
১৯৯১ সালের ঘটনা। গুয়েলফ নগরীর অধিবাসী জেমি নামে ২৫ বছরের এক যুবতী জনসম্মুখে তার বক্ষ অনাবৃত করলে অশ্লীলতার দায়ে পুলিশ তাকে তৎক্ষণাৎ গ্রেপ্তার এবং আইনভঙের দায়ে আদালত ৭৫ ডলার জরিমানা করে।
এ নিয়ে তখন পক্ষে-বিপক্ষে তুমুল হৈচৈ পড়ে যায়। ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গুয়েলফ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী বৈষম্যমূলক আচরণ বলে বিচারকের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ প্রদান করে।
তার অভিযোগে সে উল্লেখ করে যে, নারীদের সঙ্গে পুরুষদের বুকের তারতম্য সাধারণ একটি টিস্যুর ব্যাপার বই অন্য কিছু নয়। জেমির অনাবৃত বক্ষ প্রদর্শন কোনো বাণিজ্যিক উদ্দেশে ছিল না। এছাড়াও বাধ্যতামূলকভাবে কারো দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য সে এ কাজ করে নি। অতএব এ রায় বৈষম্যমূলক। এটা মেনে নেয়া যায় না।
অতঃপর তিনজন বিচারকের সমন্বয়ে গঠিত আদালত ব্যাপারটি বিবেচনা করে অবশেষে জেমির পক্ষে রায় ঘোষণা করে। পরবর্তীতে এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হলেও, উচ্চ আদালত পূর্বের রায় বহাল রাখে।
আদালতের এ রায় শোনার পর জেমির তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া কী জানতে চাইলে সে জানায়, এটা নারীদের একটি বিজয়। এখন থেকে তারা তাদের ইচ্ছেমতো শার্ট খুলে ঘুরতে পারবে। জেমি আরও বলে, এ আইন শুধু আদালতের জন্য কার্যকর হলো না, সমাজব্যবস্থা পরিবর্তনেরও একটি পদক্ষেপ বলা চলে।
জেমির আইনজীবী মিস মার্গারেট বলেন, তিনি মনে করেন এ আইনের ফলে মহিলারা নিজেদের শরীরকে আরও সংযত রাখবে যেমনটি আগে থেকে করে আসছে। তিনি আরও বলেন, এ আইন পাস হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ছেলেরাই গরম দিনে খালি গায়ে ঘুরে বেড়াতে পারতো। আর মেয়েদের বেলায় ছিল এটা অপরাধ। এখন থেকে মেয়েরা অপরাধমুক্ত হলো।
মার্গারেট আরও বলেন যে, যদি কেউ কাউকে আকৃষ্ট করার জন্য তার বক্ষ অনাবৃত করে তবে এটা অপরাধ বলেই বিবেচিত হবে এবং এর জন্য শাস্তি পেতে হবে।
নিউ ডেমোক্রেটিক দলের সাংসদ মিস মার্লিন জানান যে, পুরুষরা এ সংবাদ শোনার পর যেন বেশি উৎসাহী না হয়ে পড়েন। মহিলাবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন মহিলা আশ্চর্য হয়ে মন্তব্য করেছেন যে, এ আইন মহিলাদের জন্য কঠিন নয়। তিনি বলেন আমাদের সমাজে এটি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
উল্লেখ্য, জেমির মামলা চলাকালে তার পক্ষ সমর্থন করে পুরো দেশব্যাপী প্রতিবাদ ওঠে, এমনকি পার্লামেন্ট হিলের সামনে একটি বিক্ষোভ ও প্রদর্শন করা হয়। এ বিক্ষোভ সমাবেশে কিছু তরুণী অনাবৃত বক্ষ নিয়ে অংশগ্রহণ করে। তাদের দেখার জন্য হাজার হাজার লোককে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
কিছু মানুষ এই সিদ্ধান্তকে নারীদের অধিকারের দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখেছেন, অন্যদিকে কিছু মানুষ সামাজিক ও নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এতসব বিতর্ক সত্ত্বেও, রায়টি নারীদের সমান অধিকারের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে এবং এখনও কার্যকর রয়েছে।
এ ধরনের আইন কেবল অন্টারিওতেই সীমাবদ্ধ নয়; বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন দেশ ও শহরে মহিলাদের জনসমক্ষে অনাবৃত বক্ষ প্রদর্শনের অনুমতি রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটি, সান ফ্রান্সিসকো, এবং সিয়াটল শহরে মহিলাদের এই স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। তবে, এই আইন ও নীতিমালা স্থানভেদে ভিন্ন হতে পারে এবং স্থানীয় সংস্কৃতি ও সামাজিক মূল্যবোধের উপর নির্ভর করে।
রায়টি প্রকাশিত হওয়ার পর সেসময় আমি আমার প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলাম ভিন্ন ভাবে একটু মজা করে। পাঠকদের জ্ঞাতার্থে লেখাটি পুনঃপ্রকাশ করছি:
এখন থেকে অন্টারিওতে পর্যটকদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই বেশি। আসছে সামারে নায়াগ্রা ফলস্, সিএন টাওয়ারের সঙ্গে সঙ্গে বোনাস হিসেবে পর্যটকরা অনেক কিছু দেখতে পাবেন।
অন্যান্য প্রদেশে বসবাসকারী যুবক ভাইয়েরা হতাশ হবেন না। একই দেশে দুই আইন চলতে পারে না। প্রতিবাদ করুন। বিবৃতি দিন। আপনাদের প্রিয় রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর আপাতত কোনো কাজ না থাকলে তারা এ ব্যাপারে সাহায্য করতে পারে। আপনাদের প্রদেশে বৈষম্যমূলক এ আইন তুলে না দেওয়া পর্যন্ত অন্টারিওতে বেড়িয়ে যান।
এ ছাড়া আগামী পিকনিকের স্থান নির্বাচনে অন্টারিওর বনছায়া ঘেরা পার্ককে গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করবেন বলে আশা করি। আগ্রহী সংগঠনগুলো এখনই পিকনিক স্পট রিজার্ভ করে নিশ্চিন্ত থাকুন। তবে হ্যাঁ, নুরু, পুশি, আয়েশা, শফি এবং তাদের মা জননীকে এবারের হিসেব থেকে বাদ রাখবেন।
অন্টারিওর বিবাহিতা বাঙালি মহিলারা সাবধান। আপনার স্বামী বাইরে বেরুবার আগে জিজ্ঞেস করুন কোথায় যাচ্ছেন। একা বেরুতে না দেয়াই আপনার জন্য নিরাপদ। ‘সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে’- কথাটা মনে রাখবেন। এখন থেকে লাগাম টাইট করুন। শার্টে বোতামের সংখ্যা বাড়িয়ে দিন!
