ইউরোপ

ফ্রান্সে ১৫ বছরের কিশোরের হাত উড়ে যাওয়ার পর স্টান গ্রেনেড ব্যবহার বন্ধ

স্টান গ্রেনেড ব্যবহার বন্ধ

প্যারিস, ০৭ অক্টোবর-ফ্রান্সজুড়ে চলমান শিক্ষার্থী বিক্ষোভে পুলিশি অভিযানে ব্যবহৃত স্টান গ্রেনেডের ব্যবহার সাময়িকভাবে বন্ধান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জানিয়েছেন, সোমবারের ওই ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত স্টান গ্রেনেড ব্যবহার করেছে দেশটির সরকার। চলতি সপ্তাহে উত্তর ফ্রান্সের লঁস শহরে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরের হাত গ্রেনেড বিস্ফোরণে উড়ে যাওয়ার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জানিয়েছেন, সোমবারের ওই ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত স্টান গ্রেনেড ব্যবহার না করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছে, তা নিয়ে বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থী ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে পার্থক্য রয়েছে।

শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে পুলিশ কিশোরদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করছে—এমন অভিযোগও বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে উঠেছে।

বুধবারও বিক্ষোভ ও অচলাবস্থা চলেছে। দেশটির ৫০০টির বেশি স্কুল পুরোপুরি বা আংশিকভাবে বন্ধ ছিল। এ পরিস্থিতিতে বুধবার সন্ধ্যায় শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে জাতির উদ্দেশে বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নুর।

লঁসে কিশোরের হাত উড়ে যাওয়ার ঘটনায় বিতর্ক

উত্তরাঞ্চলীয় শহর লঁসের অগুস্ত বেহাল উচ্চবিদ্যালয়ের কাছে সোমবার ওই ১৫ বছর বয়সী কিশোরের হাত উড়ে যায়। তথাকথিত ‘অ্যান্টি-এনসার্কলমেন্ট গ্রেনেড’ বিস্ফোরণে সে গুরুতর আহত হয়।

গ্রেনেডটি কীভাবে বিস্ফোরিত হয়েছিল, তা এখনও পরিষ্কার নয়। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের দাবি, কিশোরটি গ্রেনেডটি তুলে নেওয়ার পর সেটি বিস্ফোরিত হয়। তবে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের দাবি, একজন পুলিশ কর্মকর্তা গ্রেনেডটি ছোড়ার পর সেটি সরাসরি কিশোরটির গায়ে আঘাত করে।

স্থানীয় প্রিফেকচারের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার সময় ২০০ থেকে ২৫০ শিক্ষার্থীর একটি দল পুলিশের মুখোমুখি অবস্থানে ছিল এবং তারা পাথর ও আতশবাজি ছুড়ছিল।

স্টান গ্রেনেডকে সাধারণত প্রাণঘাতী নয় এমন অস্ত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে বিস্ফোরণের সময় এটি ছোট ছোট রাবারের গুলি বা প্রজেক্টাইল ছুড়ে দিতে পারে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনেজ বলেন, পুলিশের অতিরিক্ত বা অসামঞ্জস্যপূর্ণ শক্তি প্রয়োগের সন্দেহ দেখা দিলে সব সময়ই বিচার বিভাগীয় তদন্ত করা হয়। তার ভাষায়, সরকার ‘উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সুরক্ষায়’ কাজ করছে।

লঁসের ঘটনার ঘটনায় পুলিশি কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় পুলিশের অভ্যন্তরীণ নজরদারি সংস্থা আইজিপিএন ১৮টি তদন্ত শুরু করেছে। এসব তদন্তের মাধ্যমে বিক্ষোভ দমনে কর্মকর্তারা প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করেছিলেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

শত শত স্কুল বন্ধ, গ্রেফতার ৪৮৮

শিক্ষার্থী ও তাদের সমর্থকদের বিক্ষোভ মঙ্গলবার আরও ব্যাপক আকার নেয়। উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা ও স্কুলের পরিবেশের দাবিতে সেদিন দেশটির বিভিন্ন শহরে লাখো মানুষ রাস্তায় নামে। কোথাও কোথাও বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবারের বিক্ষোভে ৪৮৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় নিরাপত্তা বাহিনীর ৪৩ সদস্য আহত হন।

মধ্য-সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন ধীরে ধীরে উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের গণ্ডি ছাড়িয়ে তাদের অভিভাবক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে।

প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু মঙ্গলবারের বিক্ষোভে সংঘটিত সহিংসতার নিন্দা জানিয়েছেন। তার দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, আন্দোলন শুরুর পর এ পর্যন্ত ২১৫ জন শিক্ষার্থী, ৮৫ জন স্কুলকর্মী এবং ৭১৫ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, একই সময়ে ৬ হাজার ৫০০-এর বেশি মানুষকে থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ বা গ্রেফতার করা হয়েছে।

কাঁদানে গ্যাসে ১৪ বছরের কিশোর আহত

শিক্ষার্থী বিক্ষোভে পুলিশি শক্তি প্রয়োগের অভিযোগ নতুন নয়। গত সপ্তাহে ১৪ বছর বয়সী আরেক কিশোরের মুখে কাঁদানে গ্যাসের গ্রেনেড আঘাত হানার ঘটনা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

প্যারিসের উত্তর-পশ্চিমে সাঁ-তুয়াঁ-লো-মোঁ এলাকায় ওই ঘটনা ঘটে। কিশোরটির আইনজীবীর দাবি, এতে তার বেশ কয়েকটি দাঁত পড়ে যায় এবং চোয়াল ভেঙে যায়। এ ঘটনায় এক পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগও গঠন করা হয়েছে।

এর মধ্যে বুধবার আরেকটি ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে ফরাসি প্রসিকিউটররা। উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বেলফোর শহরে ১৭ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী অভিযোগ করেছে, তাকে গ্রেফতারের সময় এক পুলিশ কর্মকর্তা তার মাথা পানির নিচে চেপে ধরেছিলেন।

ওই অভিযোগের ভিত্তিতে হত্যাচেষ্টার তদন্ত শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রসিকিউটর কার্যালয়।

এক-চতুর্থাংশ উচ্চবিদ্যালয়ে বিক্ষোভের প্রভাব

মঙ্গলবারের বিক্ষোভের কারণে ফ্রান্সের প্রায় এক-চতুর্থাংশ উচ্চবিদ্যালয়ের কার্যক্রম ব্যাহত হয়। সরকারি হিসাবে, ওই দিন বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ২ লাখ ৫০ হাজারের বেশি ছিল।

পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার উপায় খুঁজতে মঙ্গলবার রাতে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু এবং সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন মন্ত্রীর সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেন।

তবে শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর হিসাব সরকারি সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি। তাদের দাবি, মঙ্গলবারের বিক্ষোভে প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার মানুষ অংশ নিয়েছে।

আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার প্যারিসসহ দেশের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভের চতুর্থ দফা কর্মসূচি পালন করা হবে।

পুলিশকে সংযত হতে বলুন

ফ্রান্সের উচ্চবিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সংগঠন ইউএসএলের প্রধান রিয়াদ রানি বুধবার ফরাসি রেডিওকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনেজের প্রতি পুলিশকে সংযত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, “আমরা জনাব নুনেজকে বলছি, আপনার পুলিশ কর্মকর্তাদের শান্ত করুন এবং সংযমের আহ্বান জানান।”

শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে একদিকে স্কুলশিক্ষার পরিবেশ ও শিক্ষার্থীদের দাবিদাওয়া নিয়ে সরকারের ওপর চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে কিশোরদের আহত হওয়ার কয়েকটি ঘটনায় পুলিশি শক্তি প্রয়োগের মাত্রা নিয়ে তদন্ত শুরু হওয়ায় বিষয়টি এখন ফ্রান্সের রাজনৈতিক ও জনপরিসরে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

লঁসের ১৫ বছর বয়সী কিশোরের হাত হারানোর ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত স্টান গ্রেনেডের ব্যবহার স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তবে দেশজুড়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলতে থাকায় আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এস এম/ ০৭ অক্টোবর ২০২৬

 

Back to top button
🌐 Read in Your Language