সম্পাদকের পাতা

ট্রাম্পের হুমকিতে বেড়ে গেছে মামদানির সমর্থন

নজরুল মিন্টো

নিউ ইয়র্ক শহরের বাতাসে আজ তীব্র উত্তেজনা। চারপাশে এক ধরনের চ্যালেঞ্জের আবহ, নাগরিকদের মনে এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের ভার। ম্যানহাটনের রাস্তা থেকে সাবওয়ে স্টেশন, ব্রুকলিনের ক্যাফে থেকে কুইন্সের দোকানপাট সবখানেই আলোচনার বিষয় একটাই, নিউ ইয়র্কবাসীকে ট্রাম্পের হুমকি।

রবিবার সিবিএস-এর ‘৬০ মিনিটস’ (60 Minutes) অনুষ্ঠানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যদি Zohran Mamdani নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র নির্বাচনে জয়ী হন, তাহলে তিনি এই শহরে “ন্যূনতম ফেডারেল তহবিল ছাড়া” আর কোনো অর্থ পাঠাবেন না। যদিও কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া ফেডারেল তহবিল বন্ধ করা যায় না, তবু রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে এই হুমকি ভোটের মাঠে ভয় এবং উত্তেজনা দুটিই বাড়িয়েছে।

রাজনীতিতে কখনো কখনো একটি বাক্যই পাল্টে দিতে পারে পুরো নির্বাচনের গতিপথ। কানাডার সাম্প্রতিক সাধারণ নির্বাচনে ঠিক এমনটিই ঘটেছিল। নির্বাচনের আগমুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি বেফাঁস মন্তব্য করেন। তিনি কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের “৫১তম রাজ্য” বলে অভিহিত করেন।

এই মন্তব্য কানাডীয়দের কাছে জাতীয় মর্যাদায় আঘাত হিসেবে প্রতিভাত হয়। তখন পতনের মুখে থাকা লিবারেল পার্টির নেতা মার্ক কার্নি (Mark Carney) দৃঢ়ভাবে এর জবাব দেন “কানাডা কোনো রাজ্য নয়, এটি এক স্বাধীন জাতির গর্বিত প্রতীক।” ট্রাম্পের মন্তব্যের বিপরীতে এই দৃঢ় অবস্থান কানাডিয়দের মনে দেশপ্রেম ও প্রতিরোধের আবেগ জাগিয়ে তোলে।

ফলস্বরূপ, ভোটাররা বিপুলভাবে লিবারেল পার্টির পক্ষে দাঁড়ায়, এবং আশ্চর্যজনকভাবে দলটি আবারও ক্ষমতায় ফিরে আসে।

আজ নিউ ইয়র্কেও যেন ঠিক সেই দৃশ্যপটের পুনরাবৃত্তি ঘটছে। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক হুমকি ও বক্তব্যে শহরের নাগরিকদের মধ্যে ক্ষোভ দানা বেঁধেছে। যারা আগে নিরপেক্ষ অবস্থানে ছিলেন, তারাও এখন বলছেন, “আমরা কারও ভয় দেখানো রাজনীতিকে মেনে নেব না।”

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্পের মন্তব্য নিউ ইয়র্কবাসীর আত্মপরিচয়ের প্রশ্নকে নাড়া দিয়েছে। ভয়ভিত্তিক প্রচারণা উল্টো মামদানির প্রতি সহানুভূতি ও সমর্থন তৈরি করেছে। ইতিমধ্যে তরুণ ভোটাররা সামাজিক মাধ্যমে “Defend Our City” এবং “Vote for Dignity” স্লোগান ছড়িয়ে দিয়েছে। অনেকেই বলছেন, “ট্রাম্পের মুখেই মামদানির জনপ্রিয়তা বেড়ে গেছে।” এখন পুরো শহর যেন প্রতিরোধের আবহে।

সাম্প্রতিক ইতিহাসে ক্ষমতায় থাকা কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টকে একটি শহরের নির্বাচনে এভাবে প্রকাশ্যে প্রভাব বিস্তার করতে দেখা খুবই বিরল। রাজনীতির ভাষায় একে বলা যায়, একপ্রকার সরাসরি হস্তক্ষেপ, কিন্তু সাধারণ নিউ ইয়র্কবাসীর চোখে এটি নিছকই এক চাপের রাজনীতি।

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এমন প্রকাশ্য সতর্কবার্তা খুব কমই দেখা গেছে। এমনকি ১৯৭০ বা ১৯৮০-এর দশকে নিউ ইয়র্ক যখন অর্থনৈতিক মন্দার মুখে, তখনও কোনো প্রেসিডেন্ট শহরকে অর্থ বন্ধের হুমকি দেননি। যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্য স্থানীয় শাসন ও ভোটের স্বাধীনতাকে ফেডারেল রাজনীতির ঊর্ধ্বে রেখেছে, ট্রাম্পের মন্তব্য সেই প্রথাকেই প্রশ্নের মুখে তুলেছে।

