
মধ্যপশ্চিম আমেরিকার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ওহাইও রাজ্য। উত্তরে লেক ইরি, দক্ষিণে ওহাইও নদী, চারপাশে বিস্তীর্ণ সমতলভূমি আর সবুজ প্রকৃতিতে ঘেরা এই অঙ্গরাজ্য শিল্প, শিক্ষা এবং কৃষিতে সমৃদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্রের “প্রেসিডেন্টদের রাজ্য” হিসেবেও ওহাইও বিখ্যাত, কারণ এখান থেকেই ৭ জন মার্কিন প্রেসিডেন্ট দেশ পরিচালনা করেছেন। এই রাজ্যের রাজধানী কলম্বাসে বসবাস করেন হাজার হাজার অভিবাসী পরিবার। তাদেরই একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নারী আজমেরি হক, যিনি এবার ইতিহাস গড়েছেন। তাঁর বয়স ৪১ বছর।
গত ৪ নভেম্বর ২০২৫ তিনি ওহাইও অঙ্গরাজ্যের প্রথম মুসলিম বিচারক হিসেবে আজমেরি হক নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতেছেন এবং ওহাইওর প্রথম মুসলিম বিচারক হিসেবে ইতিহাস গড়েছেন। WOSU জানায়, অনানুষ্ঠানিক হিসাবে তিনি প্রায় ১ লাখ ৩৩ হাজারের বেশি ভোট পেয়েছেন এবং ৩ দশকের বেশি সময় দায়িত্ব পালন করা বিচারক জেমস গ্রিনকে উত্তরসূরি করবেন। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তিনি ফ্র্যাঙ্কলিন কাউন্টির ইতিহাসে প্রথম naturalized citizen বিচারক হিসেবেও দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন।

আজমেরি হকের জন্ম বাংলাদেশে। শৈশবে তিনি বাবা-মায়ের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন। পরিবারটি প্রথমে নিউ ইয়র্কে বসবাস শুরু করে, পরে কানেকটিকাটে চলে যায়, যেখানে তারা ছিল নতুন সংস্কৃতির ভেতর একেবারে আলাদা একটি পরিবার। উচ্চশিক্ষার জন্য ২০০২ সালে আজমেরি ওহাইওতে আসেন এবং তখন থেকেই কলম্বাস শহর হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের প্রধান কেন্দ্র।

আজমেরি হক মেধাবী ছাত্রী ছিলেন। ২০০২ সালে তিনি ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হন এবং ২০১০ সালে ক্যাপিটাল ইউনিভার্সিটি ল’ স্কুল থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি নিউ ইয়র্ক ও ওহাইও—দুই রাজ্যে আইনচর্চার লাইসেন্সধারী।
শিক্ষা শেষ করে তিনি আইন পেশায় যোগ দেন এবং ওহাইওতে ফৌজদারি প্রতিরক্ষা আইনজীবী হিসেবে এক দশকেরও বেশি সময় কাজ করেন। তাঁর বিশেষ দক্ষতা রয়েছে DUI/DWI, Criminal Defense, এবং Juvenile Law–এ। তিনি বিশেষভাবে কমিউনিটি পর্যায়ে স্বল্পআয়ের পরিবার ও তরুণদের আইনি সহায়তা প্রদানেও সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন
পেশাজীবনের শুরুতে তিনি City of Lancaster–এর সহকারী প্রসিকিউটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর YMF Inc.–এর অ্যাসোসিয়েট অ্যাটর্নি হিসেবে কাজ করেন। বর্তমানে তিনি নিজস্ব ফার্ম Law Offices of Ajmeri Hoque–এর ম্যানেজিং পার্টনার হিসেবে দায়িত্বে আছেন।
আজমেরি হকের পেশাগত জীবনকে পরিচালিত করে এক সহজ নীতি। তিনি বলেন, ন্যায়বিচার মানে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, বরং মানুষের প্রতি সহানুভূতি দেখানো। একজন বিচারকের উচিত প্রতিটি মানুষের মানবিক বাস্তবতাকে বোঝা।
তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বিচারকের নিরপেক্ষতা। তিনি বলেন, “বিচারকের কাজ হলো সত্যের দিকে নিরপেক্ষভাবে তাকানো। তাঁকে সামাজিক, পরিবেশগত এবং ব্যক্তিগত প্রতিটি দিক বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।”

