সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লরেন্স অংয়ের বেতন ৬০ শতাংশের বেশি বাড়ছে

সিঙ্গাপুর,৯ সেপ্টেম্বর – সবচেয়ে বেশি বেতন পাওয়া রাজনৈতিক নেতা হিসেবে পরিচিত সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লরেন্স অং-এর বেতন আরও বাড়তে যাচ্ছে। নতুন সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে তার বার্ষিক বেতন প্যাকেজ ২.২ মিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার থেকে বেড়ে ৩.৬ মিলিয়ন ডলার হবে। অর্থাৎ তার আয় ৬০ শতাংশের বেশি বাড়ছে। তবে এই বাড়তি অর্থ নিজের কাছে রাখবেন না বলে জানিয়েছেন অং। আগামী পাঁচ বছর অতিরিক্ত পুরো অর্থই দাতব্য কাজে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।
সিঙ্গাপুর সরকার প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি মন্ত্রী এবং অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বেতনও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারের বক্তব্য, দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের রাজনীতিতে আনতে হলে বেসরকারি খাতের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার মতো বেতন কাঠামো দরকার। বর্তমানে লরেন্স অং বছরে ২.২ মিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার বেতন পান। নতুন কাঠামো চালু হলে সেটি দাঁড়াবে ৩.৬ মিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলারে, যা প্রায় ২.৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান।
সরকারের এই সিদ্ধান্ত এমন সময়ে এসেছে, যখন সিঙ্গাপুরের সাধারণ মানুষ জীবনযাত্রার বাড়তি খরচ ও চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত। এ কারণে মন্ত্রীদের বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনাও শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার লরেন্স অং নিজেও স্বীকার করেন, সাধারণ মানুষের আয়ের তুলনায় মন্ত্রীদের অনেক বেশি বেতন নিয়ে মানুষের মধ্যে অসন্তোষ আছে। সিঙ্গাপুরে একজন সাধারণ নাগরিকের গড় মাসিক আয় প্রায় ৫ হাজার ৭৭৫ সিঙ্গাপুর ডলার।
অং-এর বক্তব্য, বেতন যথেষ্ট না হলে সফল ব্যবসায়ী, দক্ষ পেশাজীবী এবং উচ্চপর্যায়ের আমলাদের রাজনীতিতে আসতে উৎসাহিত করা কঠিন। সরকার বেসরকারি খাতের মতো সমান আয় দিতে না পারলেও, ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ সময় ছেড়ে কেউ রাজনীতিতে আসার সিদ্ধান্ত নিলে অর্থ যেন তার জন্য বড় বাধা না হয়ে দাঁড়ায়, সেই বিষয়টি মাথায় রেখেই এই বেতন কাঠামো করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
এখন সিঙ্গাপুরের মন্ত্রীদের মূল বার্ষিক বেতন ১.১ মিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার। নতুন পরিকল্পনায় তা বেড়ে ১.২ মিলিয়ন ডলার হবে। এর সঙ্গে পারফরম্যান্স বোনাস যোগ হলে বেশিরভাগ মন্ত্রী মেয়াদ শেষে প্রায় ১.৩৫ মিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার পর্যন্ত পেতে পারেন। বোনাস নির্ধারণের সময় দেশের বেকারত্ব কমানো, মানুষের আয় বাড়ানো এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা পূরণের মতো বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া হয়।
বেতন বাড়ার পরও বিশ্বের অন্যান্য ক্ষমতাধর দেশ ও সরকারের শীর্ষ নেতাদের তুলনায় লরেন্স অং-এর আয় অনেক বেশি থাকবে। হংকংয়ের প্রধান নির্বাহী জন লি বছরে প্রায় ৭ লাখ ১৯ হাজার মার্কিন ডলার আয় করেন। সুইজারল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট গাই পারমেলিনের আয় প্রায় ৬ লাখ ৬ হাজার ডলার। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বার্ষিক বেতন ৪ লাখ ডলার। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের আয় প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার ডলার।
সিঙ্গাপুরের ক্ষমতাসীন পিপলস অ্যাকশন পার্টি বা পিএপি দেশটির স্বাধীনতার পর থেকেই ক্ষমতায় রয়েছে। মন্ত্রীদের বেশি বেতন দেওয়া নিয়ে দলটি দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনার মুখে আছে। ২০১১ সালের সাধারণ নির্বাচনে বেতন কাঠামো ও অভিবাসন নীতি নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ পিএপির ভোটে প্রভাব ফেলেছিল। কয়েক দশকের মধ্যে ওই নির্বাচনে দলটি সবচেয়ে কম ভোট পেয়েছিল। এরপরের বছর সরকার মন্ত্রীদের বেতন কমিয়ে দেয়।
সিঙ্গাপুর সরকার অবশ্য মন্ত্রীদের বেশি বেতন দেওয়ার পেছনে দুর্নীতি কমানোর বিষয়টিও দীর্ঘদিন ধরে তুলে ধরে আসছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতি সূচকে সিঙ্গাপুর নিয়মিত বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে থাকায়, সরকার এটিকে তাদের উচ্চ বেতন কাঠামোর সফলতার উদাহরণ হিসেবে দেখায়। তবে লরেন্স অং এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রথম ব্যক্তি নন। তার আগে প্রধানমন্ত্রী থাকা লি সিয়েন লুংও ২০০৭ সালে বেতন বাড়ানোর পর অতিরিক্ত অর্থ দাতব্য প্রতিষ্ঠানে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
এদিকে নতুন বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়ে অনলাইনে অনেকেই সমালোচনা করেছেন। কেউ কেউ এটিকে ‘বাস্তবতাবিবর্জিত’ বলেও মন্তব্য করেছেন। তাদের প্রশ্ন, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ যখন বাড়ছে এবং চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে, তখন শীর্ষ কর্মকর্তাদের এত বড় বেতন বৃদ্ধি কতটা যৌক্তিক। সরকারি তথ্যেও শ্রমবাজারে চাপের বিষয়টি দেখা যাচ্ছে। দেশটিতে গত প্রান্তিকে কর্মী ছাঁটাইয়ের হার পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে।
তবে যারা এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করছেন, তাদের যুক্তি আলাদা। তাদের মতে, রাষ্ট্র পরিচালনার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে দেশের সবচেয়ে দক্ষ ও যোগ্য মানুষদের আনতে হলে বেসরকারি খাতের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার মতো আর্থিক সুবিধা দিতে হবে। তাই বেতন বৃদ্ধি নিয়ে বিতর্ক থাকলেও সিঙ্গাপুর সরকার তাদের বর্তমান নীতির অবস্থান থেকে সরে আসেনি।
এস এম/ ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬







