
নিউ জার্সির এক নিঃসঙ্গ উপশহরে সন্ধ্যা নামছিল ধীরে ধীরে। পশ্চিম আকাশে রক্তিম সূর্যটা তখন হেলে পড়ছে দূরের দিগন্তে, আকাশের রঙে ছড়িয়ে পড়েছে সোনালি আভা আর দীর্ঘ ছায়া। হেমন্তের হালকা বাতাসে বারান্দার পর্দা নাড়ছিল, যেন এক অদৃশ্য হাত ছুঁয়ে দিচ্ছে প্রবাসী জীবনের ক্লান্ত প্রান্তর। ঘরের ভিতর থেকে ভেসে আসছিল রান্নার শব্দ, মাঝে মাঝে বাসন ধোয়ার ছিটেফোঁটা জল যেমন হুট করে ছিটকে পড়ে দেয়ালে, তেমন একেকটা শব্দ যেন সময়ের গায়ে দাগ কেটে চলেছিল।
ঠিক এমন শান্তির মুহূর্তে হঠাৎ করেই বেজে উঠল মোহাম্মদ হাসানের মোবাইল ফোন। সেই রিংটোন ছিল না কোনো চেনা নম্বরের, তবু যেন তার কানে ধাক্কা দিয়ে উঠল একটি অজানা আতঙ্কের বার্তা নিয়ে।
ফোনটা যেন শুধু শব্দ নয়, একটা গভীর অস্থিরতা ছড়াতে লাগল ঘরের প্রতিটি কোণে। দেয়ালের ঘড়ির কাঁটা তখন টিকটিক করে চলেছে, কিন্তু মনে হচ্ছিল সময় থমকে গেছে।
হাসান এগিয়ে গেলেন ধীরে ধীরে, হাত বাড়িয়ে ফোনটা তুললেন। কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, “হ্যালো?”
তাঁর কণ্ঠে ছিল অনিশ্চয়তা, চোখে ছিল এক অদৃশ্য বিপদের পূর্বাভাস।
এই একটিমাত্র শব্দের মধ্যে যেন পুরো প্রবাসজীবনের হাজারো আশঙ্কা, হাজারো অসম্পূর্ণতা আর এক গভীর শূন্যতা মিশে গিয়েছিল। যেন সেই ‘হ্যালো’-র ভেতরেই লুকিয়ে ছিল এক দুঃস্বপ্নের শুরু।
ওপাশে কঠোর, অথচ মেশিনের মতো এক কণ্ঠ: “This is Officer Mark from the IRS Criminal Division. There is a warrant issued in your name for tax evasion. Unless you act immediately, police will be at your doorstep in 30 minutes.” (আমি আইআরএস-এর অপরাধ তদন্ত বিভাগের অফিসার মার্ক বলছি। আপনার নামে কর ফাঁকির অভিযোগে একটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। আপনি যদি সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা না নেন, তাহলে আগামী ৩০ মিনিটের মধ্যে পুলিশ আপনার দরজায় উপস্থিত হবে।)
সেই মুহূর্তে, প্রবাসজীবনের সমস্ত সঞ্চিত ভয়, অভিমান আর অনিরাপত্তা একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়ে তার মাথায়। সে ভুলে যায় যে IRS কখনো ফোন করে না। ভুলে যায় আইন, যুক্তি, পরিবার সবকিছু। সে শুধু মনে রাখে একটাই কথা, তাকে গ্রেফতার করা হবে। এই আতঙ্কই ছিল সেই $১০০ মিলিয়ন স্ক্যামের মূলধন।
এই ছিল সেই শুরু। একটি ফোনকল, একশো মিলিয়ন ডলারের প্রতারণা। ২০২৩ সালে উন্মোচিত হয় যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশে বিস্তৃত একটি সাইবার অপরাধ নেটওয়ার্ক, যার নেতৃত্বে ছিল বাংলাদেশি-আমেরিকান নাগরিকদের একটি সংঘবদ্ধ চক্র। তারা ফোন কল করে নিজেদের IRS বা ফেডারেল এজেন্ট পরিচয় দিয়ে সাধারণ আমেরিকান নাগরিকদের থেকে ভয় দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নিত। এই অপারেশনকে বলা হয় “ভিশিং”। ফিশিংয়ের ভয়েস ভার্সন।
তবে এই গল্প শুরু হয় আরও আগে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশের একটি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির চার তরুণ, যারা প্রথমবারের মতো কল স্পুফিংয়ের চর্চা করে। তারা খুঁজছিল এমন কিছু, যা দ্রুত অর্থ এনে দিতে পারে। তাদের সাথে যুক্ত হন নিউ জার্সির এক বাংলাদেশি যুবক শফিক আহমেদ, যিনি একসময় টেলিমার্কেটিংয়ের চাকরি করতেন। তার মনে জন্ম নেয় এক ভয়ঙ্কর বুদ্ধি। IRS-এর নাম ব্যবহার করে ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের কৌশল।
এই চক্র শুধু ফোন করত না, তারা গড়ে তুলেছিল এক জটিল ও সুসংগঠিত প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো। ঢাকার মিরপুর, সিলেটের উপশহর, এমন কয়েকটি জায়গায় কল সেন্টার স্থাপন করা হয়। এই কেন্দ্রগুলোতে VOIP সফটওয়্যার ব্যবহার করে IRS-এর আসল নম্বর ‘স্পুফ’ করে ফোন করা হতো। ব্যবহার করা হয় অটো-ডায়ালিং সফটওয়্যার, যার মাধ্যমে প্রতিদিন ৫০০+ টার্গেটকে কল করা হতো।
নিউ ইয়র্কের কুইন্স ও টেক্সাসের হিউস্টনে ছিল তাদের আমেরিকান ঘাঁটি। সেখানে বাংলা ও ইংরেজি স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ‘এজেন্ট’রা ফোন করত। তারা আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে বলত: “Your Social Security Number is compromised. We can help, but you must act now.”
স্ক্যামের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিক ছিল এর আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থা। ভুক্তভোগীদের বলা হতো তারা যেন Bitcoin ATM থেকে ক্রিপ্টো কিনে নির্দিষ্ট ওয়ালেটে পাঠায়, কিংবা গিফট কার্ড কিনে কোড জানায়। পরবর্তীতে এই ক্রিপ্টো বাংলাদেশে বিক্রি করে হুন্ডির মাধ্যমে টাকা তুলে নেওয়া হতো।
বিশেষভাবে চট্টগ্রামের কিছু হুন্ডি ব্যবসায়ি এই কাজে যুক্ত ছিল, যারা মধ্যপ্রাচ্য হয়ে বাংলাদেশে অর্থ আনত। কিছু টাকা দিয়ে প্রপার্টি কেনা হতো, কিছু যেত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে। বাংলাদেশি একটি প্রভাবশালী ব্যাংক ছিল এই চক্রের লেনদেনের হাব। এই টাকা বাংলাদেশে বৈধ রেমিট্যান্স হিসেবে রেকর্ড হলেও, আসলে তা ছিল ডিজিটাল ছিনতাইয়ের সাফ সাদা চেহারা।
২.
ক্যালিফোর্নিয়ার গরম এক দুপুরে, মোবাইল ফোনে বাজে অপরিচিত এক নম্বর। ৬৭ বছর বয়সী মারিয়া গোমেজ ফোন ধরতেই শোনেন, “Your Social Security Number has been suspended for suspicious activities.”
ভদ্রমহিলা ভীত। তার স্বামী মারা গেছেন, একমাত্র ছেলেটিও কয়েক বছর আগে ওভারডোজে মারা যায়। তিনি এখন নিজের বেঁচে থাকার জন্য পুরোপুরি নির্ভর করেন সরকারের সোশ্যাল সিকিউরিটি ইনকামের উপর।
তারপর শুরু হয় টার্গেটেড ভয়: “Unless you transfer all your funds to a safe government wallet, your identity will be permanently blocked.” (আপনি যদি আপনার সমস্ত অর্থ একটি নিরাপদ সরকারি ওয়ালেটে স্থানান্তর না করেন, তাহলে আপনার পরিচয় স্থায়ীভাবে অবরুদ্ধ করা হবে।)
মারিয়া ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তার জীবনভর সঞ্চিত $৪২,০০০ ডলার একটি ‘সেইফ অ্যাকাউন্টে’ ট্রান্সফার করে দেন। এ অর্থের একটি বড় অংশ ছিল তার মৃত স্বামীর থেকে পাওয়া রিটায়ারমেন্ট সেভিংস। কিছুদিন পর, এক সরকারি চিঠিতে তিনি বুঝতে পারেন যে অ্যাকাউন্টটিকে ‘সেইফ’ বলা হয়েছিল, তা আসলে প্রতারকদেরই ফাঁদ ছিল।
আরো মর্মান্তিক কাহিনি আব্দুল্লাহ আল মামুনের। সিলেট থেকে আসা এক প্রবাসী বাংলাদেশি, যিনি ক্যালিফোর্নিয়ার হোটেলে কাজ করতেন। তাকে বলা হয়, “You’re in violation of immigration law. A federal agent is coming to detain you.”
