সম্পাদকের পাতা

আফ্রিকার নতুন জাগরণের প্রতীক ইব্রাহিম ট্রাওরে

নজরুল মিন্টো

পশ্চিম আফ্রিকার বিস্তীর্ণ মরুপ্রান্তে এখন উচ্চারিত হচ্ছে এক তরুণ সেনানায়কের নাম। তিনি হলেন ইব্রাহিম ট্রাওরে। তাঁর কণ্ঠে প্রতিবাদের সুর, চোখে জ্বলে আত্মমর্যাদার অগ্নি। তাঁর সাহস, দৃষ্টিভঙ্গি ও নেতৃত্ব আজ বুরকিনা ফাসো পেরিয়ে পুরো আফ্রিকা মহাদেশে নতুন আশার আলো জ্বেলেছে। তিনি কেবল একজন সেনা কর্মকর্তা নন, এক প্রজন্মের প্রতীক হয়ে উঠেছেন, যে প্রজন্ম অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়াতে শিখেছে।

ইব্রাহিম ট্রাওরে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সেনাবাহিনীর তরুণ সদস্য হিসেবে ক্ষমতায় আসেন। তিনি বুরকিনা ফাসোর ইতিহাসে সবচেয়ে কনিষ্ঠ রাষ্ট্রপ্রধান, বয়স তখন মাত্র ৩৪ বছর। অভ্যুত্থানের ঘোষণা দিয়েই তিনি জনগণকে আশ্বস্ত করেন, “এটি কোনো দখল নয়, এটি একটি পুনর্জন্ম।”

যখন বিশ্বের পরাশক্তিগুলো আফ্রিকার সম্পদ ও রাজনীতিকে নিজেদের প্রভাবে রাখার খেলায় মেতে ওঠে, তখন এই তরুণ প্রেসিডেন্ট ঘোষণা দিলেন, “আমাদের মানুষ আর দাস নয়, তারা নিজের ভাগ্য নিজেরাই নির্ধারণ করবে।”

বুরকিনা ফাসো প্রধানত একটি মুসলিম অধ্যুষিত দেশ। কিছুদিন আগে সৌদি আরব সরকার ২০০টি মসজিদ নির্মাণের প্রস্তাব দেয়, কিন্তু ট্রাওরে দৃঢ় কণ্ঠে তা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বললেন, “আমাদের দরকার স্কুল, হাসপাতাল ও কর্মসংস্থান। আমাদের প্রার্থনার জায়গা যথেষ্ট আছে, কিন্তু যেটা নেই, তা হলো মানুষের জীবিকা আর মর্যাদা।”

তাঁর এ সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুমুল আলোচনার জন্ম দেয়। মধ্যপ্রাচ্যের কিছু ধর্মীয় বিশ্লেষক সমালোচনা করলেও আফ্রিকার বহু তরুণ ও বুদ্ধিজীবী তাঁকে ধন্যবাদ জানান মানবকল্যাণকে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার ওপরে স্থান দেওয়ার জন্য।

ইব্রাহিম ট্রাওরে স্পষ্ট করে বললেন, “এটি বিশ্বাসের বিরুদ্ধে কোনো সিদ্ধান্ত নয়, এটি আমাদের জনগণের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান।”

বুরকিনা ফাসোর তরুণ প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম ট্রাওরে কেবল সৌদি আরবের প্রস্তাবই প্রত্যাখ্যান করেননি, তিনি সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তিগুলোকেও স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর আফ্রিকান নেতাদের উদ্দেশে দেওয়া কথিত হুঁশিয়ারির জবাবে ট্রাওরে ঘোষণা দেন, “আফ্রিকা আর কোনো উপনিবেশ নয়, আমরা সার্বভৌম জাতি। কেউ যদি আমাদের ভয় দেখাতে চায়, তারা ভয়াবহ ভুল করছে।”

তাঁর এই বক্তব্য শুধু ইসরাইল নয়, বরং পশ্চিমা প্রভাবের বিরুদ্ধে সমগ্র আফ্রিকার আত্মমর্যাদার প্রতিধ্বনি হয়ে ওঠে। তিনি সতর্ক করে বলেন, “যদি কোনো দেশ একজন আফ্রিকানের প্রতি হুমকি দেয়, তবে সেটি গোটা মহাদেশের প্রতি হুমকি হিসেবে গণ্য হবে।”

যে মাটিতে ইব্রাহিম ট্রাওরে জন্মেছেন, সেই বুরকিনা ফাসো আফ্রিকার অন্যতম সংগ্রামী দেশ। একসময় ফরাসি উপনিবেশ থাকা বুরকিনা ফাসো ১৯৬০ সালে স্বাধীনতা পেলেও দীর্ঘদিন দারিদ্র্য ও বিদেশি প্রভাবের শিকার ছিল। ১৯৮৪ সালে বিপ্লবী নেতা থমাস সানকারা দেশটির নাম দেন ‘বুরকিনা ফাসো’, যার অর্থ সৎ মানুষের দেশ। আজ সেই পথেই হাঁটছেন ট্রাওরে।

ট্রাওরের ভাষণ এখন আফ্রিকার প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে, প্রতিটি তরুণের মনে এক নতুন স্রোত জাগাচ্ছে। তিনি বলেন, “যখন আমাদের সোনা, তেল ও খনিজ সম্পদ অন্যরা নিয়ে যায়, তখন আমাদের স্বাধীনতার দাবি কেবল কাগজে লেখা এক প্রতিশ্রুতি। এখন সময় এসেছে আফ্রিকা নিজের ভবিষ্যৎ নিজের হাতে লেখার।”

