্চিত্র প্রদর্শনী নয়, বরং মানুষের মনন, সংস্কৃতি ও শিল্পবোধকে একত্রিত করার এক অনন্য আয়োজন।
গত ২৪ আগস্ট ২০২৫ সালে শুরু হয় টরন্টো মাল্টিকালচারাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের অষ্টম আসর। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয় স্কারবরোর সিনেপ্লেক্স অডিওন এগলিংটন টাউন সেন্টার সিনেমা থিয়েটারে। বিপুলসংখ্যক দর্শক, শিল্পী, চলচ্চিত্রপ্রেমী ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা মিলে গড়ে তোলে এক প্রাণবন্ত মিলনমেলা।

পাঁচ দিনব্যাপী এ উৎসবে প্রতিদিন সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত দর্শকরা উপভোগ করেছেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের চলচ্চিত্র। উৎসবে ২৭টি দেশের ৪৭টি চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়েছে, যার মধ্যে পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমার পাশাপাশি ছিল একাধিক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। বিশেষভাবে তৃতীয় দিনটি শিশুদের জন্য নির্ধারিত ছিল, যেখানে শিশু-কিশোর উপযোগী ছবির প্রদর্শনী হয়েছে।
৮ম টরন্টো মাল্টিকালচারাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের বিশেষ নিবেদন করা হয়েছে বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি নির্মাতা ঋত্বিক ঘটককে শ্রদ্ধা জানিয়ে। ভারতীয় চলচ্চিত্রে তাঁর নাম উচ্চারিত হয় সত্যজিৎ রায় ও মৃণাল সেনের পাশে, কিন্তু ঘটকের নিজস্ব স্বর ও দৃষ্টিভঙ্গি তাকে আলাদা করে রেখেছে। তাঁর নির্মিত ‘মেঘে ঢাকা তারা’ কিংবা ‘সুবর্ণরেখা’-র মতো ছবি এখনো বাঙালি ও বিশ্ব দর্শকদের মনে দাগ কেটে আছে। এ উৎসবের মাধ্যমে অভিবাসী বাঙালি ও আন্তর্জাতিক দর্শকদের সামনে আবারও নতুন করে আলোচিত হয়েছে ঘটকের উত্তরাধিকার ও তার প্রভাব।

টরন্টো ফিল্ম ফোরাম ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশি স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সিনেমাপ্রেমীদের উদ্যোগে। এর মূল লক্ষ্য বিকল্প ও শিল্পধর্মী সিনেমাকে মূলধারার বাইরে দর্শকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। প্রতি মাসে তারা নিজস্ব অডিটোরিয়ামে সিনেমা প্রদর্শনের আয়োজন করে এবং শেষে বসে আলোচনা সভা।
২০১৭ সালে কানাডার ১৫০তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে প্রথমবারের মতো টরন্টো মাল্টিকালচারাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল আয়োজন করা হয়। সেখানে ১৮টি ভাষার চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয় এবং ব্যাপক সাফল্য লাভ করে। এরপর ২০১৮ ও ২০১৯ সালে ধারাবাহিকভাবে দ্বিতীয় ও তৃতীয় আসর অনুষ্ঠিত হয়। ঐতিহাসিক ফক্স থিয়েটারকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এ উৎসবগুলো বিশ্বজুড়ে নির্মাতা ও দর্শকদের প্রশংসা কুড়ায়।
মহামারির কারণে ২০২০ সালে আয়োজন স্থগিত থাকলেও ২০২১ সালে চতুর্থ উৎসবে ১১০টি দেশের ৩০০টিরও বেশি চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়। একই বছরে চালু হয় Canadian Independent Film Makers Panorama বিভাগ, যেখানে বিশেষভাবে কানাডীয় স্বতন্ত্র নির্মাতাদের কাজ প্রদর্শিত হয়।
পরবর্তী বছরগুলোতে উৎসবের ব্যাপ্তি আরও বেড়ে যায়। ২০২৩ ও ২০২৪ সালের আসরে এক হাজারেরও বেশি দর্শক উপস্থিত থেকে সিনেমা উপভোগ করেন।

টরন্টো মাল্টিকালচারাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের মূল দর্শন হলো বহুত্বের সম্মান ও সহাবস্থান। এখানে একইসাথে স্থান পায় আদিবাসী শিল্পী, LGBTQ2S শিল্পী, রঙিন শিল্পী, নারী নির্মাতা, শিক্ষার্থী, প্রবীণ কিংবা প্রতিবন্ধী সৃষ্টিশীল মানুষদের কাজ। একই সঙ্গে নতুন অভিবাসীদের জন্য এটি একটি সাংস্কৃতিক আশ্রয়, যেখানে তারা নিজেদের পরিচয়কে নতুনভাবে আবিষ্কার করতে পারেন। এখানে সিনেমার আলোয় মানুষ একে অপরকে জানে, বোঝে এবং সম্মান করে।
ফোরামের বিশ্বাস, বহুসংস্কৃতির সহাবস্থান আমাদের জীবনকে শুধু রঙিনই করে না, বরং অন্যের চিন্তা ও জীবনদর্শনের প্রতি সম্মান ও বোঝাপড়ার সুযোগ সৃষ্টি করে। ফলে এটি কেবল চলচ্চিত্র উৎসব নয়, বরং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সম্প্রীতির উৎসবও বটে।
২৮ আগস্ট শেষ হলো এবারের আয়োজন। সমাপনী দিনে প্রদর্শিত হয় মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র “১৯৭১ সেই সব দিন”—যার পরিচালক হৃদি হক। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার মাধ্যমে উৎসবের সমাপ্তি হয়ে ওঠে এক আবেগঘন উপলক্ষ।
পাঁচ দিনব্যাপী এ আসরের প্রতিটি আয়োজনেই ছিল শৃঙ্খলা ও টিমওয়ার্কের উজ্জ্বল উদাহরণ। এক ঝাঁক স্বেচ্ছাসেবীর অক্লান্ত পরিশ্রমে উৎসবটি পেয়েছে সার্থকতা। টরন্টো ফিল্ম ফোরামের প্রেসিডেন্ট এনায়েত করিম বাবুল ও সাধারণ সম্পাদক মনীষ রফিকের দীর্ঘ পরিকল্পনা, ভাবনা-চিন্তা ও বছরব্যাপী প্রস্তুতিতে এ উৎসব আন্তর্জাতিক মর্যাদা লাভ করেছে।
ঋত্বিক ঘটক একবার বলেছিলেন—“চলচ্চিত্রের শক্তি হলো মানুষের ভেতরকার চিৎকারকে দৃশ্যমান করা।” টরন্টোর এ উৎসব যেন সেই শক্তিরই বহিঃপ্রকাশ, যেখানে সিনেমা হয়ে ওঠে মানুষের কণ্ঠস্বর, সংস্কৃতির সেতুবন্ধন এবং ভবিষ্যতের আশার প্রতীক।
২৮ আগস্ট পর্দা নামলেও, এ উৎসবের আলো নিভবে না। দর্শকদের মনে, তরুণ নির্মাতাদের স্বপ্নে এবং বহুসংস্কৃতির সহাবস্থানের অঙ্গীকারে তা জ্বলতে থাকবে বছরের পর বছর।