আজমেরি হক কেবল আইনজীবীই নন, তিনি সমাজসেবক এবং স্থানীয় রাজনীতিতেও সক্রিয়। কয়েক বছর আগে তিনি Dublin City Council Ward 1–এর নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন। সেই সময় থেকেই তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। মানুষ তাঁকে একজন সৎ, পরিশ্রমী এবং প্রগতিশীল চিন্তার নারী হিসেবে চেনে।
২০২৫ সালের শুরুতে তিনি ঘোষণা দেন ফ্র্যাঙ্কলিন কাউন্টি মিউনিসিপ্যাল কোর্টের বিচারক পদে প্রার্থী হওয়ার। প্রথম থেকেই তাঁর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। ফলে সবাই জানত, এই আসনে তিনিই নির্বাচিত হবেন।
গত ৪ নভেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আজমেরি হক আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচিত হন। তিনি জানুয়ারি ২০২৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। এই বিজয়ের পর ফ্র্যাঙ্কলিন কাউন্টি ডেমোক্রেটিক পার্টির আয়োজিত অনুষ্ঠানে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, “এটি আমার জন্য শুধু একটি ব্যক্তিগত সাফল্য নয়। এটি প্রতিটি অভিবাসী নারীর জন্য এক বার্তা—তোমরা পারবে, যদি বিশ্বাস রাখো নিজের স্বপ্নে।”
ওহাইওর স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো তাঁর এই অর্জনকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছে।
The Columbus Dispatch জানিয়েছে, “আজমেরি হক ওহাইওর বিচারব্যবস্থায় বৈচিত্র্য ও প্রতিনিধিত্বের নতুন যুগের সূচনা করেছেন।”
Spectrum News তাঁকে “একজন পথপ্রদর্শক মুসলিম নারী” হিসেবে বর্ণনা করে লিখেছে, “তিনি এমন এক প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করছেন যারা ন্যায়বিচার ও মানবিকতার সমন্বয় ঘটাতে চায়।”
WOSU Public Media জানায়, “ফ্র্যাঙ্কলিন কাউন্টিতে আজমেরি হকের জয় স্থানীয় মুসলিম ও দক্ষিণ এশীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে।”

আজমেরি হক বর্তমানে ওহাইওর ডাবলিন শহরে বসবাস করেন। তাঁর পরিবার তাঁকে সর্বদা সমর্থন করে এসেছে। তিনি বলেন, “আমার পরিবার আমার সবচেয়ে বড় শক্তি। আমি যা করতে পেরেছি, তা তাদের উৎসাহ ছাড়া সম্ভব হতো না।”
আজমেরি হকের বাবা-মা দুজনই শিক্ষিত এবং সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ মানুষ। মা ঘরে বাংলাদেশি রান্নার ঐতিহ্য বজায় রেখেছেন। আজমেরি বলেন, “প্রতি ঈদে আমরা এখনও বাংলাদেশের খাবার রান্না করি। এটি কেবল খাবার নয়, আমাদের শিকড়ের সঙ্গে সম্পর্কের প্রতীক।”

আজমেরি হক বিশ্বাস করেন, তাঁর এই জয় শুধুমাত্র একটি পদ লাভ নয়, বরং সামাজিক ন্যায়বিচারের এক নতুন যাত্রা। তিনি বলেন, “আমি চাই, আমার মাধ্যমে আরও অনেক দক্ষিণ এশীয় নারী অনুপ্রাণিত হোক। তারা যেন বিশ্বাস করে যে আমেরিকার বিচারব্যবস্থায় তাদেরও জায়গা আছে।”