বুরকিনা ফাসো থেকে নাইজার, মালি থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা সর্বত্র তরুণেরা এখন ইব্রাহিম ট্রাওরেকে দেখছে এক আলোর দিশারী হিসেবে। ঘানার, সেনেগালের ও কেনিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ট্রাওরের ছবি ও উক্তি এখন দেয়ালচিত্রের অংশ।

ইব্রাহিম ট্রাওরের শাসন সামরিক হলেও তিনি তা মানবিক রূপ দিয়েছেন। ক্ষমতায় এসে প্রথমেই দুর্নীতি দমন অভিযান শুরু করেন। তিনি সরকারি কর্মকর্তাদের বিলাসী জীবনযাপন বন্ধ করে দেন এবং জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখেন। রাজধানী উয়াগাদুগু থেকে গ্রামের মাটিতে গিয়ে তিনি কৃষকদের সঙ্গে কথা বলেন, তাদের সমস্যা শোনেন।

সম্প্রতি তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে যারা দুর্নীতিতে জড়িত ধরা পড়বে তাদের সম্পত্তি রাষ্ট্রীয় তহবিলে ফেরত নেওয়া হবে। পাশাপাশি তিনি “Citizen Defense Brigade” নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী গঠন করে সেনাবাহিনীর সঙ্গে সাধারণ নাগরিকদের একীভূত করতে শুরু করেছেন।

তিনি শিক্ষাকে জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করেছেন। নতুন পাঠ্যক্রমে যুক্ত করেছেন আফ্রিকার ইতিহাস ও ঐতিহ্য, যাতে তরুণরা নিজেদের শেকড় সম্পর্কে জানে এবং গর্ববোধ করে। স্বাস্থ্যসেবায়ও তিনি সংস্কার এনেছেন। তাঁর উদ্যোগে নির্মিত হচ্ছে সরকারি ক্লিনিক, মাতৃসেবা কেন্দ্র এবং সস্তায় ওষুধ সরবরাহ ব্যবস্থা।

ট্রাওরের সাহসিকতা কেবল ধর্মীয় অবস্থানেই সীমাবদ্ধ নয়, তা বিস্তৃত হয়েছে নৈতিক, রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক পরিসরেও। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও পশ্চিমা দাতাসংস্থাগুলোর তথাকথিত “মানবাধিকার” ও “আধুনিকায়ন” শর্তযুক্ত সহায়তা তিনি দৃঢ় কণ্ঠে প্রত্যাখ্যান করেন। এই সংস্থাগুলো ৭৩ পৃষ্ঠার একটি প্রস্তাব দেয়, যেখানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যৌন শিক্ষা চালু, পরিবার কাঠামোর সংজ্ঞা পরিবর্তন, এবং সংবিধানে জেন্ডার আইডেন্টিটি সংযোজনের মতো শর্ত ছিল। এই প্রস্তাবই তাঁর প্রতিবাদের সূচনা হয়ে ওঠে।

এর পরপরই জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে তিনি দাঁড়িয়ে বলেন, “আমরা আমাদের সম্পদ বিক্রি করতে চাই না, আমরা সেই সম্পদ দিয়েই আমাদের ভবিষ্যৎ গড়তে চাই। আমরা এমন কোনো সাহায্য চাই না, যা আমাদের মূল্যবোধ মুছে দেয়।”

তাঁর এই দৃপ্ত অবস্থানের পর বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন একযোগে বুরকিনা ফাসোর অর্থনৈতিক সহায়তা স্থগিত করে, কিন্তু ট্রাওরে নত হননি; তিনি জাতির উদ্দেশে ঘোষণা দেন, আমাদের মর্যাদা বিক্রি করে পাওয়া অর্থ নয়, স্বাধীনতার মূল্যবোধই আমাদের প্রকৃত সম্পদ।

ইতিমধ্যে মালি ও নাইজারের নেতারা ট্রাওরের নেতৃত্বে একত্র হয়েছেন। তাঁদের যৌথ উদ্যোগে গঠিত হয়েছে “সাহেল অ্যালায়েন্স” নামের নতুন আঞ্চলিক জোট, যার লক্ষ্য পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি ও আফ্রিকার নিজস্ব নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলা। একই সময়ে রাশিয়া ও চীন বুরকিনা ফাসোতে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ফলে ইব্রাহিম ট্রাওরের নীতি এখন বৈশ্বিক রাজনীতির ভারসাম্যে এক নতুন অধ্যায় সূচিত করছে।

ইব্রাহিম ট্রাওরে একজন ধর্মবিশ্বাসী মুসলমান, কিন্তু তাঁর ধর্মচিন্তা প্রগতিশীল ও মানবকেন্দ্রিক। তিনি ধর্মকে রাজনীতির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন না। তাঁর মতে, “আল্লাহ চায় মানুষ যেন মর্যাদার সঙ্গে বাঁচে, কেবল প্রার্থনায় নয়, কাজে ও জ্ঞানে।” তাঁর প্রত্যাখ্যাত সৌদি প্রস্তাব সেই দর্শনেরই প্রতিফলন।

তিনি বলেন, “আমরা এমন এক আফ্রিকা গড়ব, যেখানে আমাদের সন্তানরা অন্য দেশের ভিসার জন্য লাইনে দাঁড়াবে না, বরং নিজের মাটিতে মর্যাদার সঙ্গে কাজ করবে।”


Back to top button
🌐 Read in Your Language