ঘনিষ্ঠ থেকে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী: যেভাবে মমতার চ্যালেঞ্জার হয়ে উঠলেন শুভেন্দু

কলকাতা, ৯ মে – পশ্চিমবঙ্গের সমকালীন রাজনীতিতে মমতা ব্যানার্জি ও শুভেন্দু অধিকারীর সম্পর্কটি এখন এক জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি। একসময় মমতা যাকে নিজের ‘ডান হাত’ মনে করতেন, সেই শুভেন্দুই ২০২১ সালে নন্দীগ্রামের মাটিতে মমতাকে নির্বাচনী পরাজয়ের স্বাদ চেখে দেখতে বাধ্য করেছিলেন। কীভাবে এই ঘনিষ্ঠতা চরম শত্রুতার দিকে মোড় নিল, তা বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হবে ইতিহাসের কিছু মোড় ঘোরানো পাতায়।
২০০৭ সালের নন্দীগ্রাম আন্দোলন ছিল শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক জীবনের মাইলফলক। বামফ্রন্ট সরকারের জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে তিনি মমতার অত্যন্ত প্রিয়ভাজন হয়ে ওঠেন। ২০১১ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষমতায় আসার পেছনে শুভেন্দুর এই ‘ভূমি রক্ষা আন্দোলন’ ছিল অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। সরকার গঠনের পর গুরুত্বপূর্ণ সব দপ্তরের মন্ত্রিত্ব দিয়ে মমতার আস্থার প্রতিদান পান তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, সম্পর্কের অবনতির মূলে ছিল দলের অভ্যন্তরে নেতৃত্বের কাঠামো নিয়ে বিরোধ। ২০২০ সালের দিকে তৃণমূলের শীর্ষ পর্যায়ে অভিষেক ব্যানার্জির ক্রমবর্ধমান প্রভাব শুভেন্দু সহজভাবে নিতে পারেননি। দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতা হিসেবে তিনি নিজের রাজনৈতিক গুরুত্ব ও মেদিনীপুর বেল্টে নিজের একক আধিপত্য বজায় রাখতে চেয়েছিলেন। এই মনস্তাত্ত্বিক লড়াই যখন প্রকাশ্যে আসে, তখনই বিচ্ছেদের সুর বেজে ওঠে।
২০২০ সালের ডিসেম্বরে তৃণমূলের সব পদ ত্যাগ করে শুভেন্দু যখন বিজেপিতে যোগ দেন, তখন তাকে ‘গদ্দার’ বা ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে আখ্যা দেয় তৃণমূল। কিন্তু শুভেন্দুর লক্ষ্য ছিল আরও বড়। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তিনি নন্দীগ্রাম আসনে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেন মমতা ব্যানার্জিকে। অত্যন্ত টানটান উত্তেজনার সেই নির্বাচনে শুভেন্দু অধিকারী তার প্রাক্তন নেত্রীকে ১৯৫৬ ভোটে পরাজিত করেন।
যদিও রাজ্যজুড়ে তৃণমূল কংগ্রেস পুনরায় সরকার গঠন করে, কিন্তু নন্দীগ্রামে মমতার পরাজয় ছিল শুভেন্দুর জন্য এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক জয়। এর মাধ্যমেই তিনি প্রমাণ করেন যে, মেদিনীপুরের মাটিতে তিনিই আসল ‘ভূমিপুত্র’।
বর্তমানে শুভেন্দু অধিকারী পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এখন আর পর্দার আড়ালে নয়, বরং বিধানসভার ফ্লোরে দাঁড়িয়ে সরাসরি মমতা সরকারের প্রতিটি নীতির কঠোর সমালোচনা করছেন তিনি।
শুভেন্দুর দলত্যাগের ফলে তৃণমূলের মেদিনীপুর বা দক্ষিণবঙ্গের কিছু পকেটে ভোটব্যাংক প্রভাবিত হলেও সামগ্রিক ক্ষমতার পরিবর্তন হয়নি। শুভেন্দুর মাধ্যমে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে এমন একজন নেতা পেয়েছে যিনি তৃণমূলের অন্দরমহলের খুঁটিনাটি ও নির্বাচনী কৌশল সম্পর্কে পুরোপুরি ওয়াকিবহাল।
মমতা ব্যানার্জির হাত ধরে রাজনীতির মূল স্রোতে আসা শুভেন্দু অধিকারী এখন নিজেই এক পৃথক রাজনৈতিক মেরু। একসময়ের ‘কাছের লোক’ যেভাবে নিজেকে মমতার প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তা আগামী ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। লড়াইটি এখন আর আদর্শের নয়, বরং অস্তিত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের।
এনএন/ ৯ মে ২০২৬









