
শরতের সকাল টরন্টোয় যেন এক নিঃশব্দ প্রার্থনার মতো নামে। আকাশের গায়ে সাদা ধোঁয়ার মতো হালকা কুয়াশা। চারপাশে একধরনের প্রশান্ত স্তব্ধতা-কোনো কোলাহল নেই, কেবল টুপটাপ করে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে পিচঢালা রাস্তায়। গাছগুলো দাঁড়িয়ে আছে মাথা নিচু করে, যেন কোনো পুরনো গল্পের শ্রোতা। দূরে, লেক অন্টারিওর জলরেখা ঘেঁষে কুয়াশার পর্দা নেমে এসেছে যেন কোনো অজানা গল্পের মুখবন্ধ।
টরন্টোর ন্যাশনাল এক্সিবিশনের পাশ দিয়ে চলে যাওয়া ডাফরিন স্ট্রিট এমনই এক জায়গা। দিনভর ব্যস্ত থাকলেও ভোরের শহরে সে রাস্তা নিঃসঙ্গ প্রেমিকার মতো চুপ করে পড়ে থাকে। সে রাস্তায় নিয়মিত টহল দিচ্ছিলেন এক পুলিশ অফিসার। ঝিরঝির বৃষ্টি পড়ছিল। আনমনেই গাড়ি চালাচ্ছিলেন তিনি। হঠাৎ একটি শিশুর কান্না শুনে তিনি গাড়ির ব্রেক কষলেন। কান্নার শব্দ আবারও শুনতে চেষ্টা করলেন। হ্যাঁ, একটি শিশু কাঁদছে। ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলেন যেখান থেকে কান্নার শব্দ আসছিল।
এবার তিনি দেখতে পেলেন ফুটপাতের অদূরে ছোট্ট ঝুপড়ির কাছে একটি ঝুড়িতে কম্বল দিয়ে পেঁচানো ফুটফুটে এক বালক। ঝুড়িতে একটি চিরকুটও পাওয়া গেল। তাতে লেখা ‘আমি একজন বেকার, আমার সপ্তম সন্তান এটি। তাকে লালন-পালন করা আমার সাধ্যের বাইরে। পাশের বাড়ির রেশমি চুলওয়ালা মহিলা যদি বালকটিকে যত্ন-আত্তি করে বড় করতে পারেন তবে ভালো। বালকের নাম আলফ্রেড। বয়স আট দিন।’ ব্যস ঐ পর্যন্তই। কাহিনির শুরু এখানে।
পুলিশ অফিসার বালকটিকে উদ্ধার করে এনে একটি সরকারি অনাথ আশ্রমে পৌঁছে দিয়ে তাঁর দায়িত্ব শেষ করলেন। কিছুদিনের মধ্যে নগরীর একটি নিঃসন্তান দম্পতি আলফ্রেডকে দত্তক হিসেবে নিয়ে যান। ঘটনাকাল ১৯৩০ সাল।
অতঃপর আলফ্রেড বড় হতে লাগলো…। এভাবে গল্পটি এখানে শেষ হয়ে গেলে ভালো হতো। কিন্তু না। মানুষ চাইলেই সবকিছু হয় না। মানুষ গল্প শেষ করতে চায় তার শর্তে, কিন্তু জীবনের গল্প নিজের মতো করেই বয়ে চলে।
১২ বছর বয়সে আলফ্রেডকে তার দত্তক মা চোখের জল মুছতে মুছতে সব ঘটনা একদিন খুলে বলে দিলেন। তাতে অবশ্য জগতের কিছু হয়নি। জীবনের যাত্রাও থেমে যায়নি। আলফ্রেড হেসে খেলে স্কুল শেষ করলো, কলেজ শেষ করলো, তারপর কর্মজীবন…।
কর্মজীবনও শেষ করে ৭২ বছর বয়সে এসে তার মনে হলো, আচ্ছা, আমিতো সপ্তম সন্তান; আমারতো আরও ছয়টি ভাই বোন রয়েছে। তাদের কেউ কি বেঁচে নেই? আমি কি মৃত্যুর আগে কারো সাথে দেখা করে যেতে পারবো না?
যেই ভাবা সেই কাজ। টরন্টো রেফারেন্স লাইব্রেরিতে গিয়ে আলফ্রেড খোঁজাখোঁজি শুরু করে দিলেন। একেতো বাহাত্তর বছরের পুরনো পত্রিকা। তারপর দিন-তারিখ কিছুই জানা নেই। অবশেষে বহু খোঁজাখুঁজির পর তিনি পেয়ে গেলেন ১৯৩০ সালের একটি পত্রিকা।
(তখনকার তিনটি দৈনিক পত্রিকায় কুড়িয়ে পাওয়া বালক আলফ্রেডকে নিয়ে সচিত্র সংবাদ শিরোনাম হয়েছিল।) এ পত্রিকার শিরোনাম ছিলো-‘নগরীর ঝোপে পাওয়া গেছে এক ফুটফুটে শিশু।’ ছবিতে ঝুড়িতে শুয়ে থাকা এক নবজাতক।
বেশ কয়েকদিন ধরে এত পুরাতন পত্রিকা ঘাটাঘাটি করায় লাইব্রেরি কর্মীদের মাঝে নানান প্রশ্ন জাগে। সাংবাদিকদের কানেও খবরটি পৌঁছে যায় এবং আবারও সংবাদ শিরোনাম হয়ে যান আলফ্রেড।
সাংবাদিকেরা তাকে ঘিরে ধরলো। এবার তিনি নানান প্রশ্নের মুখোমুখি। না, এ জগতে আলফ্রেডের আপনজন বলতে হয়তো কেউই বেঁচে নেই। তার দত্তক পিতা-মাতাও মারা গেছেন বহু আগে। তিনি বিয়ে করেননি। কেন করেননি এর উত্তর তিনি দিতে পারেন না।
সাংবাদিকদের কাছে আলফ্রেড একটি কথাই কেবল বলতে চাইলো। শুধু একটি প্রশ্ন! যে একটি প্রশ্ন সারা জীবন ধরে তাকে বারবার দংশন করছে সেই প্রশ-আমার মা আমাকে বৃষ্টির মধ্যে কেন ফেলে রেখে গেল? যে কোনো একটি চার্চের বারান্দায় রেখে গেলেও তো পারতো!
ঝিরঝির বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা সেই গলির মাথায় এখনো মাঝে মাঝে একজন বৃদ্ধকে প্রায়ই দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়-চুপচাপ, নীরব-ঠিক যেখান থেকে গল্পটি শুরু হয়েছিল।









