
উত্তর আমেরিকার আকাশে এখন শরতের শেষ রