সম্পাদকের পাতা

হ্যামিলটনের গাড়ি চুরি চক্রে বাংলাদেশি যুবক গ্রেপ্তার

নজরুল মিন্টো

হ্যামিলটনের সকাল তখনো পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। রাস্তার দুপাশে ভেজা পাতায় জমে থাকা রাতের শিশির আর দূর থেকে ভেসে আসা ট্র্যাফিকের ক্ষীণ শব্দ শহরটিকে ধীরে ধীরে জীবন্ত করে তুলছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে স্থানীয় গণমাধ্যমে এমন একটি খবর ছড়িয়ে পড়ল, যা শহরের মানুষকে থমকে দিল। বছরের পর বছর ধরে লুকিয়ে থাকা এক চক্রের মুখোশ খুলে গেল। পুলিশ জানাল, অবশেষে তারা ধরতে পেরেছে একটি বিস্তৃত গাড়ি চুরি নেটওয়ার্কের মূল হোতাকে।

এই তদন্ত ছিল দীর্ঘমেয়াদি। শহরজুড়ে গাড়ি চুরির অভিযোগ বাড়ছিল, অথচ কেউই বুঝতে পারছিল না ঠিক কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে গাড়িগুলো। অনেকেই ভোরে কাজে বের হতে গিয়ে দেখতেন, আগের রাতে গ্যারেজে রাখা গাড়িটি উধাও। তিন ডজনের বেশি গাড়ি এভাবে মিলিয়ে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সন্দেহ গিয়ে ঠেকে হ্যামিলটনের বেঙ্গল অটো নামের একটি ডিলারশিপে। ডিলারশিপটি পরিচালনা করত বাংলাদেশি মালিক। আর যে যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তার নাম ববি আব্দুল, বাড়ি বাংলাদেশের সিলেট জেলায়।

হ্যামিলটনে সম্প্রতি প্রকাশ পাওয়া গাড়ি চুরি চক্রের কর্মকাণ্ড সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন ধরনের আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। বহুদিনের সঞ্চয়ে গাড়ি কেনার পর মালিকেরা স্বাভাবিকভাবেই মনে করতেন তাদের কেনাকাটা নিরাপদ। কিন্তু রুটিন পুলিশ চেকিংয়ের সময় গাড়ি চোরাই হিসেবে শনাক্ত হওয়ার ঘটনা যেন সব নিশ্চিততা ভেঙে দিচ্ছে। বৈধ রসিদ, মালিকানা পরিবর্তনের কাগজ, রেজিস্ট্রেশন বা ব্যাংক ফাইন্যান্সিংয়ের নথি থাকা সত্ত্বেও পুলিশের কাছে প্রমাণিত হচ্ছে গাড়িটি মূলত অন্য কোথাও থেকে চুরি করা হয়েছিল। ফলে বৈধ কাগজপত্র নিয়েও ক্রেতারা হঠাৎ করেই জটিল আইনি সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন।

এ ধরনের ঘটনায় গাড়ির মালিকেরা শুধু আইনি ঝুঁকিতেই পড়ছেন না, ব্যক্তিগত মর্যাদা, মানসিক স্থিতি এবং আর্থিক নিরাপত্তাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। চোরাই গাড়ির অভিযোগে থানায় নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের মতো পরিস্থিতি বাস্তবে অনেকের জীবনকে অস্থির করে তুলছে। যা একসময় কেবল কল্পনা ছিল, সেটিই এখন কানাডার রাস্তায় দুঃসহ বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।

হ্যামিলটন পুলিশের ডিটেকটিভ স্টাফ সার্জেন্ট ডেভ ব্রুস্টার বলেন, সাধারণ ক্রেতারা কখনো ভাবেন না যে ডিলারশিপ থেকে কেনা গাড়িটি চোরাই হতে পারে। কারণ ডিলারের দোকান বৈধ, কাগজপত্র ঠিকঠাক, গাড়ির রেজিস্ট্রেশন স্বাভাবিক। তাই ক্রেতারা সন্দেহই করেন না। পরে পুলিশ গাড়ি থামিয়ে ভিআইএন নম্বর পরীক্ষা করলে সব রহস্য বেরিয়ে আসে।

তিনি পরামর্শ দিয়েছেন ব্যবহৃত গাড়ি কেনার আগে অবশ্যই গাড়ির ইতিহাস যাচাই করার জন্য। কারফ্যাক্স বা অনুরূপ সেবার মাধ্যমে আগের মালিকানা, ব্যবহারের ধরন, রপ্তানি বা দুর্ঘটনার ইতিহাস সবই জানা যায়।

হ্যামিলটন পুলিশের ব্রেক অ্যান্ড এন্টার, অটো থেফট অ্যান্ড রবারি ইউনিট শহরজুড়ে বাড়তে থাকা গাড়ি চুরির ঘটনার ওপর নজর রাখছিল অনেক দিন ধরে। অন্টারিও পরিবহন মন্ত্রণালয়, ইকুইটি অ্যাসোসিয়েশন, অন্টারিও মোটর ভেহিকল ইন্ডাস্ট্রি কাউন্সিল এবং পার্শ্ববর্তী পুলিশ পরিষেবাকে সঙ্গে নিয়ে তারা শুরু করে ‘প্রজেক্ট বিগ ক্যাট’। তদন্ত ছিল ধৈর্য, তথ্য বিশ্লেষণ ও সমন্বয়ের একটি জটিল যাত্রা।

দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর তারা আবিষ্কার করে এক চোরাই গাড়ির নেটওয়ার্ক, যা শুনলে মনে হবে কোনো চলচ্চিত্রের গল্প। চোরাই গাড়িগুলোর ভিহিকল আইডেন্টিফিকেশন নম্বর বা ভিআইএন পরিবর্তন করা হতো খুব দক্ষতার সঙ্গে। কখনো বিদেশে রপ্তানি হওয়া গাড়ির পরিচয় ব্যবহার করা হতো, কখনো দুর্ঘটনায় বাতিল হয়ে যাওয়া গাড়ির তথ্য বসানো হতো আরেকটির ওপর। এরপর সেই গাড়ি ডিলারশিপের মাধ্যমে বৈধ হিসেবে রেজিস্টার হতো এবং বিক্রি হয়ে যেত সাধারণ ক্রেতার কাছে। বাহ্যিকভাবে গাড়িটির কোনো ভিন্নতা বোঝা যেত না, ফলে মালিকানার নথি ঠিক থাকলে ক্রেতারা স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বাস করতেন এটি বৈধ গাড়ি। আর ঠিক সেই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়েই চক্রটির হাতে তারা পরিণত হতেন দ্বিতীয় শিকারে।

গত বৃহস্পতিবার হ্যামিলটন পুলিশের নেতৃত্বে কয়েকটি স্থানে একযোগে অভিযান চালানো হয়। প্রধান লক্ষ্য ছিল বেঙ্গল অটো, জনবসতি থেকে দূরে অবস্থিত একটি গ্রামীণ এলাকা যেখানে চোরাই গাড়িগুলো লুকিয়ে রাখা হয়েছিল এবং একটি আবাসিক বাড়ি যেখানে নথিপত্র সংরক্ষণ করা রয়েছে বলে সন্দেহ ছিল। তিন জায়গাতেই পুলিশ গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ সংগ্রহ করে। এই অভিযানের ফলেই গ্রেপ্তার হয় বেঙ্গল অটো’র ববি আব্দুল।

পুলিশ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত চক্রটির সঙ্গে জড়িত ৩৬টির বেশি চোরাই গাড়ি শনাক্ত হয়েছে যার বাজারমূল্য প্রায় ২ দশমিক ৭ মিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ২৩টি গাড়ি উদ্ধার করা গেছে। বাকি গাড়িগুলোর খোঁজ অব্যাহত রয়েছে।

গ্রেপ্তারকৃত ববি আব্দুলের বিরুদ্ধে মোট ১৫টি ফৌজদারি অভিযোগ আনা হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে:
• জালিয়াতি
• অপরাধের মাধ্যমে প্রাপ্ত সম্পত্তি পাচার
• জাল নথি তৈরি ও ব্যবহার
• চোরাই গাড়ি দখল
• ভিআইএন নম্বর পরিবর্তন বা ধ্বংস করা

গ্রেপ্তারের পর ববিকে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। তবে পুলিশ জানিয়েছে, এ মামলার তদন্ত অব্যাহত থাকবে এবং আরও অভিযুক্ত থাকতে পারে।

রেডিও, টেলিভিশন ও সংবাদপত্রে খবরটি প্রচারিত হওয়ার পর হ্যামিলটন ও টরন্টোর বাংলাদেশি কমিউনিটিতে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়া ভরে গেছে নিন্দা, ক্ষোভ এবং হতাশার মন্তব্যে। কমিউনিটির অনেকেই বলছেন, কয়েকজনের অপরাধ পুরো সম্প্রদায়ের সুনামকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। কানাডায় বাংলাদেশিরা বছরের পর বছর পরিশ্রম, সততা ও মেধার মাধ্যমে যে মর্যাদা গড়ে তুলেছেন, কিছু অসৎ ব্যক্তি রাতারাতি ধনী হওয়ার লোভে সেই বিশ্বাসযোগ্যতাকে নষ্ট করছে এবং পুরো কমিউনিটিকে অযাচিত সন্দেহের মুখে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে।

ইমিগ্রেশন সহায়তার নামে প্রতারণা, বাড়ি কেনা বেচায় প্রতারণা, মর্টগেজ জালিয়াতি, নিজের বাড়িতে বা দোকানে আগুন লাগিয়ে ইন্স্যুরেন্স দাবি করা, এ ধরনের অপরাধ বারবারই কমিউনিটির ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। প্রবীণ নেতারা বলছেন, অপরাধীদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তাদেরকে চিহ্নিত করে বয়কট করতে হবে।

হ্যামিলটনের এই ঘটনা কেবল একটি মামলার গল্প নয়। এটি পুরো অভিবাসী সমাজের জন্য সতর্কবার্তা। একটি অপরাধ যে কতগুলো পরিবারকে বিপদে ফেলতে পারে, কত মানুষের সুনাম নষ্ট করতে পারে এবং কতটা অস্থিরতা তৈরি করতে পারে, তার একটি স্পষ্ট উদাহরণ এটি।

তথ্যসূত্র:
• CP24 (Nov 14, 2025)
• Toronto Star (Nov 14, 2025)
• CBC News Toronto (Nov 15, 2025)
• Hamilton Spectator (Nov 15, 2025)
• CTV News Toronto (Nov 14, 2025)


Back to top button
🌐 Read in Your Language