ইসলাম

অবৈধ সম্পদ ইবাদত কবুলের অন্তরায়

মুফতি মাহফূযুল হক

পবিত্র কোরআনের তেলাওয়াতকৃত অংশের বিশেষ উল্লেখযোগ্য একটি বিষয় হচ্ছে- সম্পদের অবৈধ ভোগদখল।

এ প্রসঙ্গে সূরা বাকারার ১৮৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেছেন, তোমরা অন্যায়ভাবে একে অপরের সম্পদ ভোগ করো না এবং মানুষে ধন-সম্পদ জেনেশুনে অন্যায়ভাবে আত্মসাত করার উদ্দেশ্যে বিচারকের নিকট পেশ করো না।

এ বিষয়টি পবিত্র কোরআনের আরও কয়েক স্থানে আলোচিত হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, যারা অন্যায়ভাবে এতিমের সম্পদ গ্রাস করে তারা নিজেদের পেটে আগুন ভক্ষণ করে। তারা জ্বলন্ত আগুনে জ্বলবে। সূরা আন নিসা: ১০

হে মুমিনগণ! তোমরা অন্যায়ভাবে একে অপরের সম্পদ ভোগ করো না। সূরা আন নিসা: ২৯

পবিত্র কোরআনে যেভাবে অবৈধ সম্পদ ভোগের ওপর স্পষ্টভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, ঠিক সেভাবে এর বিপরীত আদেশে ভোগ করতে বলা হয়েছে শুধুমাত্র ওই সম্পদ থেকে যা বৈধ পন্থায় উপার্জিত।

এ প্রসঙ্গে কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, হে মানবজতি! পৃথিবীতে যা কিছু বৈধ ও পবিত্র তা থেকে ভোগ করো। শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিশ্চয় সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। সূরা বাকারা: ১৬৮

আল্লাহ তোমাদের যা দিয়েছেন তা থেকে যা বৈধ ও পবিত্র তা ভোগ কর। আল্লাহর নেয়ামতসমূহের শোকরিয়া আদায় কর, যদি কেবল তারই ইবাদতকারী হয়ে থাক। সূরা আন নাহল: ১১৪

পবিত্র হাদিসেও এ বিষয়ে অনেক কঠোর ও উদ্দীপক কথা বলা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, অবশ্যই মহান আল্লাহ পবিত্র। তিনি পবিত্র ছাড়া কোনো কিছু কবুল করেন না। তিনি রাসূলগণকে যা আদেশ করেছেন মুসলিমদেরও তাই আদেশ করেছেন। তিনি বলেছেন, হে রাসূলগণ! হালাল খাও ও নেক আমল কর।

তিনি আরও বলেছেন, হে ঈমানদারগণ! আমার দেওয়া রিজিকের হালাল অংশ খাও। অত:পর মহানবী (সা.) এমন ব্যক্তির কথা উলেখ করেছেন, যে দীর্ঘ সফর করেছে। তার চুল-দাড়ি এলোমেলো হয়ে ধুলায় মেখে গেছে, সে আকাশের দিকে দুহাত পেতে বলছে, হে আমার প্রভু! হে আমার প্রভু! অথচ তার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম, পোশাক হারাম, তার দেহ গঠিত হয়েছে হারাম দ্বারা। এমতাবস্থায় তার দোয়া কিভাবে কবুল হবে? সহিহ মুসলিম: ২৩৯৩

আরও পড়ুন: ইসলামে স্ত্রীর প্রতি স্বামীর দায়িত্ব

কোনো মানুষ হারাম পন্থায় সম্পদ উপার্জন করে তা থেকে দান করলে তার দান আল্লাহর কাছে কবুল হয় না। নিজের প্রয়োজনে খরচ করলে তার খরচে বরকত হয় না, মৃত্যু সময় ওয়ারিশদের জন্য রেখে গেলে তার জাহান্নামের শাস্তি আরও বাড়ে। হারাম মাল দান করার কারণে আল্লাহ গোনাহ ক্ষমা করেন না। বরং হালাল মাল দান করার কারণে গোনাহ ক্ষমা করেন। -আহমাদ: ৩৬৭২

দেহের যে গোশত হারাম আয় দ্বারা তৈরি হবে, তা জান্নাতে প্রবেশ করবে না। বরং জাহান্নাম হবে তার জন্য অধিক উপযুক্ত স্থান। -আহমাদ: ১৪৪৪১

হাশরের মাঠে চারটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া ব্যতীত কোনো মানুষ তার স্থান থেকে এক পা নড়তে পারবে না। তন্মধ্যে তৃতীয় প্রশ্ন হবে, দুনিয়ার জীবনে সম্পদ কিভাবে উপার্জন করেছ এবং কোথায় ব্যয় করেছ? সুনানে তিরমিজি: ২৪১৭

উপরোক্ত আয়াত ও হাদিস দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, বৈধ সম্পদ ইবাদত কবুলের ও জান্নাতে প্রবেশের পূর্বশর্ত। রিজিক হারাম হলে নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত, জিকির, দান-খয়রাত থেকে শুরু করে কোনো সৎ কর্ম ও নেক আমল আল্লাহর কাছে কবুল হয় না।

সুতরাং কেউ যদি মনে করে, সারা জীবন সরকারি সম্পদ অবাধে লুটপাট করে, নিরীহ জনগণের ভূমি দখল করে, ঘুষের টাকা দিয়ে বিশাল বিত্ত-সম্পদের মালিক হব। শেষ জীবনে কিছু টাকা দিয়ে হজ করব আর একটা মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করব। এতে আমি ও আমার সব সহায়-সম্পদ পবিত্র হয়ে যাবে, আল্লাহ আমার প্রতি খুশি হয়ে যাবে। এটা ভুল মনোভাব।

সূরা বাকারার ১৮৮ নম্বর আয়াত দ্বারা বুঝে আসে, আদালতের রায়ের কারণে বা সরকারের সুযোগ দেওয়ার কারণে কারও জন্য তার হারাম সম্পদ কখনও হালাল হয় না।

তাই আসুন, পবিত্র রমজানের এ শুভক্ষণে ঈমানি চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে সব ধরণের দুর্নীতিকে না বলি। সব অবৈধ সম্পদ পরিহার করি। কষ্ট করে হলেও হালাল রিজিকের ওপর নিজের জীবনযাপনকে সীমিত রাখার কঠিন শপথ নেই।

এন এইচ, ২৪ অক্টোবর


Back to top button
🌐 Read in Your Language