ফেডারেল এমপি স্টিভেন গিলবোর পদত্যাগ, কোন পথে কার্নির লিবারেল পার্টি

অটোয়া, ২৮ মে-লিবারেল এমপি স্টিভেন গিলবো সংসদ সদস্য পদ ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন। CBC News এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৭ মে তিনি জানান, এই গ্রীষ্মে তিনি সংসদ সদস্য পদ থেকে সরে দাঁড়াবেন। তবে পদত্যাগ কার্যকর হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি লিবারেল ককাসের সদস্য হিসেবে থাকবেন। প্রথম দেখায় খবরটি হয়তো একটি সাধারণ রাজনৈতিক সংবাদ বলে মনে হতে পারে। কিন্তু কানাডার রাজনীতিতে গিলবো কোনো সাধারণ এমপি নন। পরিবেশ আন্দোলনের মঞ্চ থেকে উঠে এসে তিনি ফেডারেল মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়েছিলেন, লিবারেল সরকারের জলবায়ু নীতির অন্যতম প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। তাই তাঁর প্রস্থান লিবারেল পার্টির ভেতরের অস্বস্তি এবং কানাডার জলবায়ু রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলছে।
স্টিভেন গিলবো ২০১৯ সালে ফেডারেল রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। এর আগে তিনি পরিবেশ আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। ২০০১ সালে CN Tower এ উঠে জলবায়ু ইস্যুতে প্রতিবাদী ব্যানার প্রদর্শন করে তিনি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের দৃষ্টি কাড়েন। সেই মানুষটি যখন লিবারেল সরকারের পরিবেশনীতি থেকে পিছু হটার প্রতিবাদে প্রথমে মন্ত্রিসভা ছাড়েন এবং পরে সংসদ সদস্য পদ থেকেও সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন, তখন তা নিছক ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত থাকে না। এটি বড় একটি রাজনৈতিক বার্তা বহন করে।
এই পদত্যাগের মূল প্রশ্ন হলো, মার্ক কার্নির নেতৃত্বে লিবারেল পার্টি আসলে কোন পথে হাঁটছে? জাস্টিন ট্রুডোর সময় যে লিবারেল পার্টি জলবায়ু রাজনীতিকে নিজেদের পরিচয়ের বড় অংশ হিসেবে তুলে ধরেছিল, কার্নির অধীনে সেই দল এখন অর্থনীতি, প্রাদেশিক স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বাস্তবতার দিকে বেশি ঝুঁকছে। সব মিলিয়ে লিবারেল পার্টির পুরনো সবুজ অবস্থান আজ প্রশ্নের মুখে।
গিলবোর পদত্যাগের তাৎপর্য এখানেই। তিনি লিবারেল সরকারের জলবায়ু নীতির অন্যতম নৈতিক মুখ ছিলেন। তাঁর প্রস্থান তাই কার্নি সরকারের পরিবেশনীতি ও বাস্তব রাজনীতির দ্বন্দ্বকে সামনে নিয়ে এসেছে। Reuters ও The Guardian এর প্রতিবেদনে গিলবোর মন্ত্রিসভা ছাড়ার কারণ হিসেবে আলবার্টার সঙ্গে ফেডারেল সরকারের জ্বালানি সমঝোতা এবং জলবায়ু নীতির পিছু হটার বিষয়টি উঠে এসেছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকের চোখে এই ঘটনা কানাডার রাজনীতির একটি বড় পরিবর্তনের লক্ষণ। বিশ্বজুড়ে এখন অনেক মধ্যপন্থী দল জলবায়ু প্রতিশ্রুতি ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার মাঝখানে আটকে আছে। ইউরোপে জ্বালানি নিরাপত্তা, যুক্তরাষ্ট্রে শিল্পনীতি এবং অস্ট্রেলিয়ায় খনিজ সম্পদের প্রশ্নে সরকারগুলো প্রায় একই ধরনের চাপে রয়েছে। পরিবেশ রক্ষা করা হবে, কিন্তু অর্থনীতি কীভাবে চলবে? জ্বালানি রূপান্তর হবে, কিন্তু কর্মসংস্থান কোথায় যাবে? কানাডায় সেই দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে এখন আলবার্টা, ব্রিটিশ কলাম্বিয়া, কুইবেক এবং অটোয়ার সম্পর্ক।
গিলবোর ক্ষেত্রে এই দ্বন্দ্ব আরও সংবেদনশীল, কারণ তিনি কুইবেকের Laurier Sainte Marie আসনের এমপি। কুইবেকে পরিবেশ রাজনীতি, ফেডারেলিজম এবং প্রাদেশিক পরিচয়ের প্রশ্ন একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। গিলবো নিজেই আগে সতর্ক করেছিলেন, জলবায়ু কর্মসূচি থেকে ফেডারেল সরকারের সরে আসা কুইবেকের বিচ্ছিন্নতাবাদী রাজনীতিকে উসকে দিতে পারে। এই মন্তব্যটি হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ কানাডার জাতীয় ঐক্য সব সময় শুধু সংবিধান বা ভাষার প্রশ্নে নির্ভর করে না। কখনো কখনো পরিবেশ, সম্পদ বণ্টন, প্রাদেশিক অধিকার এবং ফেডারেল সরকারের নীতি নিয়েও জাতীয় ঐক্য পরীক্ষা দেয়।
এদিকে গিলবোর পদত্যাগ একা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার এমপি জোনাথন উইলকিনসনও হাউস অব কমন্স ছাড়ছেন। তিনি কানাডার ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন। রাজনৈতিক দিক থেকে দেখলে এটি লিবারেল বেঞ্চ থেকে আরেকজন অভিজ্ঞ এবং নীতিনির্ধারণী মুখের বিদায়। CityNews এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উইলকিনসন গ্রীষ্মের শুরুতে নতুন দায়িত্বে যোগ দেওয়ার কথা এবং তার আগে পর্যন্ত তিনি এমপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
লিবারেল রাজনীতিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নাম নেট এরস্কিন স্মিথ। টরন্টোর Beaches East York আসনের এই এমপি অন্টারিও লিবারেল রাজনীতিতে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। Scarborough Southwest এ প্রাদেশিক লিবারেল মনোনয়ন লড়াইয়ে মাত্র ১৯ ভোটে পরাজয়ের পর তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তিনি সংসদের গ্রীষ্মকালীন বিরতির আগে ফেডারেল আসন ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
লিবারেলদের সামনে এখন তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রথমত, শূন্য আসনগুলো আবার জিততে হবে। গিলবো, উইলকিনসন ও এরস্কিন স্মিথের আসন তিনটি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো হারালে কার্নির সংখ্যাগরিষ্ঠতা কমে যাবে। দ্বিতীয়ত, জলবায়ু ইস্যুতে দলকে নতুন করে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে হবে। তৃতীয়ত, মধ্যপন্থী অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও প্রগতিশীল ভোটারদের প্রত্যাশার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে হবে।
রাজনীতিতে কখনো কখনো আসন হারানোর আগে গল্প হারিয়ে যায়। লিবারেলদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সেটিই। তারা কি নিজেদের পুরনো সবুজ গল্পকে নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে নতুন আখ্যান তৈরি করতে পারবে, নাকি গিলবোর পদত্যাগ ভবিষ্যতের আরও বড় ভাঙনের প্রথম সংকেত হয়ে থাকবে?
তথ্যসূত্র:
CBC News, ২৬ মে ২০২৬
Reuters, ২৭ মে ২০২৬
এস এম/ ২৮ মে ২০২৬









