
অটোয়া, ০৬ জুন – ফেডারেল রাজনীতি থেকে বিদায় নিতে যাচ্ছেন লিবারেল এমপি নেট এরসকিন স্মিথ। হাউস অব কমন্সে টানা ১১ বছর বিচেস ইস্ট ইয়র্ক আসনের প্রতিনিধিত্ব করার পর তাঁর জন্য আনুষ্ঠানিক বিদায়ী সংবর্ধনার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। আগামী ২৫ জুন ইস্ট ইয়র্কের একটি বিয়ার হলে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক সেবাকে স্মরণীয় করে রাখতে সমর্থকরা একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করছেন।
শুক্রবার নির্বাচনী এলাকার বাসিন্দা ও ঘনিষ্ঠজনদের কাছে পাঠানো এক আমন্ত্রণপত্রে জানানো হয়, পার্লামেন্টে দীর্ঘদিন বিচেস ইস্ট ইয়র্কের প্রতিনিধিত্ব করার পর এরসকিন স্মিথ পদত্যাগ করছেন। আমন্ত্রণপত্রে তাঁর রাজনৈতিক পথচলার সঙ্গীদের একত্রিত করে এই বিদায় মুহূর্তকে স্মরণীয় করে রাখার কথা বলা হয়েছে। আবাসন মন্ত্রী হিসেবে তাঁর সংক্ষিপ্ত দায়িত্বকালও তাঁর রাজনৈতিক জীবনের উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে এই বিদায়কে শুধু আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক প্রস্থান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সম্প্রতি ওন্টারিও প্রাদেশিক লিবারেল পার্টির স্কারবোরো সাউথওয়েস্ট আসনের মনোনয়ন দৌড়ে অল্প ব্যবধানে হেরে যাওয়ার পর তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে ওন্টারিও লিবারেল নেতৃত্ব, স্কারবোরো সাউথওয়েস্ট উপনির্বাচন এবং বিচেস ইস্ট ইয়র্কের সম্ভাব্য মনোনয়ন লড়াইকে ঘিরে নতুন হিসাবনিকাশ শুরু হয়েছে।
এরসকিন স্মিথের সাম্প্রতিক বড় রাজনৈতিক ধাক্কা আসে গত ৯ মে। স্কারবোরো সাউথওয়েস্ট উপনির্বাচনে প্রাদেশিক লিবারেল প্রার্থী হওয়ার লড়াইয়ে তিনি আহসানুল হাফিজের কাছে মাত্র ১৯ ভোটে হেরে যান। ওই আসনে জিততে পারলে ওন্টারিও লিবারেল নেতৃত্বের দৌড়ে তাঁর অবস্থান শক্ত হতে পারত। কিন্তু মনোনয়ন পরাজয় সেই পরিকল্পনাকে থামিয়ে দেয়।
পরাজয়ের পর তিনি ফলাফলের বিরুদ্ধে আপিল করেন, কিন্তু সেটিও সফল হয়নি। এরপর তাঁর পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন আরও গভীর হয়। টরন্টো স্টার একাধিকবার জানতে চাইলেও তিনি এ বিষয়ে কোনো স্পষ্ট উত্তর দেননি। মাত্র ১৯ ভোটের ব্যবধান দেখিয়ে দিয়েছে, স্থানীয় সংগঠন, কমিউনিটি ভোট এবং দলীয় মনোনয়ন রাজনীতি এখন কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মনোনয়ন প্রতিযোগিতায় পরাজয়ের তিন দিন পর এরসকিন স্মিথ জানান, তিনি ফেডারেল সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করবেন। ১২ মে সিটিভির পাওয়ার প্লে অনুষ্ঠানে সঞ্চালক ভাসি ক্যাপেলোসকে তিনি বলেন, তিনি এই গ্রীষ্মের মধ্যেই পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, এই ধাক্কার পর ওন্টারিও লিবারেল পার্টির নেতৃত্বে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সম্ভাবনা এখন অনেকটাই কম।
