
নিউইয়র্ক স্বাস্থ্য বিভাগের একটি পরিদর্শক দল ম্যানহাটনের এক বাসায় আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়ে দেখেছিল এক বৃদ্ধাকে শয্যাশায়ী অবস্থায় নিবিড় পরিচর্যায় রাখা হয়েছে। নথিপত্রে লেখা ছিল, টানা ছয় বছর ধরে তার সেবায় নিয়োজিত প্রায় এক ডজন স্বজন, যারা সিডিপ্যাপ কর্মসূচির অধীনে নিয়মিত বেতন নিচ্ছেন। কিন্তু জেরা, নথি যাচাই এবং প্রযুক্তিগত তথ্য মিলিয়ে তদন্তকারীরা যে সত্যের মুখোমুখি হন, তা ছিল শিউরে ওঠার মতো। নথিতে যাঁর উপস্থিতি নিশ্চিত বলে দেখানো হয়েছিল, বাস্তবে তিনি নিউইয়র্কেই ছিলেন না, তিনি ছিলেন হাজার হাজার মাইল দূরে নিজ গ্রামের বাড়িতে।
গল্পের সবচেয়ে বিস্ময়কর বাঁকটি আসে তখন, যখন তদন্তকারীদের কাছে স্পষ্ট হয়, কর্মকর্তাদের বিভ্রান্ত করতে তার মেজ ছেলে পরচুলা ও শাড়ি পরে অসুস্থ মায়ের ছদ্মবেশ ধারণ করতেন। এই প্রতারণার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে উঠে আসে বল্লাল হোসেনের নাম। তিনি পরিবারের ১২ জন সদস্যকে কেয়ারগিভার হিসেবে তালিকাভুক্ত করে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ৩ লক্ষ ৪৮ হাজার ডলার তুলে নেন, যা দেখিয়ে দেয় জালিয়াতির বিষবৃক্ষ কতটা গভীরে শেকড় গেড়েছে।
মেডিকেড জালিয়াতি বিশেষজ্ঞ আইনজীবী রিচার্ড হ্যারো নিউইয়র্ক পোস্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এই পরিস্থিতিকে ‘ভয়াবহ’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, “মিনেসোটায় সম্প্রতি যে বিশাল জালিয়াতি ধরা পড়েছে, নিউইয়র্কের এই ঘটনা তার চেয়ে অন্তত ১০ গুণ বেশি ভয়াবহ।”
১৯৯৪ সালে চালু হওয়া ‘কনজিউমার ডিরেক্টেড পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রাম’ (CDPAP) ছিল একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। লক্ষ্য ছিল বয়স্কদের নার্সিং হোমে না পাঠিয়ে নিজ ঘরে আপনজনের সেবায় রাখা। কিন্তু সামান্য তদারকি আর ঢিলেঢালা নিয়মের কারণে এটি হয়ে ওঠে অপরাধীদের জন্য লাভজনক ক্ষেত্র। যে কেউ কোনো প্রশিক্ষণ বা সার্টিফিকেট ছাড়াই কেয়ারগিভার হতে পারতেন।
অনুসন্ধানী রিপোর্টগুলোতে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালে সিডিপ্যাপ ব্যয় ছিল ২.৫ বিলিয়ন ডলার। ২০২৩ সালে তা ৯.১ বিলিয়নে ওঠে। আর ২০২৫ সালের জন্য ব্যয় ১২ বিলিয়নের ওপরে চলে গেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
যে ব্যবস্থার ভিত্তি ছিল আস্থা, সেই আস্থাই একসময় দুর্বল জায়গায় পরিণত হয়। প্রশিক্ষণ, যোগ্যতা যাচাই, মাঠ পর্যায়ের তদারকি, এসবের ঘাটতি থাকলে ঘরের ভেতরে ঘটে যাওয়া বিলিং কারচুপি ধরতে প্রশাসনের সময় লাগে বেশি। মেডিকেড জালিয়াতি বিশ্লেষকদের মতে, সিডিপ্যাপ এখন নিউইয়র্কের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জালিয়াতির অন্যতম ক্ষেত্র, কারণ এর অনেক কর্মকাণ্ড ঘটে মানুষের ব্যক্তিগত পরিসরে, যেখানে সরাসরি নজরদারি তুলনামূলকভাবে দুর্বল।
জালিয়াতির টাকা দিয়ে নিউইয়র্কের অভিজাত এলাকায় রিয়েল এস্টেট কেনা, দামী স্পোর্টস কার চালানো আর বিলাসী জীবন কাটানো ছিল এই চক্রের সাধারণ চিত্র।
২০২৫ সালে ব্রুকলিনের ব্যবসায়ী জাকিয়া খান দোষ স্বীকার করেন যে, তিনি ৬৮ মিলিয়ন ডলারের একটি জালিয়াতি চক্র চালিয়েছেন। তার অধীনে থাকা কেন্দ্রগুলো এমন সব পরিষেবার বিল করেছে যা বাস্তবে কখনোই দেওয়া হয়নি।
