সিলেট

সিলেট ৩ আসনে ভোটের নানান হিসাব

মো. রেজাউল হক ডালিম

সিলেট, ০১ সেপ্টেম্বর – আর মাত্র ৩ দিন। করোনা পরিস্থিতিতে বার বার তফসিল ঘোষণা ও ভোগগ্রহণের তারিখ পেছানোর পর অবশেষে আগামী ৪ সেপ্টেম্বর সিলেট-৩ আসনে অনুষ্ঠিত হবে উপ-নির্বাচনের ভোটগ্রহণ।

তবে আসনটিতে শেষ মুহূর্তে মাঠের পরিস্থিতি এমন- ভোটগণনার আগ পর্যন্ত বলা যাচ্ছে না- কোন প্রার্থীর জয়ের পাল্লা ভারী। কারণ- আসনটিতে প্রার্থীদের জন্য এখন ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘নীরব ভোট’।

গত কয়েকদিনের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, সিলেট-৩ আসনের উপনির্বাচনের শেষ মুহূর্তে এসে ‘রহস্যময়’ নীরবতা বিরাজ করছে ভোটের মাঠে। প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা দৌড়ঝাঁপ করলেও সাধারণ ভোটাররা নড়ছেন না। তারা কেন্দ্রে যাবেন কি-না, এ নিয়েও ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। কিন্তু ভোটগ্রহণের তারিখ পেছানোর (২৮ জুলাইয়ের) আগে আগে মাঠ ছিলো সরব। কিন্তু সময় বেশি গড়ানো এবং প্রার্থীদের নানা কৌশল অবলম্বনের কারণে ভোটাররা এখন নীরব হয়ে গেছেন।

সিলেটের দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত সিলেট-৩ আসন। যার সংসদীয় নং ২৩১। আসনটিতে মোট ভোটার ৩ লাখ ৫২ হাজার ও ভোটকেন্দ্র ১৪৯টি।

চলতি বছরের ১১ মার্চ করোনায় সংক্রমিত অবস্থায় সিলেটের গুরুত্বপূর্ণ এ আসনটির সাংসদ আওয়ামী লীগ নেতা মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী মারা যান।

সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১২৩ এর দফা (৪) অনুযায়ী, উক্ত শূন্য আসনে ৮ জুনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা থাকলেও করোনার কারণে ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন সম্ভব হয়নি। এ অবস্থায় শূন্য আসনটিতে ৮ জুন পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য তফসিল ঘোষণা করে ইসি। সেই তফসিল অনুযায়ী গত ২৮ জুলাই এই আসনের উপনির্বাচন ইভিএম পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় এর দুদিন আগে ভোটগ্রহণ স্থগিত করেন আদালত। পরবর্তীতে ৪ সেপ্টেম্বর ভোটগ্রহণের দিন ধার্য্য করে ইলেকশন কমিশন।

তফশিল ঘোষণার পর থেকেই উত্তাপ ছড়াচ্ছিলো সিলেট-৩ আসনের উপনির্বাচন। প্রার্থীদের কথার লড়াই একসময় প্রতীক বরাদ্দের মধ্য দিয়ে গড়ায় মাঠে। আসনজুড়ে প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে দেখা দেয় বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা। চলে মিছিল-মিটিং-শোডাউন। সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও শুরু হয় নির্বাচনকেন্দ্রীক আলোচনা-সমালোচনা। কিন্তু আগস্টের শুরুতে করোনার ঢেউ থামিয়ে দেয় সবকিছু।

এর আগে গত ১৫ জুন মনোনয়ন জমা দেন মোট ৬ জন। তারা হলেন- আওয়ামী লীগের প্রার্থী হাবিবুর রহমান হাবিব, জাতীয় পার্টির প্রার্থী আতিকুর রহমান আতিক, স্বতন্ত্র প্রার্থী ও সাবেক সংসদ সদস্য শফি আহমেদ চৌধুরী, বাংলাদেশ কংগ্রেসের প্রার্থী জুনায়েদ মুহাম্মদ মিয়া এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ফাহমিদা হোসেন লুমা ও শেখ জাহেদুর রহমান মাসুম।

এর মধ্যে ফাহমিদা ও মাসুম ছাড়া সবার মনোনয়নপত্র ১৭ জুন বৈধ ঘোষণা করে নির্বাচন অফিস। দাখিলকৃত মনোনয়নে ভোটারদের তথ্য যথাযথ না পাওয়ায় ফাহমিদা ও মাসুমের মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করা হয়। পরে তারা আপিল করলেও আগের রায় বহাল রাখে নির্বাচন কমিশন। ফলে তারা দুজন ঝরে পড়েন নির্বাচন থেকে।

বহাল থাকা ৪ প্রার্থীর প্রার্থীর মধ্যে ২৫ জুন প্রতীক বরাদ্দ দেয়া হয়। প্রার্থীদের মধ্যে আওয়ামী লীগের হাবিবুর রহমান হাবিব নৌকা, জাতীয় পার্টির আতিকুর রহমান আতিক লাঙ্গল, স্বতন্ত্র প্রার্থী ও সাবেক বিএনপি নেতা শফি আহমদ চৌধুরী মোটরগাড়ি (কার) এবং বাংলাদেশ কংগ্রেসের জুনায়েদ মোহাম্মদ মিয়া ডাব প্রতীক পান। এর মধ্যে শফি আহমদ চৌধুরী ছাড়া বাকি ৩ জন পান দলীয় প্রতীক।

প্রতীক বরাদ্দের ৫ দিন পর ভার্চুয়াল মাধ্যম ও মাঠে প্রার্থীদের পক্ষে চলে প্রচার-প্রচারণা। প্রার্থীদের পক্ষে কর্মী-সমর্থকরা চান ভোট ও দোয়া।

তবে শেষ মুহুর্তে এসেও ঠিক বলা যাচ্ছে না- কোন প্রার্থীর জয়ের পাল্লা ভারী। কারণ- সাধারণ ভোটাররা বলছেন, ২৮ জুলাইয়ের আগে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা গেলেও নির্বাচন স্থগিত হওয়ার পর তা আর দেখা যায়নি। যে কারণে- কোন প্রার্থীর ভোট এই মুহুর্তে বেশি- সেটি এখন আর জরিপ করা যাচ্ছে না।

ভোটাররা বলছেন- ভোটের দিন ‘নীরব ভোটারদের’ পাল্লা যার দিকে ভারী থাকবে সেই প্রার্থীই জয় লাভ করবেন।

আওয়ামী লীগ প্রার্থী হাবিবুর রহমান হাবিব এবার ভোটের মাঠে সবচেয়ে বেশি পরিশ্রম করেছেন। প্রচারণায়ও এগিয়ে তিনি। এরপরও ভোটের মাঠে আশানুরূপ জোয়ার তুলতে পারেননি বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য।

কয়েকটি সূত্র বলছে, উন্নয়নের প্রশ্নে এ আসনের একাংশের মানুষ নৌকার পক্ষে ঐক্যবদ্ধ থাকলেও ভেতরে ভেতরে আওয়ামী লীগের বহু বলয় এখনো নীরব। এ আসনে নৌকার টিকিট চেয়েছিলেন প্রয়াত এমপি মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরীর স্ত্রী ফারজানা সামাদ, আওয়ামী লীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ, বিএমএ’র কেন্দ্রীয় মহাসচিব ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী দুলালসহ অনেকেই। সবাইকে টপকে হাবিব নৌকার টিকিট নিয়ে আসেন। এরপরও থেকে দলীয় প্রার্থী হাবিবের সঙ্গে তৃণমূল ঐক্যবদ্ধ থাকলেও এ আসনের দলীয় বিভিন্ন বলয়ের ভোট এখনো নীরব রয়েছে।

এরই মধ্যে কেন্দ্র ও সিলেটের নেতারা নৌকার পক্ষে আওয়ামী লীগকে ঐক্যবদ্ধ করতে কাজ করেন। কিন্তু তাদের এই প্রচেষ্টা কোথাও সফল হলেও তেমন কাজে আসছে না। শেষ সময়ে এসেও ওই ভোট ব্যাংকও রহস্যময় ভূমিকা পালন করছে।

তবে আওয়ামী লীগ প্রার্থী হাবিবুর রহমান হাবিব জানিয়েছেন, এই উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধ রয়েছে। মানুষ নৌকার পক্ষে, উন্নয়নের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ। এ কারণে জয় হবে নৌকারই। এদিকে, হাবিবুর রহমান হাবিবের পক্ষে কেন্দ্র ও সিলেটের নেতারা ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে নেমেছেন। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে এ আসনে জয় চায় আওয়ামী লীগ। কারণ, এ আসনটি নিয়ে সিলেটে হিসাব ভিন্ন। কারণ এককভাবে কোনো দলই এখনো এ আসনে আধিপত্য বিস্তার করতে পারেনি। ফলে এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হলে আগামীতে এ জয় হবে দলের জন্য টার্নিং পয়েন্ট।

আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতারা জানিয়েছেন, ২০০৮ সাল থেকে ভোটের মাঠে রয়েছেন হাবিবুর রহমান হাবিব। তিনি নৌকার টিকিটের জন্য লড়াই করার পাশাপাশি স্থানীয়ভাবেও কাজ করেছেন। সুতরাং তার পক্ষেই তৃণমূলের নেতারা রয়েছেন।

এদিকে, এ আসনের বিএনপি ও শরীক দলের বিশাল ভোট ব্যাংক রয়েছে। জামায়াতে ইসলামী ও খেলাফত মজলিসের কর্মীদের রয়েছে শক্তিশালী অবস্থান। ফলে বিএনপি কিংবা জোটের পক্ষ থেকে প্রার্থী না থাকায় এই এলাকার ভোটাররা জাতীয় পার্টির প্রার্থীর সঙ্গে রয়েছেন। এতে নেপথ্যে রয়েছেন বিএনপিসহ শরীকদলের কয়েকজন নেতা।

দল দুটির কয়েকজন নেতা জানান, পরিবেশ থাকলে তারা ভোটে যাবেন। যদি পরিবেশ না থাকে তাহলে তারা কেন্দ্রে যাবেন না। আর ভোটে গেলেই নৌকার প্রতিপক্ষ হিসেবে আতিক কিংবা স্বতন্ত্র শফি চৌধুরীর বাক্সেই জমা পড়বে তাদের ভোট।

স্থগিত হওয়ার আগে জাতীয় পার্টির প্রার্থী আতিকুর রহমান আতিক তাদের ভোটের উপর ভরসা রেখেই জোয়ারে ভেসেছিলেন। আতিকুর রহমান আতিক জানিয়েছেন, ‘সিলেট-৩ আসনের মানুষ এবার লাঙলের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ রয়েছে। মানুষ পরিবর্তন চায়। আর এই পরিবর্তনের জন্য তার পক্ষে একাট্টা হয়েছে। এ অবস্থায় ভোটের পরিবেশও আতিকের কাছে বড় বিষয়। যদি ভোটারদের ভোট দিতে দেয়া হয় তাহলে তিনি হাসবেন শেষ হাসি।’

আতিকের পক্ষে প্রচারণা চালাতে ইতিমধ্যে সিলেট এসেছেন জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নেতারা। লাঙলের পক্ষে মাঠে গিয়ে ভোট প্রার্থনা করবেন বলে দলীয় নেতারা জানিয়েছেন।

অপরদিকে, এ আসনে এবার নীরব প্রচারণা চালিয়েছেন সাবেক এমপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থী শফি আহমদ চৌধুরী। একা একা চালিয়েছেন প্রচারণা। কারণ- স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার কারণে বিএনপিসহ শরীক দলের নেতারা তার পক্ষে প্রকাশ্যে নেই। তবে- ভেতরে ভেতরে বিএনপি ও শরীক দলের একাংশের ভোট ব্যাংক শফি চৌধুরীর পক্ষে ঐক্যবদ্ধ রয়েছে। প্রথমদিকে তিনি কিছুটা বিচ্ছিন্ন থাকলেও এখন যেদিকে যাচ্ছেন সাড়া পাচ্ছেন। শফি আহমদ চৌধুরীও এ আসনে নীরব ভোট বিপ্লবের আশা করছেন।

তিনি জানিয়েছেন, ‘যারা নীরব আছেন তারা তার পক্ষেই রয়েছেন। ভোটাররা চায় যোগ্য প্রার্থী। এ কারণে যোগ্যতার ভিত্তিতে সিলেট-৩ আসনের মানুষ তার পক্ষে মাঠে ঐক্যবদ্ধ রয়েছে।’ নির্বাচনের শেষ দিকে এসে ভোটের মাঠে তিনি প্রভাব বিস্তার করছেনও। তার গ্রাম কিংবা এলাকার মুরব্বিরা ঐক্যবদ্ধ রয়েছে।

তবে সব হিসেব-নিকেশ ছাপিয়ে ৪ সেপ্টেম্বর দিন শেষেই বলা যাবে- কার মুখে থাকবে বিজয়ের হাসি, আর কার হাতে শোভা পাবে ‘ভি’ চিহ্ন। অপেক্ষা শুধু তিন দিনের।

এম ইউ/০১ সেপ্টেম্বর ২০২১


Back to top button