
২০২০ সালের মহামারি পৃথিবীকে থামিয়ে দিয়েছিল। হাসপাতালের করিডর, টেস্টিং সেন্টার, অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন আর সরকারি ঘোষণার ভিড়ে তখন মানুষের একটাই চাওয়া ছিল দ্রুত পরীক্ষা, দ্রুত চিকিৎসা। সেই আতঙ্ক, সেই তাড়াহুড়ো আর সেই অন্ধ বিশ্বাসের ভেতরেই জন্ম নেয় যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অন্যতম বড় স্বাস্থ্যসেবা জালিয়াতির পরিকল্পনা। আজ যার হিসাব দাঁড়িয়েছে ২২৭ মিলিয়ন ডলার।
এই প্রতিবেদনের কেন্দ্রবিন্দুতে ইলিনয়ের দুই ব্যক্তি। সৈয়দ মর্তুজা ও মেহেদি হুসেইন। দুজনই কথিত মেডিক্যাল ল্যাবরেটরির মালিক ও পরিচালনাকারী। অভিযোগ অনুযায়ী, কোভিড নাইনটিন টেস্ট কিট সরবরাহের নামে তারা মেডিকেয়ারের কাছ থেকে কোটি কোটি ডলার হাতিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এই জালিয়াতি যদি এত বড় হয়ে থাকে, তাহলে এতদিন পর কেন মামলা। এই সময়টুকুতে তারা কীভাবে আড়ালে থেকে গেলেন।
ফেডারেল তদন্ত নথি বলছে, মর্তুজা ও মেহেদি এমন কিছু ল্যাব পরিচালনা করতেন, যেগুলো কাগজে কলমে কোভিড নাইনটিন টেস্ট কিট বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান। বাস্তবে সেই কিটের বড় অংশ কখনোই মেডিকেয়ার সুবিধাভোগীদের কাছে পৌঁছায়নি। বরং তারা বিদেশি নাগরিকদের নাম ব্যবহার করে ল্যাবগুলোর মালিকানা দেখান। এই নামমাত্র মালিকদের কাজ ছিল শুধু প্রয়োজনীয় কাগজে সই করা এবং তদন্তের আভাষ পেলেই যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে চলে যাওয়া। তদন্তকারীদের মতে, এটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত পালানোর পথ, যাতে প্রকৃত নিয়ন্ত্রকেরা আড়ালে থেকে যায়।
সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো তথ্যটি আসে মেডিকেয়ারের ডাটাবেস বিশ্লেষণে। হাজার হাজার দাবি জমা পড়েছে এমন মানুষের নামে যারা কোনো টেস্ট চাননি। এমনকি এমন নামও রয়েছে যারা বহু আগেই মারা গেছেন। এই তথ্য সামনে আসার পরই তদন্ত নতুন গতি পায়।
সরকারি অভিযোগ অনুযায়ী, অভিযুক্তরা একটি মার্কেটিং কোম্পানিকে অর্থ দিয়ে কয়েক লক্ষ মেডিকেয়ার সুবিধাভোগীর নাম সংগ্রহ করেন। সেই নামগুলো ব্যবহার করেই নির্বিচারে বিলিং চালানো হয়। এটি ছিল ডেটা মাইনিং নির্ভর অপরাধ। যেখানে মানুষ মুখ্য ছিল না, ছিল শুধু সংখ্যা, হিসাব আর লাভের অঙ্ক।
মেডিকেয়ারের নিয়মিত অডিট ব্যবস্থায় প্রথম অস্বাভাবিকতা ধরা পড়ে। কয়েকটি ল্যাব খুব অল্প সময়ে অস্বাভাবিক হারে বিল জমা দিচ্ছিল, আর সেই বিলের অঙ্কও ছিল চোখে পড়ার মতো। বিষয়টি এক পর্যায়ে পৌঁছে যায় এফবিআইয়ের শিকাগো ফিল্ড অফিসে, যেখানে সন্দেহ রূপ নেয় পূর্ণাঙ্গ ফেডারেল তদন্তে।
এফবিআইয়ের পাশাপাশি তদন্তে যুক্ত হয় HHS-OIG। ডেটা বিশ্লেষণ, ব্যাংক লেনদেন পর্যবেক্ষণ, ফোন রেকর্ড, ইমেইল সবকিছু মিলিয়ে ধীরে ধীরে আঁকা হয় অপরাধের মানচিত্র। তদন্তকারীরা জানান, এটি ছিল একটি ক্লাসিক কাগুজে স্বাস্থ্যসেবা জালিয়াতি, তবে প্রযুক্তির সহায়তায় এর বিস্তার ছিল ভয়াবহ।
ঘটনাগুলো ঘটেছে ২০২২ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে, কিন্তু মামলা হয় ২০২৫ সালে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এ ধরনের আর্থিক অপরাধের তদন্তে সময় লাগে। শুধু ভুয়া দাবি নয়, প্রমাণ করতে হয় পরিকল্পনা, অর্থের প্রবাহ, সুবিধাভোগী এবং প্রকৃত নিয়ন্ত্রকদের ভূমিকা। ব্যাংক হিসাব, বিদেশে অর্থ পাঠানোর চেষ্টা এবং নামমাত্র মালিকদের ব্যবহার সবকিছু যাচাই করেই অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে।
ফেডারেল কৌঁসুলিরা নিশ্চিত করেছেন, মর্তুজা ও মেহেদিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তারা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল হেফাজতে আছেন। আদালতের আদেশ অনুযায়ী, তাদের পাসপোর্ট জব্দ করা হয়েছে। জামিন বিষয়ে কঠোর শর্ত আরোপ করা হয়েছে, কারণ মামলার নথিতে পালানোর ঝুঁকির উল্লেখ রয়েছে।
তদন্ত এখানেই শেষ নয়। সরকারি নথিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, এই মামলায় অন্য সহযোগীদের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে যে মার্কেটিং কোম্পানি সুবিধাভোগীদের নাম সরবরাহ করেছে, তাদের ভূমিকা এখনো তদন্তাধীন। এছাড়া অর্থ লেনদেনে ব্যবহৃত কিছু শেল কোম্পানির বিষয়েও অনুসন্ধান চলছে।
একজন ফেডারেল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এটি দুই ব্যক্তির গল্প হলেও নেটওয়ার্কটি বড় হতে পারে।
তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, ২২৭ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে মেডিকেয়ার পরিশোধ করেছে আনুমানিক ১৩৬ মিলিয়ন ডলার। অর্থের একটি অংশ বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে শনাক্ত করা হয়েছে। কিছু অর্থ বিলাসবহুল কেনাকাটা ও রিয়েল এস্টেট বিনিয়োগে ব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে। তবে সব অর্থ উদ্ধার হয়নি।
সরকারি সূত্র বলছে, সম্পদ জব্দ ও অর্থ পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া চলমান। আদালতের রায় অনুযায়ী এই অর্থ বাজেয়াপ্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
মর্তুজা ও মেহেদির বিরুদ্ধে চারটি করে স্বাস্থ্যসেবা জালিয়াতির অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রতিটি অভিযোগে সর্বোচ্চ ১০ বছর করে কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। অর্থাৎ একজন অভিযুক্ত সর্বোচ্চ ৪০ বছরের সাজা পেতে পারেন। এছাড়া রয়েছে মোটা অঙ্কের জরিমানা ও সম্পদ বাজেয়াপ্তির ঝুঁকি।
মামলাটি পরিচালনা করছে U.S. Department of Justice এর ক্রিমিনাল ডিভিশন। বিচার বিভাগের ভাষায়, জনস্বাস্থ্য সংকটকে পুঁজি করে ব্যক্তিগত লাভের চেষ্টা সবচেয়ে গুরুতর অপরাধগুলোর একটি।
এই মামলা কেবল দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়। এটি দেখিয়ে দিয়েছে, জরুরি পরিস্থিতিতে বড় সরকারি কর্মসূচি কতটা ঝুঁকির মুখে পড়ে। কোভিড নাইনটিন পরীক্ষার জন্য ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা দ্রুত চালু করা হয়েছিল। সেই দ্রুততার সুযোগই নিয়েছে এই চক্র। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যতে এমন কর্মসূচিতে শক্ত যাচাই ব্যবস্থা ছাড়া বিপর্যয় ঠেকানো কঠিন।
এই অনুসন্ধান এখনো চলমান। আদালতের চূড়ান্ত রায় আসেনি, এবং আইনের চোখে অভিযুক্তরা এখনো নির্দোষ। তবে রাষ্ট্রীয় তহবিল লুটের এই অভিযোগ প্রমাণিত হলে, তা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতারণা মামলার তালিকায় এক ভয়াবহ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হবে।
তথ্য সূত্র:
U.S. Department of Justice
Federal Bureau of Investigation
U.S. Department of Health and Human Services Office of Inspector General
United States District Court filings









