দেশজুড়ে তীব্র গ্যাস সংকটে শিল্প ও আবাসিক খাতে বিপর্যয়, হুমকির মুখে রপ্তানি

মহেশখালী, ১৭ ফেব্রুয়ারি – দেশজুড়ে শিল্প খাতে গ্যাসসংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। এর ফলে শিল্প কারখানা থেকে শুরু করে আবাসিক ও পরিবহনসহ প্রায় সব খাতেই বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে টেক্সটাইল, গার্মেন্টস, সিরামিক ও স্টিলসহ বিভিন্ন উৎপাদনমুখী শিল্পের কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দুটি এলএনজি টার্মিনালের একটি রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমে থাকায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে যা চলমান এই সংকটের প্রধান কারণ। শিল্পোদ্যোক্তাদের অভিযোগ অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহের ঘাটতির কারণে তাঁরা কারখানাগুলোয় পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারছেন না। এতে একদিকে যেমন উৎপাদন কমে যাচ্ছে অন্যদিকে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয় হুমকির মুখে পড়ছে।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে রপ্তানিপণ্য সরবরাহ করতে না পারায় অনেক প্রতিষ্ঠান চুক্তি বাস্তবায়নে ব্যর্থ হচ্ছে। পরিস্থিতির কারণে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও অনেক শিল্পোদ্যোক্তা নতুন রপ্তানি কার্যাদেশ গ্রহণ বন্ধ বা কমিয়ে দিয়েছেন যার ফলে দেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পেট্রোবাংলা ও তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সূত্রে জানা যায় কক্সবাজারের মহেশখালীতে স্থাপিত ভাসমান দুটি এলএনজি টার্মিনালের মধ্যে একটি মেরামতে থাকায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। দেশে দুটি এলএনজি টার্মিনালের মোট সরবরাহ সক্ষমতা ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং দুটি চালু থাকলে দৈনিক গড়ে সাড়ে ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি গ্রিডে যোগ হয়।
বর্তমানে তা নেমে এসেছে সাড়ে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুটের কিছু বেশিতে। পেট্রোবাংলার তথ্যানুযায়ী দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট। সেখানে স্বাভাবিক সময়ে সরবরাহ থাকে প্রায় ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ নেমে আসে ২ হাজার ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে। ফলে গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৯৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। এ বিষয়ে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির অপারেশন ডিভিশনের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান জানান যে মেরামতে থাকা এলএনজি টার্মিনালটি থেকে গ্যাস সরবরাহ ইতিমধ্যে চালু করা হয়েছে।
তবে এর পূর্ণ প্রভাব পেতে প্রায় ২৪ ঘণ্টা লাগতে পারে। বর্তমানে ধাপে ধাপে গ্যাসের চাপ বাড়ানো হচ্ছে কিন্তু চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পর্যন্ত লাইন পূর্ণ চাপ তৈরি করতে কিছুটা সময়ের প্রয়োজন। রাজধানীর কুড়িল এলাকার বাসিন্দা খাইরুল শেখ জানান দুই দিন ধরে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চুলা জ্বলছে না। আগে সকালে গ্যাসের চাপ কম থাকলেও দুপুর ও রাতে গ্যাস পাওয়া যেত কিন্তু এখন ইলেকট্রিক চুলা দিয়ে রান্নার কাজ সারতে হচ্ছে। এদিকে চট্টগ্রাম, সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও নরসিংদী এলাকার শিল্প কারখানাগুলোতে গ্যাসের চাপ কম থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। শিল্পোদ্যোক্তারা জানিয়েছেন বেশ কিছুদিন ধরে চলা গ্যাসসংকটে শিল্প খাতে বিপর্যয় নেমে এসেছে এবং এক বছরের ব্যবধানে কয়েক শ কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।
সাভারের ডিইপিজেডের এফসিআই বিডি লিমিটেড কারখানার মেইনটেন্যান্স ম্যানেজার মোখলেছুর রহমান জানান সকাল থেকেই গ্যাসসংকটের কারণে বয়লার ও ওয়াশিংয়ের ড্রায়ার মেশিনসহ অনেক কিছুই চালানো যাচ্ছে না। বিকল্প হিসেবে ডিজেল ব্যবহার করায় মালিকের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। অকোটেক্স গ্রুপের ডিজিএম হোসাইন খালেক বলেন গ্যাসের সমস্যা তাদের জন্য মহামারি আকার ধারণ করেছে এবং গ্যাস না থাকায় কারখানা এক প্রকার বন্ধ রয়েছে।
গাজীপুরের কালিয়াকৈরের সাদমা গ্রুপের সাদমা ফ্যাশনওয়্যার কারখানায় গ্যাসের অনুমোদিত চাপ ১৫ পিএসআই হলেও গত রবিবার থেকে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে মাত্র এক পিএসআইয়ের কম। নরসিংদীর শেখেরচর এলাকার এমআর টেক্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ মোহাম্মদ রুমন জানান তাঁর পুরো কারখানা গ্যাসনির্ভর এবং এক সপ্তাহ ধরেই গ্যাসের চাপ কম থাকায় উৎপাদন ৩০ শতাংশে নেমে গেছে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের মুখপাত্র আবদুল্লাহ আল মামুন জানান গ্যাসের সরবরাহ কম থাকার কারণে গত এক সপ্তাহে উৎপাদন ২০ শতাংশের নিচে চলে এসেছে। দ্রুত সমস্যার সমাধান না হলে আসন্ন ঈদে শ্রমিকদের বেতন ও বোনাস প্রদানে সমস্যা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এস এম/ ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬









