
শরতের মৃদু বাতাসে যখন কানাডার ম্যাপলপাতা শুকিয়ে ঝরে পড়ে, তখনই দেশজুড়ে জেগে ওঠে স্মৃতি আর শ্রদ্ধার এক বিশেষ ঋতু। নভেম্বর মাসের প্রথম দিন থেকেই কানাডার রাস্তাঘাট, স্কুল, অফিস, শপিং মল এমনকি ছোট শহরের লাইব্রেরি পর্যন্ত ভরে ওঠে এক প্রতীকী ফুলে, লাল পপিতে। সেই ফুলের পাপড়িতে লুকিয়ে থাকে স্মৃতি, ত্যাগ, বেদনা আর কৃতজ্ঞতার ইতিহাস। কেউ সেটি কিনে বুকে গেঁথে রাখেন, কেউ আবার বিনামূল্যে বিলিয়ে দেন সর্বত্র। এটি কেবল একটি ফুল নয়, এক জাতির আত্মার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা প্রতীক।
প্রতি বছরের ১১ নভেম্বর কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডসহ কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোতে পালিত হয় Remembrance Day, যা বিশ্বের অনেক দেশে Armistice Day বা Veterans Day নামে পরিচিত। যুক্তরাজ্যে এই দিনে লন্ডনের Cenotaph–এ রাজপরিবার ও প্রধানমন্ত্রী শ্রদ্ধা জানান, আর অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে এপ্রিল মাসে পালিত হয় Anzac Day, Gallipoli যুদ্ধের শহিদদের স্মরণে।
১৯১৮ সালের এই দিনেই শেষ হয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা। সেই যুদ্ধের সমাপ্তির চুক্তি, আর্মিস্টিস, স্বাক্ষরিত হয় জার্মানির পরাজয়ের মধ্য দিয়ে ফ্রান্সের এক রেলগাড়ির কামরায়। সকাল ১১টা বাজতেই থেমে যায় বন্দুকের শব্দ, স্তব্ধ হয়ে পড়ে যুদ্ধের ময়দান। তাই প্রতি বছর ১১ নভেম্বর সকাল ১১টায় কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর মানুষ স্মরণ ও প্রার্থনার সেই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে।
বিশেষ করে কানাডায় এই দিনটির আবেগ ভিন্ন মাত্রায় অনুভূত হয়। দেশটি Remembrance Day-কে জাতীয় মর্যাদায় পালন করে। সরকারি ভবনগুলোয় অর্ধনমিত পতাকা, সৈনিক স্মৃতিস্তম্ভে ফুলের মালা, আর শহরের কেন্দ্রজুড়ে মানুষের জমায়েত দেখা যায়। এক মিনিটের স্থিরতায় থেমে থাকে রাস্তায় চলা গাড়ি, মেট্রো কিংবা স্কুলের ক্লাসরুমও। সবাই তখন মাথা নত করে স্মরণ করে সেই সব তরুণ সৈনিকদের, যারা জীবনের বিনিময়ে এনে দিয়েছিলেন শান্তি ও স্বাধীনতা।

“Least We Forget”—এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু গভীর বাক্যটি যেন প্রতিটি পপির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক চিরন্তন প্রতিশ্রুতি। মূলত এই শব্দবন্ধটি এসেছে ব্রিটিশ কবি রুডইয়ার্ড কিপলিংয়ের কবিতা Recessional থেকে, যেখানে তিনি লিখেছিলেন, “Lest we forget, lest we forget!” অর্থাৎ, যেন আমরা না ভুলে যাই। এই বাক্যটি যুদ্ধের ভয়াবহতা ও আত্মত্যাগের স্মৃতি মনে রাখার এক নৈতিক দায়িত্বের কথা স্মরণ করায়।
আজও কানাডার টেলিভিশন, রেডিও কিংবা সংবাদপত্রে নভেম্বর মাসজুড়ে এই শব্দগুলো প্রতিধ্বনিত হয়। স্কুলের শিশুদের শেখানো হয় যে, স্বাধীনতা কখনও বিনা মূল্যে আসে না। কারও না কারও রক্তে লেখা থাকে আমাদের শান্তির ইতিহাস।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞে ইউরোপের অনেক অঞ্চল পরিণত হয়েছিল এক বিশাল কবরস্থানে। বিশেষ করে বেলজিয়ামের ফ্ল্যান্ডার্স (Flanders) অঞ্চল, যেখানে হাজার হাজার সৈনিকের দেহ মিশে গিয়েছিল রক্ত ও কাদার মাটিতে। যুদ্ধ শেষে সেই মৃতভূমিতে আশ্চর্যভাবে ফুটে উঠেছিল লাল পপি ফুল। এই দৃশ্যই অনুপ্রেরণা জোগায় কানাডীয় চিকিৎসক ও কবি লেফটেন্যান্ট কর্নেল জন ম্যাক্রেকে। তিনি ১৯১৫ সালে লিখেছিলেন অমর কবিতা In Flanders Fields।
In Flanders fields the poppies blow
Between the crosses, row on row…
এই কবিতার লাইনেই পপি ফুল পরিণত হয় যুদ্ধের স্মৃতির প্রতীকে। ফুলটি তখন থেকে হয়ে ওঠে শান্তির প্রতীক, যুদ্ধে নিহতদের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার প্রতিচ্ছবি।
১৯২১ সালে কানাডায় প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় পপি প্রচারণা। এই উদ্যোগের পেছনে ছিলেন ফরাসি সমাজকর্মী ম্যাডাম আনা গ্যুরিন এবং রয়্যাল কানাডিয়ান লিজিয়ন। তাঁরা চেয়েছিলেন পপি বিক্রির মাধ্যমে যুদ্ধে আহত সৈনিক ও তাঁদের পরিবারের সহায়তা করতে। খুব দ্রুতই এই উদ্যোগ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
আজও প্রতি নভেম্বর মাসে কানাডিয়ান লিজিয়ন সদস্যরা রাস্তায়, স্টোরে বা স্টেশনে দাঁড়িয়ে পপি বিতরণ করেন। মানুষ ইচ্ছামতো অনুদান দেন। সেই অর্থ যায় যুদ্ধাহত ও অবসরপ্রাপ্ত সৈনিকদের কল্যাণ তহবিলে। স্কুলের শিশুরাও এতে অংশ নেয়, যেন নতুন প্রজন্ম বুঝতে শেখে ত্যাগের মূল্য কত গভীর।
১১ নভেম্বর সকালে কানাডার রাজধানী অটোয়া শহরে ন্যাশনাল ওয়ার মেমোরিয়ালে আয়োজিত হয় প্রধান রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান। রাষ্ট্রপ্রধান, প্রধানমন্ত্রী, সেনা কর্মকর্তাসহ হাজারো মানুষ সেখানে শ্রদ্ধা জানান। টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার হয় সেই দৃশ্য, যখন পুরো দেশ থেমে যায় এক মিনিটের জন্য।
স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীরা কবিতা পাঠ, নাটক ও আলোচনার মাধ্যমে দিনটি পালন করে। অনেক স্কুলে জন ম্যাক্রের কবিতা In Flanders Fields পাঠ করা হয় আবেগভরে। তরুণ প্রজন্মের কাছে এটি হয়ে ওঠে ইতিহাস জানার ও মানবতার পাঠ নেওয়ার দিন।
Remembrance Day কেবল অতীতের কাহিনি নয়। এটি বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্যও এক সতর্ক সংকেত। মানবসভ্যতা যত এগিয়েছে, যুদ্ধের ভয়াবহতাও তত রূপ বদলেছে। কখনও অস্ত্রের, কখনও প্রযুক্তির, আবার কখনও মতাদর্শের মাধ্যমে এসেছে সেই ভয়াবহতা। তাই এই দিনটি শুধু সেনাদের নয়, প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ববোধ জাগানোর দিন।
যারা জীবন দিয়েছিলেন, তারা চেয়েছিলেন একটি শান্তিময় পৃথিবী। তাই আজকের প্রজন্মের দায়িত্ব সেই আদর্শকে জীবিত রাখা। “Least We Forget” কেবল একটি স্লোগান নয়, এটি এক চিরন্তন অঙ্গীকার। ইতিহাসের রক্তাক্ত শিক্ষাকে যেন আমরা ভুলে না যাই।
পুনশ্চ: লক্ষ্য করার মতো বিষয় হলো, কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের নাগরিকত্ব গ্রহণ করা বাংলাদেশিসহ বহু অভিবাসীই রিমেম্ব্রান্স ডে এবং এসব দেশের জাতীয় দিবসগুলোকে যথাযথ গুরুত্ব দেন না। কেবল একটি পাসপোর্টের সুবিধার জন্য নাগরিকত্ব গ্রহণ করা, অথচ সেই দেশের সংস্কৃতি, ইতিহাস ও মূল্যবোধকে উপেক্ষা করা অনেক সময় স্থানীয় নাগরিকদের কাছে অসন্তোষের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। নাগরিকত্ব কেবল একটি আইনি পরিচয় নয়, এটি একটি নৈতিক দায়িত্বও বটে। একজন প্রকৃত নাগরিক তার অধিকার সম্পর্কে যেমন সচেতন থাকবেন, তেমনি সেই দেশের সংস্কৃতি ও জাতীয় চেতনার প্রতিও আন্তরিক শ্রদ্ধা প্রদর্শন করবেন। এটিই সবার প্রত্যাশা।