এরসকিন স্মিথ ২০২৩ সালে ওন্টারিও লিবারেল নেতৃত্বের নির্বাচনে বনি ক্রোমবির কাছে হেরে দ্বিতীয় হন। পরে ক্রোমবি আইনসভায় কোনো আসন জিততে ব্যর্থ হন এবং নেতৃত্ব পর্যালোচনার পর পদত্যাগ করেন। ফলে নেতৃত্বের দৌড় নতুন করে উন্মুক্ত হলে এরসকিন স্মিথের স্কারবোরো সাউথওয়েস্টে প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ কৌশলগত গুরুত্ব পায়। ওই আসনে জয় পেলে আগামী ২১ নভেম্বরের নেতৃত্ব নির্বাচনে তিনি সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পারতেন।
এরসকিন স্মিথের বিদায়ের প্রস্তুতি শুরু হয়ে যাওয়ায় বিচেস ইস্ট ইয়র্ক আসনে লিবারেল মনোনয়ন ঘিরেও তৎপরতা বাড়ছে। আসনটি দীর্ঘদিন ধরে লিবারেল রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। টরন্টো স্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই আসন থেকে প্রার্থী হতে বেশ কয়েকজন আগ্রহী ব্যক্তি সামনে এসেছেন। তবে প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি চাইলে সরাসরি যেকোনো প্রার্থীকে মনোনীত করতে পারেন। ফলে স্থানীয় প্রতিযোগিতার পাশাপাশি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্তও এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
আগ্রহী প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন আইনজীবী ও সাবেক লিবারেল কর্মী ক্লেয়ার সিবোর্ন, এই আসনের সাবেক লিবারেল এমপিপি আর্থার পটস, সমাজকর্মী ও মধ্যস্থতাকারী সামার নুডেল, টরন্টোর সাবেক মেয়র জন টরির ছেলে জন টরি জুনিয়র এবং একটি দাতব্য সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা মার্ক হাল জ্যাকুইন।
বিচেস ইস্ট ইয়র্ক আসনটিও বাংলাদেশি অধ্যুষিত একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। ড্যানফোর্থ, ভিক্টোরিয়া পার্ক, ক্রিসেন্ট টাউন, ইস্ট ইয়র্কসহ আশপাশে বহু বাংলাদেশি পরিবার দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন। তাঁদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক উপস্থিতি এখন আর উপেক্ষা করার মতো নয়। ফলে ভবিষ্যৎ মনোনয়ন লড়াইয়ে বাংলাদেশি কমিউনিটির ভোট, সংগঠন ও সম্ভাব্য প্রার্থিতার বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্ব পেতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টরন্টোর বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকায় বাংলাদেশি কমিউনিটির অংশগ্রহণ দৃশ্যমান হয়েছে। বিচেস ইস্ট ইয়র্কেও সেই বাস্তবতা নতুন করে আলোচনায় আসতে পারে।
নেট এরসকিন স্মিথের বিদায় তাই শুধু একজন এমপির রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি নয়। এটি একই সঙ্গে ফেডারেল লিবারেল রাজনীতি, ওন্টারিও লিবারেল নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ এবং বিচেস ইস্ট ইয়র্কের নতুন মনোনয়ন সমীকরণেরও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। রাজনীতিতে শূন্যস্থান কখনো খালি থাকে না। কেউ বিদায় নিলে আরেকজন এগিয়ে আসে। কিন্তু কে এগিয়ে আসবে, কোন কমিউনিটি কতটা প্রভাব দেখাবে এবং দলীয় নেতৃত্ব শেষ পর্যন্ত কাকে আস্থার প্রতীক মনে করবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
তথ্যসূত্র:
Toronto Star, ৫ জুন ২০২৬
কৃতজ্ঞতা: Rob Ferguson