“যদি কমিউনিস্ট মামদানি জয়ী হন, তবে নিউ ইয়র্ক ধ্বংস হবে” ট্রাম্পের এই বক্তব্য শুধু রূঢ় নয়, আমেরিকান গণতন্ত্রের মৌলিক চেতনাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। অথচ এই হুমকিই যেন উল্টো ফল তৈরি করেছে। ট্রাম্পের বক্তব্যের পর মামদানির প্রতি সমর্থন বেড়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। তরুণ ও মধ্যবিত্ত ভোটারদের একাংশ মনে করছেন, “যে প্রার্থীকে ওয়াশিংটন ভয় পায়, সেই প্রার্থীই পরিবর্তনের প্রতীক।”

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, নিউ ইয়র্কবাসীরা আজ কেবল একজন মেয়র বেছে নিচ্ছেন না, বরং তারা ভোট দিচ্ছেন আত্মসম্মানের প্রশ্নে। এক প্রেসিডেন্টের হুমকির বিপরীতে তারা নিজেদের শহরের মর্যাদা রক্ষার পক্ষে দাঁড়াচ্ছেন। কুইন্স, ব্রঙ্কস ও ব্রুকলিনের কর্মজীবী মানুষদের মুখে শোনা যাচ্ছে “এই শহর আমাদের, আর এবার আমরাই তার ভবিষ্যৎ ঠিক করব।”

ধর্ম ও বংশপরিচয় যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণত ব্যক্তিগত বিষয়, কিন্তু এই নির্বাচনে এর ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে।দেশটি নিজেকে “ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র” হিসেবে উপস্থাপন করে এসেছে, যেখানে একজন প্রার্থীর যোগ্যতা নির্ধারিত হয় তাঁর নীতি, চরিত্র ও নেতৃত্বগুণের ভিত্তিতে, ধর্মীয় পরিচয়ের নয়।

কিন্তু ২০২৫ সালের নিউ ইয়র্ক সিটি মেয়র নির্বাচনে এই ধারণাটিই যেন ধাক্কা খেয়েছে। প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে তরুণ Zohran Mamdani–কে ঘিরে হঠাৎ করেই ধর্ম ও পারিবারিক বংশধারার আলোচনাই যেন কেন্দ্রে চলে এসেছে। তিনি মুসলমান পিতা ও হিন্দু মাতার সন্তান, জন্ম আফ্রিকার উগান্ডায়, ভারতীয় বংশোদ্ভূত পরিবারে বড় হয়েছেন। এই পরিচয় তাঁকে একদিকে বৈচিত্র্যের প্রতীক বানিয়েছে, অন্যদিকে কিছু রক্ষণশীল গোষ্ঠীর আক্রমণের লক্ষ্যেও পরিণত করেছে।

অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এই ধর্মীয় ও জাতিগত বিশ্লেষণ কেবল মামদানির ক্ষেত্রেই করা হচ্ছে। বাকি দুই প্রার্থী Andrew Cuomo ও Curtis Sliwa এর ক্ষেত্রে একই প্রশ্ন কেউ তুলছে না। অথচ Cuomo একজন রোমান ক্যাথলিক, যার পরিবার ইতালির দক্ষিণ অঞ্চল থেকে অভিবাসী হয়ে নিউ ইয়র্কে আসে। অন্যদিকে Curtis Sliwa জন্ম নেন একটি রোমান ক্যাথলিক পরিবারে। যেখানে তাঁর পিতা পোলিশ বংশোদ্ভূত এবং মাতা ইতালীয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আজকের ভোট শুধু একজন মেয়র বেছে নেওয়ার বিষয় নয়, বরং এটি নিউ ইয়র্কবাসীর আত্মমর্যাদা ও বিশ্বাসের পরীক্ষা। ট্রাম্পের ভয় দেখানো রাজনীতির বিপরীতে মামদানির পরিবর্তনের আহ্বানই এখন শহরের আলোচ্য বিষয়। কেউ বলছেন, এই ভোট ট্রাম্পের অহঙ্কারের বিরুদ্ধে জনগণের স্পষ্ট জবাব, আবার অনেকে দেখছেন এটি এক প্রজন্মের সাহসিক ঘোষণা, যারা ভয় পেছনে ফেলে সামনে এগোতে চায়।

যে শহর একদিন অভিবাসীদের স্বপ্নে গড়ে উঠেছিল, আজ সেই শহরই হয়তো আমেরিকান গণতন্ত্রের নতুন ইতিহাস লিখতে চলেছে। নিউ ইয়র্কের মানুষ আজ (৪ নভেম্বর ২০২৫) তাদের ভোটের মাধ্যমে জানিয়ে দেবে যে এই শহরের ভবিষ্যৎ ভয় দেখিয়ে নয়, নাগরিকদের ইচ্ছায় নির্ধারিত হবে।


Back to top button
🌐 Read in Your Language