সম্পাদকের পাতা

নিউ ইয়র্কের ডা. মির্জা বেগের অন্ধকার অধ্যায়

নজরুল মিন্টো

মানুষ যখন অসুস্থ হয়, তখন সে সবচেয়ে বেশি ভরসা খোঁজে একজন চিকিৎসকের ওপর। সেই মানুষটির হাতে তুলে দেয় নিজের জীবন, বিশ্বাস করে তাঁর প্রতিটি নির্দেশে আছে মুক্তির পথ। চিকিৎসকের কাছে প্রতিটি রোগী এক একটি পবিত্র দায়িত্ব। চিকিৎসকের পেশা তাই শুধু একটি কাজ নয়, এটি নৈতিকতা, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধের এক গভীর প্রতিজ্ঞা। কিন্তু সেই প্রতিজ্ঞা ভেঙে যখন একজন চিকিৎসক হয়ে ওঠেন বিশ্বাসভঙ্গের প্রতীক, তখন কেবল একজন রোগী নয়, কেঁপে ওঠে পুরো সমাজের নৈতিক ভিত্তি।

নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের মধ্যাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর সিরাকিউজ। এই শহরেই লিখিত হয়েছিল এক বেদনাদায়ক অধ্যায়, যেখানে চিকিৎসক ও রোগীর পবিত্র সম্পর্ক কলুষিত হয়েছিল অন্ধকার বাসনার গভীরে। সেই ঘটনার প্রতিধ্বনি কেবল নিউইয়র্কেই নয়, লজ্জায় স্তব্ধ করেছিল সমগ্র চিকিৎসা সমাজকে।

ডা. মির্জা বেদার বখত বেগ (Dr. Mirza Bedar bakht Beg MD) ছিলেন Upstate University Hospital–এর একজন সম্মানিত চিকিৎসক। আট বছর ধরে তিনি চিকিৎসা করছিলেন এক কিশোরী রোগীর, যার বয়স মাত্র ১৭। রোগীটি দীর্ঘদিন ধরে আলসারেটিভ কোলাইটিসে ভুগছিল, আর ডা. বেগ ছিলেন তার একমাত্র নির্ভরতার নাম। কিন্তু চিকিৎসক-রোগীর সেই সম্পর্ক ২০১৭ সালে এক ভয়ংকর মোড় নেয়।

সেই সময় ডা. বেগ চিকিৎসা বিষয়ক যোগাযোগ বজায় রাখার অজুহাতে রোগীর সঙ্গে মোবাইল নম্বর বিনিময় করেন। এরপর শুরু হয় একাধিক ডিজিটাল বার্তালাপ, যেখানে চিকিৎসার আলোচনার আড়ালে প্রবেশ করে ব্যক্তিগত, অনুচিত ও যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ বার্তা। ধীরে ধীরে তাঁর পাঠানো বার্তায় যোগ হতে থাকে অশোভন মিম ও ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য। কথোপকথনে উঠে আসে মদ্যপান, যৌনতা এবং ভালোবাসার ভাষা, যা চিকিৎসক ও রোগীর সম্পর্কের সীমানা অতিক্রম করে যায়।

রোগী অভিযোগ করেন, এই বার্তাগুলো তাঁকে “অস্বস্তিকর, বিভ্রান্তিকর এবং ভীত” করে তুলেছিল। তিনি বলেন, “ওগুলো ছিল অদ্ভুত, ভুল, এবং এমন কিছু যা কোনো ডাক্তার তাঁর রোগীকে কখনও বলতে পারেন না।”

একজন চিকিৎসকের কাছ থেকে এমন আচরণ কেবল নৈতিক নয়, মানসিক নির্যাতনেরও শামিল। শিশুকিশোর রোগীদের চিকিৎসায় যুক্ত একজন বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে এটি যেন এক ভয়াবহ ব্যর্থতার দৃষ্টান্ত।

২০১৮ সালের শুরুতে অভিযোগ ওঠার পর Upstate University Hospital তাঁকে প্রশাসনিক ছুটিতে পাঠায়, আর রাজ্য কর্তৃপক্ষ সাময়িকভাবে তাঁর চিকিৎসা কার্যক্রম স্থগিত করে। দীর্ঘ তদন্ত শেষে নিউইয়র্কের Board for Professional Medical Conduct সিদ্ধান্ত নেয় ডা. বেগের চিকিৎসা লাইসেন্স স্থায়ীভাবে বাতিল করা হবে।

২০২০ সালের ২ মার্চ কার্যকর হয় সেই সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্তে শেষ হয় এক চিকিৎসা ক্যারিয়ারের অধ্যায়, কিন্তু শুরু হয় পেশাগত নৈতিকতার এক বড় আলোচনার।

বোর্ডের শুনানি কমিটি মন্তব্য করে, “ডা. বেগ রোগীদের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ। তাঁর আচরণ ছিল সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য, অযৌক্তিক ও ক্ষমার অযোগ্য।” শুনানিতে রোগীর সেই অস্বস্তি ও বিভ্রান্তির অভিজ্ঞতাই প্রধান সাক্ষ্য হিসেবে গুরুত্ব পায়, যা বোর্ডের এই রায়কে দৃঢ় করে।

ডা. বেগ নিজেও শুনানিতে স্বীকার করেন, তিনি যে বার্তাগুলো পাঠিয়েছিলেন তা ভুল ছিল। তাঁর বক্তব্য ছিল, “আমি তখন প্রচণ্ড মানসিক চাপে ছিলাম। বৈবাহিক কলহ, কাজের চাপ, এবং বোর্ড পরীক্ষার প্রস্তুতি সব মিলিয়ে আমার আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলাম।”

কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, একজন চিকিৎসক যদি এমন চাপের মুখে নৈতিকতা ভুলে যান, তাহলে কীভাবে তাঁকে রোগীদের জীবন ও মানসিক সুস্থতার দায়িত্ব দেওয়া যায়? চাপ থাকলেও আত্মনিয়ন্ত্রণ হারানো কোনো চিকিৎসকের জন্য গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা হতে পারে না।

রোগীটির মা শুনানিতে বলেন, “ডা. বেগের বার্তাগুলো আমার মেয়েকে চিকিৎসা নিতে ভয় পাইয়ে দিয়েছিল। সে একা পরীক্ষার কক্ষে ঢুকতে পর্যন্ত ভয় পেত।”

এই ভয়, এই মানসিক আঘাত শুধু একটি কিশোরীর নয়; এটি সমগ্র সমাজের বিশ্বাসের ওপর আঘাত।
চিকিৎসক মানে যেখানে নিরাপত্তা, সান্ত্বনা ও আস্থা, সেখানে এই ঘটনাটি দেখিয়েছে কীভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার একটি কোমল জীবনের মানসিক ভারসাম্যকে ভেঙে দিতে পারে।

নিউইয়র্কের চিকিৎসা বোর্ডের এই সিদ্ধান্ত শুধু ডা. বেগের ব্যক্তিগত পতনের ইতিহাস নয়; এটি পুরো দক্ষিণ এশিয় কমিউনিটির ভাবমূর্তিতে এক গভীর আঘাত। তাঁর কর্মকাণ্ড বহু সৎ ও পরিশ্রমী চিকিৎসকের অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

একজন মানুষের ভুল কখনও শুধু ব্যক্তিগত থাকে না, বিশেষ করে যখন তিনি এমন এক পেশায় যুক্ত যেখানে বিশ্বাসই মূলভিত্তি।

ঘটনাটি প্রকাশের পর Syracuse.com, Medscape Medical News এবং Becker’s Hospital Review–এর মতো গণমাধ্যমগুলো একে চিকিৎসা নৈতিকতার ভয়াবহ ব্যত্যয় হিসেবে তুলে ধরে। সম্পাদকীয়গুলোতে প্রশ্ন তোলা হয়, ‘যদি এমন আচরণ হাসপাতালের দেয়ালের ভেতরেই ঘটে, তবে রোগীরা নিরাপদ কোথায়?’

অভিযোগ ওঠার পর ২০১৮ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করে সৌদি আরবে চলে যান, যেখানে ২০১৯ সালের জুলাই থেকে শিশু গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট হিসেবে কাজ শুরু করেন। কিন্তু স্থান পাল্টালেও বিবেকের দায় থেকে পালানো যায় না। নিউইয়র্ক রাজ্যের রায় তাঁকে আইনি ও নৈতিকভাবে চিহ্নিত করে দিয়েছে—“অযোগ্য, অনিরাপদ, এবং পেশাগতভাবে বিপজ্জনক।”

এই ঘটনার পর চিকিৎসা বোর্ড নতুন করে নৈতিক প্রশিক্ষণ ও মনস্তাত্ত্বিক স্ক্রিনিংয়ের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা শুরু করে। চিকিৎসা পেশায় প্রবেশ মানে কেবল ডিগ্রি অর্জন নয়; এটি একটি আজীবন অঙ্গীকার—মানবিকতার প্রতি, নৈতিকতার প্রতি, এবং রোগীর মর্যাদার প্রতি।

মির্জা বেগ সেই অঙ্গীকার ভেঙেছেন। তাঁর পতন কমিউনিটির জন্য এক সতর্কবার্তা। বিশ্বাসের জায়গায় যদি বাসনা, দায়িত্বের জায়গায় যদি লোভ, আর চিকিৎসার জায়গায় যদি নৈতিক শূন্যতা ঢুকে পড়ে, তবে মানবিক সমাজের মেরুদণ্ডই ভেঙে পড়বে। বিশ্বাসভঙ্গের এই গল্প আমাদের কাঁপিয়ে দেয়, কারণ এতে লুকিয়ে আছে একটি প্রশ্ন—আমরা আসলে কাকে বিশ্বাস করব?

ডা. মির্জা বেগের ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসা নৈতিকতার ইতিহাসে এক ভয়াবহ সতর্কবার্তা হয়ে থাকবে। কিন্তু এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। নিউইয়র্ক, ক্যালিফোর্নিয়া, টেক্সাস ও টরন্টোসহ উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য ও প্রদেশে আরও বেশ কয়েকজন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অনুরূপ অভিযোগের তদন্ত চলছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে যৌন হয়রানি, রোগীর গোপনীয়তা ভঙ্গ, এবং ক্ষমতার অপব্যবহার। আমরা একে একে সেই গল্পগুলো সামনে আনব, যাতে চিকিৎসা পেশার আড়ালে লুকিয়ে থাকা নৈতিক পতনের মুখোশ উন্মোচিত হয়।


Back to top button
🌐 Read in Your Language