হরমুজ প্রণালি চিরতরে বন্ধের হুঁশিয়ারি ইরানের: বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় সংকটের শঙ্কা

তেহরান, ১০ মে – পারস্য উপসাগরের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি ঘিরে ঘনিয়ে আসছে সংঘাতের কালো মেঘ। যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের কর্মকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় এই আন্তর্জাতিক জলপথটি চিরতরে বন্ধ করে দেওয়ার চরম হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। তেহরানের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে, জাতীয় স্বার্থে আঘাত লাগলে তারা এই কঠোর পদক্ষেপ নিতে দ্বিধাবোধ করবে না।
ইরানের সংসদীয় জাতীয় নিরাপত্তা ও বৈদেশিক নীতি বিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান ইব্রাহিম আজিজি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) এক বার্তায় এই হুঁশিয়ারি দেন। যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত একটি জাতিসংঘ প্রস্তাবের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় তিনি বাহরাইনসহ প্রতিবেশী দেশগুলোকে সতর্ক করে বলেন, “হরমুজ প্রণালি একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথ; তাই এমন কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না যাতে ইরান এটি চিরতরে বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়।”
মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও বাহরাইনের যৌথ উদ্যোগে ইরানের বিরুদ্ধে আনা একটি খসড়া প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে এই উত্তেজনার সূত্রপাত। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের জাহাজ ও বন্দরগুলোর ওপর কঠোর অবরোধ আরোপের যে ঘোষণা দিয়েছেন, তেহরানের এই অবস্থান তারই পাল্টা জবাব।
ইরানের সংসদ এখন হরমুজ প্রণালির জন্য একটি নতুন ‘আইনি শাসন’ চালুর পরিকল্পনা করছে। ইব্রাহিম আজিজি জানান, এই সংক্রান্ত একটি বিল এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং পরবর্তী সংসদ অধিবেশনেই এটি স্থায়ী আইন হিসেবে পাস করা হবে।
প্রস্তাবিত এই আইনের প্রধান দিকগুলো হলো:
- ইসরায়েলি জাহাজে নিষেধাজ্ঞা: ইরানের ডেপুটি স্পিকার আলী নিকজাদের ভাষ্যমতে, ইসরায়েলি মালিকানাধীন বা ইসরায়েলগামী কোনো জাহাজকে কোনো অবস্থাতেই এই প্রণালি দিয়ে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হবে না।
- যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কড়াকড়ি: যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য ‘শত্রুভাবাপন্ন’ দেশের ক্ষেত্রেও একই ধরনের কঠোর নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে।
- টোল বা মাশুল আদায়: নতুন নিয়ম অনুযায়ী, এই জলপথ দিয়ে চলাচলকারী অন্যান্য দেশের জাহাজকে নির্দিষ্ট পরিমাণ ‘টোল’ দিতে হবে। এই অর্থ ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে ব্যয় করা হবে।
কেন এই চরম অবস্থান?
তেহরানের দাবি, গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় হওয়া অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির শর্ত বারবার লঙ্ঘন করেছে ওয়াশিংটন। গত ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি আগ্রাসনের জবাবে ইরান ইতোমধ্যেই নির্দিষ্ট কিছু দেশের জন্য এই জলপথটি আংশিক বন্ধ রেখেছে। এখন নতুন আইনের মাধ্যমে তারা এই নিয়ন্ত্রণকে স্থায়ী রূপ দিতে চাইছে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাবের শঙ্কা
বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ওমান ও ইরানের মধ্যবর্তী এই সরু জলপথটি বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থায় ধস নামতে পারে। এর ফলে তেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়ার পাশাপাশি বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি ভয়াবহ রূপ নেওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করছেন অর্থনীতিবিদরা।
ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, মার্কিন চাপ মোকাবিলায় তারা পিছু হটবে না। হরমুজ প্রণালিতে নতুন আইনি কাঠামো কার্যকর হলে তা কেবল আঞ্চলিক রাজনীতি নয়, বরং পুরো বিশ্বের নৌ-বাণিজ্য এবং জ্বালানি নিরাপত্তার সমীকরণ বদলে দেবে।
এনএন/ ১০ মে ২০২৬