ভয়ে, লজ্জায়, স্তব্ধতায় তিনি কোনো বন্ধু বা আইনজীবীকে না জানিয়ে $৫,০০০ পাঠিয়ে দেন। তারপর নিজের স্ত্রীকে কল করে বিষয়টি জানিয়ে বলেন, “মনে হয় ভুল করে ফেলেছি।”
FBI-এর একজন এজেন্ট মাইকেল কোহেন ছদ্মনামে ঢুকে পড়েন এই চক্রে। “মোহনা আক্তার” নামে তিনি তিন মাস ধরে স্ক্যামারদের সঙ্গে কথা বলেন। একদিন এক স্ক্যামার তাকে বলে, “গত মাসে ২০ লাখ ডলার পাঠাইছি। পেয়েছো?”
এই কথোপকথনের পরপরই FBI তাদের “Operation Telecom Takedown” শুরু করে। ঢাকার মিরপুর, সিলেট ও নিউ ইয়র্কে একযোগে অভিযান হয়।
RAB ও বাংলাদেশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট এক রাতের ভেতরেই ৫টি কল সেন্টার ভেঙে ফেলে। জব্দ করা হয় ১২টি ল্যাপটপ, যেখানে পাওয়া যায়:
- IRS-এর ভুয়া স্ক্রিপ্ট।
- কল রেকর্ডিং যেখানে প্রতিটি স্ক্রিপ্ট ছিল ভয় দেখানোর জন্য, প্রতিটি লাইন যেন একেকটি গুলি। এসব স্ক্রিপ্টের ভাষা আতঙ্কে কাঁপিয়ে দিচ্ছিল নিরীহ মানুষদের।
- ১২,০০০+ (অনুমান ভিত্তিক) ভুক্তভোগীর এক্সেল ডাটাবেস।
আসাদুল ইসলাম, একসময় সিলেটের একটি বেসরকারি কলেজে পড়তেন, পরে ড্রপআউট। এক বন্ধুর মাধ্যমে চাকরি নেন ‘টেলিমার্কেটিং’ -এ। স্বীকারোক্তিতে বলেন, “আমি জানতাম না এটা বেআইনি… বস বলেছিল এটা মার্কেটিং!”
জেসিকা রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রী, যিনি ডার্ক ওয়েবে “ফিশিং কিট” বিক্রি করতেন। তিনি একসময় বিতর্ক প্রতিযোগিতায় জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে জীবনের টানাপোড়েনে পা রেখেছিলেন এই ছায়ার জগতে। তাকে গ্রেফতারের সময় ল্যাপটপে পাওয়া যায় ‘irs-taxpayment.com’ নামে তৈরি এক ভুয়া সাইট।
মোহাম্মদ রহিম ওরফে ডেভিড রহমান, এই চক্রের মূল মস্তিষ্ক, ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে পরিচিত। নিউ জার্সিতে বসবাসকারী এই বাংলাদেশি-আমেরিকান অপরাধী জীবনযাপনে ছিলেন বিলাসী ও উচ্চাভিলাষী। তার গ্যারেজে ছিল চারটি বিলাসবহুল গাড়ি, হাতে থাকত প্রাচীন নকশার সুইস ঘড়ি, আর যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশে ছড়িয়ে ছিল নানা সম্পদের জাল।
বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে মামলার প্রধান আসামি, যার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ২৫ বছরের কারাদণ্ড চাওয়া হয়েছে ফেডারেল কোর্টে। সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, একই মামলায় আরও পাঁচজনের বিচার চলছে এবং সেখানে ইতোমধ্যেই ১০০ জনের বেশি সাক্ষ্য নথিভুক্ত হয়েছে।
নিউ ইয়র্ক টাইমস ও বিবিসি-সহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো এ ঘটনাকে একটি “transnational cyber fraud ring” আখ্যা দিয়ে বিশদ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
তথ্যসূত্র:
1. নিউ ইয়র্ক টাইমস (১৫ জুলাই ২০২৩): “How a Bangladeshi-American Ring Stole $100 Million via IRS Scams”
2. U.S. Department of Justice (DOJ) প্রেস রিলিজ (জুন ২০২৩): United States v. Rahman et al. (Case No. 23-CR-00412, SDNY)
দ্রষ্টব্য: প্রতিবেদনের কিছু অংশে ব্যবহৃত নাম ও ঘটনা কল্পনানির্ভর বা চরিত্রভিত্তিক পুনর্গঠন। এগুলো বাস্তব অনুসন্ধান ও ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে উপস্থাপিত হয়েছে সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে।









