ইউরোপ

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে ফ্রান্সজুড়ে সহিংসতা, গ্রেফতার প্রায় ২ হাজার

শিক্ষার্থীদের আন্দোলন

প্যারিস, ০২ অক্টোবর- শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার ও পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগের দাবিতে ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলন তীব্র সংঘাত ও সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। দেশজুড়ে ধর্মঘট ও প্রতিবাদ চলার সময় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে দাঙ্গা পুলিশের তীব্র সংঘর্ষ হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করেছে। অন্যদিকে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অবরুদ্ধ করে সড়ক আটকে ব্যারিকেড তৈরি করেছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার দেশজুড়ে সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে মোট ১ হাজার ৯৪৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর আগের দিনও ৬২৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনিয়েজ এই পরিস্থিতিকে অনিয়ন্ত্রিত সহিংসতা হিসেবে উল্লেখ করে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলনকারীদের হামলায় অন্তত ৩০৫ জন পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন।

পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠায় দেশটির শিক্ষামন্ত্রী এডুয়ার্ড জেফ্রে জানিয়েছেন, শুক্রবার ফ্রান্সজুড়ে ৪০০টির বেশি স্কুল বন্ধ থাকবে। তিনি অভিযোগ করেছেন, শিক্ষার্থীদের এই স্বাভাবিক আন্দোলনকে সহিংস গোষ্ঠীগুলো নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে।

এদিকে পুলিশের অনভিপ্রেত কিছু আচরণেরও তদন্ত শুরু হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হওয়ার ঘটনায় ফ্রান্সের পুলিশ ওয়াচডগ (আইজিপিএন) তিনটি আলাদা তদন্ত শুরু করেছে। রেডিও ফ্রান্স ইন্টারন্যাশনালের (আরএফআই) তথ্য অনুযায়ী, টুর্স শহরে পুলিশের ছোড়া মারণাস্ত্র নয় এমন একটি অস্ত্রের আঘাতে এক তরুণ মাথায় গুরুতর আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন কৌঁসুলিরা। তবে সামগ্রিকভাবে পুলিশের নেওয়া পদক্ষেপ পরিস্থিতির তুলনায় আনুপাতিক ও যৌক্তিক ছিল বলে আবারও জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

বিক্ষোভের কারণে দেশটির বিভিন্ন শহরের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়েছে। মার্শেইতে একটি উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে আগুন নেভাতে গেলে বিক্ষোভকারীরা ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের ওপর হামলা চালায়, যানবাহন লুট করে এবং একটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে একজন ফায়ার সার্ভিস কর্মী আহত হন। এ ছাড়া লা ফ্লোরিডা স্কুলের কাছে একটি সিটি বাস পুড়িয়ে দেওয়া হয়। আরও কয়েকটি বাসে হামলা হলে কর্তৃপক্ষ পুরো মার্শেই শহরে গণপরিবহন সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ করতে বাধ্য হয়।

পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে বৃহস্পতিবার রাতে ফরাসি সরকার জরুরি সংকটকালীন বৈঠক করে। বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় দেশটির গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে দাবি করে, এই নৈরাজ্য ও সহিংসতা বামপন্থী দল ‘লা ফ্রান্স ইনসোমিস’ (এলএফআই) এবং তাদের চরমপন্থী প্রক্সি সংগঠনগুলো পরিকল্পিতভাবে সংগঠিত করেছে।

তবে সরকারের এই অভিযোগ কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে এলএফআই। দলের মুখপাত্র ম্যানুয়েল বোম্পার্ড এএফপি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, সরকারের উচিত কোনো ষড়যন্ত্র তত্ত্বে জড়িয়ে পড়া কিংবা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শিশুর মতো বিবেচনা করা নয়। এই ক্ষোভ কোনো ষড়যন্ত্রের ফল নয়; বরং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অত্যন্ত অগ্রহণযোগ্য ও অনুন্নত পরিবেশের বিরুদ্ধেই এই স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এলএফআই-এর প্রার্থী জ্যঁ-লুক মেলেনশঁ শিক্ষার্থীদের শুধু অহিংস পদ্ধতিতে প্রতিবাদ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

ফরাসি শিক্ষার্থীরা শিক্ষাখাতে সরকারি বাজেট বাড়ানো, অতিরিক্ত ক্লাসের সময়সূচি কমানো এবং শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমানোর দাবি জানিয়ে আসছে। তবে স্কুল প্রশাসনিক ইউনিয়ন এসএনপিডিইএন-উনসা-এর ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেল ক্রিস্টেল কফম্যান জানিয়েছেন, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমানোর মতো পর্যাপ্ত সম্পদ বর্তমানে তাদের হাতে নেই। বিএফএম টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আন্দোলনে কয়েকজন প্রধান শিক্ষকও আহত হয়েছেন, যা অত্যন্ত নিন্দনীয়।

দেশজুড়ে এই আন্দোলনের কারণে অনেক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্যারিসের লিসি ডিডেরোট স্কুলের সামনে আবর্জনার বিন ও স্কুটারে আগুন ধরিয়ে দেওয়ায় ভবনের সামনের অংশ পুড়ে কালো হয়ে গেছে। অন্যদিকে নান্তেসের লিসি নেলসন-ম্যান্ডেলা স্কুলেও দুর্বৃত্তদের দেওয়া আগুনে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

এমন এক সময়ে এই নজিরবিহীন অসন্তোষ দেখা দিয়েছে, যখন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর জনপ্রিয়তা সর্বকালের সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, দেশটির মাত্র ১৬ থেকে ১৮ শতাংশ মানুষের তার ওপর আস্থা রয়েছে।

এস এম/ ০২ অক্টোবর ২০২৬

 

Back to top button
🌐 Read in Your Language