অন্যান্য প্রদেশের বিবাহিত বাঙালি মহিলাদেরও সচেতন হতে হবে। আপনার স্বামী অন্টারিওতে আসতে চাইলে একা ছাড়বেন না। কষ্ট হলেও আপনি সঙ্গে আসুন। কবিগুরু বলেছেন, ‘কারও বা থাকে দাবি, কারও বা থাকে দায়, এই দুই নিয়ে সংসার।’ আপনার জন্য দাবি এবং দায় দুটোই প্রযোজ্য। দাবি করুন এবং পরিস্থিতির দায় থেকে নিজেকে মুক্ত করতে সচেষ্ট হোন।
অতি উৎসাহীদের জ্ঞাতার্থে জানানো যাচ্ছে যে, তাড়াহুড়োর কিছু নেই। শীতের এ মৌসুমে কোনো রিস্ক নিতে যাবেন না। অন্টারিওর তাপমাত্রা এখনও জিরো ডিগ্রির নিচে অবস্থান করছে। অতএব ইচ্ছে থাকলেও উপায় নেই। সামারের প্রস্তুতি নিন।”
যে যেমনই ভাবুন, কানাডার সর্ববৃহৎ এ প্রদেশটি অন্যান্য প্রদেশের চাইতে ভিন্ন ও বৈচিত্রপূর্ণ। চলুন এক নজরে পাঠকদের একটু ধারনা দিই।
প্রকৃতির এক রাজকন্যার নাম অন্টারিও। কানাডার পূর্ব-মধ্যাঞ্চলে অবস্থিত এই প্রদেশ যেন পৃথিবীর বুকের ওপর আঁকা এক অনন্য চিত্রকর্ম—হ্রদে ঘেরা, নদীতে বাঁক খাওয়া, গ্রীষ্মে রোদেলা আর শীতে বরফে মোড়া।
এখানে যেমন আছে নায়াগ্রা ফলসের গর্জন, তেমনি আছে কানাডার রাজধানী অটোয়ার রাজনৈতিক গম্ভীরতা। সিএন টাওয়ারের মাথায় দাঁড়িয়ে পুরো টরন্টো শহরকে মনে হয় খেলনার মতো। আর বসন্তের টিউলিপ আর শরতের রঙিন পাতাগুলো যেন প্রকৃতির হাতে আঁকা জলরঙ।
অন্টারিও শুধু একটি প্রদেশ নয়, এটি একটি অনুভব, একটি অভিজ্ঞতা। এর ভৌগলিক বৈচিত্র্য বিস্ময় জাগায়—লেক অন্টারিও, লেক সুপিরিয়র, থাউজ্যান্ড আইল্যান্ডস আর অগণিত ট্রেইল ও ক্যাম্পিং সাইট যেন প্রকৃতিপ্রেমীদের স্বর্গরাজ্য।
এখানে বিনোদনের যেন শেষ নেই—মিউজিক ফেস্টিভ্যাল, ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল, স্পোর্টস, থিয়েটার, আর্ট গ্যালারি, বোটিং, স্কিয়িং, ক্যানোইং, স্কেটিং, হাইকিং, হানিমুন, হ্যালোইন, হার্ভেস্ট, সবই একসাথে অন্টারিওর হেমন্ত, শীত, বসন্ত আর গ্রীষ্মকে করে তোলে রঙিন আর জীবনমুখী। নাগরিকরা যেমন শহরের আধুনিকতায় ডুবে থাকেন, তেমনি সপ্তাহান্তে প্রকৃতির কোলে ছুটি কাটান। গ্রীষ্মে বারবিকিউ আর শীতে হট চকোলেট যেন এখানকার দৈনন্দিন রূপকথা।
বৈচিত্র্যময়, আধুনিক ও সাংস্কৃতিক প্রদেশের প্রতিটি নাগরিক খোলা বুক নিয়ে আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছে। ‘ওয়েলকাম টু দ্য প্রভিন্স অব অন্টারিও’।