ব্রুকলিনের নির্বাহী মারিয়ানা লেভিন ১০০ মিলিয়ন ডলারের হোম হেলথ কেয়ার কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়েন। মৃত ব্যক্তির নামে বিল তুলে নেওয়া কিংবা সুস্থ ব্যক্তিকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত সাজিয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়া ছিল তার দৈনন্দিন কাজ। আদালত তাকে চার বছরের কারাদণ্ড দিয়ে এক কঠোর বার্তা পাঠায়।
এই উদাহরণগুলো দেখায়, সমস্যা শুধু একটি প্রোগ্রামে সীমিত নয়, নিউইয়র্কের হোম কেয়ার অর্থনীতির বড় অংশই দীর্ঘদিন ধরে অপরাধীদের জন্য লাভজনক ক্ষেত্র ছিল।
বর্তমানে প্রায় ৪ লক্ষ কেয়ারগিভার এই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। তদন্তে দেখা গেছে, অনেক কেয়ারগিভার একই সময়ে একাধিক রোগীর বিল করেছেন, অথবা এমন রোগীর নামে টাকা তুলেছেন যারা অনেক আগেই মারা গেছেন বা হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। একই তদন্তে এমন কেয়ারগিভারও শনাক্ত হয়েছেন, যারা দিনে ২৩ ঘণ্টা কাজ করার বিল করেছেন, বছরের ৩৬৫ দিনই একই দাবি দেখিয়েছেন এবং বছরে ২ লক্ষ ডলারের বেশি মজুরিও তুলে নিয়েছেন, যা একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বেতনের চেয়েও বেশি।
এই জালিয়াতির অন্যতম বড় অংশীদার হলো আর্থিক মধ্যস্থতাকারী (Fiscal Intermediary) বা মিডলম্যানরা। প্রায় ৬০০টিরও বেশি বেসরকারি সংস্থা এই বিলিং প্রক্রিয়া পরিচালনা করত। অভিযোগ রয়েছে, তারা কোনো বাস্তব তদারকি ছাড়াই প্রতিটি রোগীর বিপরীতে মাসে ১,০০০ ডলার পর্যন্ত প্রশাসনিক ফি নিত। শুধু এই খাতেই করদাতাদের ১ বিলিয়ন ডলার অপচয় হয়েছে বলে নিউইয়র্ক পোস্টের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে নিউইয়র্ক স্টেট গভর্নর ক্যাথি হোকুল ২০২৪ সালে সিডিপ্যাপকে ‘নিউইয়র্কের ইতিহাসের সবচেয়ে অপব্যবহৃত প্রোগ্রাম’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি পুরো ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেন। শত শত মধ্যস্থতাকারীর পরিবর্তে ‘পাবলিক পার্টনারশিপস, এলএলসি’ (PPL) নামক একটি মাত্র সংস্থাকে পুরো দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এপ্রিল ২০২৫ থেকে কার্যকর হওয়া এই সংস্কারের ফলে প্রশাসনিক ব্যয় অভাবনীয়ভাবে কমে এসেছে। যেখানে আগে জনপ্রতি ১,০০০ ডলার খরচ হতো, এখন তা নেমে এসেছে মাত্র ৬৮.৫০ ডলারে। স্টেট স্বাস্থ্য বিভাগের দাবি, এই একটি পদক্ষেপে ইতিমধ্যেই করদাতাদের ১ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় হয়েছে।
নিউইয়র্কের এই ১.২ বিলিয়ন ডলারের কেলেঙ্কারি প্রমাণ করে যে, সঠিক তদারকি ছাড়া যেকোনো মহৎ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিও দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হতে পারে। বল্লাল হোসেনের মতো ব্যক্তিরা সাময়িকভাবে লাভবান হলেও, দীর্ঘমেয়াদে তারা ক্ষতিগ্রস্ত করছেন সেইসব প্রকৃত রোগীদের, যাদের জন্য এই সাহায্য একান্ত প্রয়োজন ছিল। একইসঙ্গে উত্তর আমেরিকায় অভিবাসী বাংলাদেশিদের সততা ও পরিশ্রমের যে সুনাম রয়েছে, তা কিছু মানুষের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে আজ প্রশ্নবিদ্ধ।









