
কুইবেকের প্রভাবশালী প্রিমিয়ার ফ্রাঁসোয়া লেগোর (François Legault) আকস্মিক পদত্যাগের ঘোষণায় কানাডার রাজনীতিতে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ বুধবার সকালে দেওয়া এই ঘোষণা কেবল একটি প্রাদেশিক সরকারের রদবদল নয়, বরং কুইবেক প্রশ্নকে অটোয়ার ফেডারেল রাজনীতির কেন্দ্রে আবার ফিরিয়ে এনেছে। আগামী ৫ অক্টোবর ২০২৬-এর আসন্ন নির্বাচন এখন আর কেবল ক্ষমতা পরিবর্তনের সাধারণ লড়াই নয়, বরং তা হয়ে দাঁড়িয়েছে কানাডার মানচিত্র অটুট থাকার এক অন্তিম অগ্নিপরীক্ষা।
ফ্রাঁসোয়া লেগো গত এক দশক ধরে কুইবেকের জাতীয়তাবাদী আবেগ এবং অটোয়ার ফেডারেল কাঠামোর মধ্যে এক ধরনের ভারসাম্য ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন। তার দল ‘কোয়ালিশন অ্যাভেনির কুইবেক’ (CAQ) কুইবেকারদের বোঝাতে চেয়েছিল যে কানাডার ভেতরে থেকেই বেশি স্বায়ত্তশাসন আদায় করা সম্ভব। কিন্তু লেগোর এই বিদায় সেই বিশ্বাসের দেয়ালে চরম আঘাত হেনেছে। অনেকে এটিকে জাস্টিন ট্রুডোর পদত্যাগের ঘটনার সঙ্গে তুলনা করলেও কুইবেকের পরিস্থিতি ভিন্ন, কারণ এখানে সার্বভৌমত্ব বিতর্ক আবার জোরালো হয়ে উঠেছে, যা কানাডার ফেডারেল রাজনীতিতে চাপ বাড়াচ্ছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক আশঙ্কার নাম ‘পার্টি কুইবেকোয়া’ (PQ)। পল সেন্ট পিয়ের প্লামানডনের নেতৃত্বে এই দলটি জনমত জরিপে ৩৫ শতাংশ সমর্থন নিয়ে এগিয়ে আছে। এটি কেবল একটি দলের এগিয়ে থাকা নয়, বরং সার্বভৌমত্ব বিতর্কের পুনরুত্থানের ইঙ্গিত। প্লামানডন বলেছেন, তারা ক্ষমতায় গেলে স্বাধীনতার প্রশ্নে নতুন করে গণভোট আয়োজন করবেন। ১৯৮০ ও ১৯৯৫ সালের পর এটি হবে তৃতীয় প্রচেষ্টা।
২০২৫ সালটি লেগো সরকারের জন্য ছিল কঠিন। ১৩.৬ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ড ঘাটতি বাজেট এবং ৩০ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো ক্রেডিট রেটিং কমে যাওয়া কুইবেকের মানুষের মধ্যে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
তবে কেবল অর্থনীতি নয়, কুইবেকের পরিচয়, সংস্কৃতি ও ভাষাগত জাতীয়তাবাদ নিয়েও উত্তেজনা বেড়েছে। ফরাসিভাষী জনগোষ্ঠীর একটি অংশ মনে করে, ফেডারেল কাঠামোর মধ্যে থেকে তাদের স্বতন্ত্র পরিচয় রক্ষা করা অসম্ভব। আর এই মনোভাবই তাদের ‘একলা চলার’ বা বিচ্ছিন্ন হওয়ার পথে প্ররোচিত করছে।
প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি কিংবা বিরোধী দলীয় নেতা পিয়েরে পোইলিভ্রে কারোর পক্ষেই এখন আর কুইবেককে অবজ্ঞা করা সম্ভব নয়। যদি অক্টোবর ২০২৬-এর নির্বাচনে PQ ক্ষমতায় আসে, তবে কানাডার অখণ্ডতা এক নজিরবিহীন সাংবিধানিক সংকটের মুখে পড়বে।
লেগোর বিদায়ের পর CAQ এখন নেতৃত্ব সংকটে। বিচারমন্ত্রী সাইমন জোলিন বার্টে কিংবা উপ-প্রিমিয়ার জেনেভিভ গুইলবট কারোরই সেই সর্বজনগ্রাহ্য ইমেজ নেই যা দিয়ে তারা বিচ্ছিন্নতাবাদী ঢেউকে রুখতে পারেন। এই নেতৃত্বহীনতা কুইবেকের রাজনীতিতে এক বিশাল শূন্যতা তৈরি করেছে, যা PQ এর উত্থানকে আরও সহজ করে দিচ্ছে।
ফ্রাঁসোয়া লেগোর পদত্যাগ কেবল একজন প্রিমিয়ারের বিদায় নয়; এটি কুইবেক প্রশ্নকে কানাডার রাজনীতির কেন্দ্রে আবার ফিরিয়ে এনেছে। কুইবেকের মানুষের আবেগ এবং সার্বভৌমত্বের আকাঙ্ক্ষা সহজে থামানো কঠিন, কারণ এখানে পরিচয়, ক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা একসাথে জড়িয়ে আছে। ৫ অক্টোবর ২০২৬ এর নির্বাচন কুইবেকের পরবর্তী সরকার নির্ধারণ করবে, একই সঙ্গে Ottawa-র সাথে প্রদেশটির সম্পর্কের গতিপথও অনেকটা স্পষ্ট করবে। যদি সার্বভৌমত্ব ইস্যু সামনে এসে পড়ে, তাহলে কানাডার ফেডারেল কাঠামোকে আবারও এক কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে হতে পারে।
তথ্যসূত্র:
Reuters (14 Jan 2026)
Associated Press (14 Jan 2026)
Global News (14 Jan 2026)









