
আগামী ২১ জানুয়ারি থেকে বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা ব্যবস্থায় বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হতে যাচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন প্রশাসন বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের জন্য ভিসা প্রসেসিং স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে স্টেট ডিপার্টমেন্টের একটি অভ্যন্তরীণ মেমোর উদ্ধৃতি দিয়ে ফক্স নিউজ জানিয়েছে। রয়টার্সও স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র টমি পিগটের বক্তব্যের বরাতে সিদ্ধান্তটির কথা প্রকাশ করেছে।
এই সিদ্ধান্তের ফলে কয়েক লাখ মানুষের দীর্ঘদিনের লালিত ‘আমেরিকান ড্রিম’ বা আমেরিকার স্বপ্ন এখন অনিশ্চয়তার মুখে। মূলত যাদের ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি আছে বলে প্রশাসন মনে করছে, তাদের প্রবেশপথ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করাই এই পদক্ষেপের প্রধান লক্ষ্য।
স্টেট ডিপার্টমেন্টের এই সিদ্ধান্তের মূলে রয়েছে ‘পাবলিক চার্জ’ (Public Charge) সংক্রান্ত আইনি মানদণ্ডের কঠোর প্রয়োগ। ট্রাম্প প্রশাসন মনে করছে, অনেক অভিবাসী যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের পর কাজ না করে সরকারি সুযোগ-সুবিধার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন; যেমন নগদ সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা এবং আবাসন সহায়তা। তাদের দাবি অনুযায়ী এতে করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়।
মেমোতে বলা হয়েছে, কনসুলার কর্মকর্তাদের এখন থেকে আবেদনকারীর বয়স, স্বাস্থ্য, আর্থিক সক্ষমতা, ইংরেজি ভাষার দক্ষতা এবং দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার সম্ভাব্য প্রয়োজন আছে কি না, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করতে হবে। যারা শারীরিকভাবে অসুস্থ, বয়স বেশি, অথবা অতীতে সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতার ইঙ্গিত আছে, তাদের ক্ষেত্রে ভিসা পাওয়া এখন কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে।
এই কঠোর পদক্ষেপের পেছনে প্রশাসন নিরাপত্তা ও সরকারি অর্থের অপব্যবহার রোধের যুক্তি তুলে ধরছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, গত নভেম্বরে হোয়াইট হাউসের কাছাকাছি এক হামলার ঘটনায় এক আফগান নাগরিকের সম্পৃক্ততার অভিযোগকে ট্রাম্প অভিবাসন নীতির কড়াকড়ির পক্ষে যুক্তি হিসেবে দেখিয়েছেন। অন্যদিকে কিছু প্রতিবেদনে করদাতাদের অর্থে পরিচালিত সহায়তা কর্মসূচিতে জালিয়াতির অভিযোগকেও পটভূমি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র টমি পিগট স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, “আমেরিকার সম্পদ সুরক্ষিত রাখতে এবং করদাতাদের অর্থের অপব্যবহার রোধ করতে এই দেশগুলোর ভিসা প্রসেসিং সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। আমরা আমাদের যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া বা স্ক্রিনিং স্ট্যান্ডার্ড সম্পূর্ণ নতুন করে সাজাচ্ছি।”
এই স্থগিতাদেশের কবলে পড়া ৭৫টি দেশের তালিকায় দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর নাম রয়েছে। তালিকায় বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল ও ভুটান অন্তর্ভুক্ত থাকায় যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা বাংলাদেশি আবেদনকারী এবং পরিবার নিয়ে পুনর্মিলনের আশায় থাকা মানুষদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।
তালিকায় থাকা উল্লেখযোগ্য দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে: বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, আফগানিস্তান, ইরান, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া, ইয়েমেন, মিশর, লেবানন, জর্ডান, সোমালিয়া, নাইজেরিয়া, ঘানা, ইথিওপিয়া, উগান্ডা, সুদান, রাশিয়া, ব্রাজিল, থাইল্যান্ড, কিউবা, কলম্বিয়া, উজবেকিস্তান। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তালিকার দেশগুলো ভিন্ন ভিন্নভাবে এসেছে, ফলে এটিকে উল্লেখযোগ্য অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই আদেশের সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসতে পারে তাদের ওপর, যারা ফ্যামিলি রিইউনিয়নের মাধ্যমে পরিবারের স্পন্সর করা ভিসার অপেক্ষায় ছিলেন। বহু মানুষ মা বাবা, স্বামী স্ত্রী, ভাই বোনকে যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়ার আশায় বছরের পর বছর অপেক্ষা করেছেন, কারও কারও ইন্টারভিউয়ের তারিখও ঘনিয়ে এসেছিল। ২১ জানুয়ারি থেকে দূতাবাসগুলো নতুন নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আবেদনকারীদের ভিসা প্রসেসিং স্থগিত রাখবে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। মেমোতে একে অনির্দিষ্টকাল বলা হয়েছে, অর্থাৎ নতুন স্ক্রিনিং পদ্ধতি চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত এই স্থগিতাবস্থা চলবে।
মার্কিন অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ এই পদক্ষেপকে ‘ডি ফ্যাক্টো ব্যান’ অর্থাৎ কার্যত এক ধরনের অলিখিত নিষেধাজ্ঞা হিসেবে দেখছেন। মানবাধিকার কর্মীদের আশঙ্কা, বয়স বা স্বাস্থ্যের ওপর ভিত্তি করে ভিসা প্রত্যাখ্যান করা কেবল বৈষম্যমূলকই নয়, বরং এটি মার্কিন সংবিধানের মানবিক মূল্যবোধের পরিপন্থী।
সাবেক বাইডেন প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা দাবি করছেন, ২০২২ সালে পাবলিক চার্জ বিষয়ে যে তুলনামূলক উদার নীতিধারা গড়ে উঠেছিল, ট্রাম্প প্রশাসন তা কার্যত পাল্টে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্নতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
আমেরিকার ইতিহাসে এর আগে এত বড় সংখ্যক দেশের ওপর একসাথে এমন অভিবাসন কড়াকড়ি দেখা যায়নি। এই সিদ্ধান্তের ফলে কেবল অভিবাসন প্রত্যাশীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না, বরং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও বড় ধরনের টানাপড়েন সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশসহ কয়েকটি উন্নয়নশীল দেশের ক্ষেত্রে পরিবারভিত্তিক অভিবাসনের দীর্ঘদিনের ধারায় বড় বাধা সৃষ্টি হলো।









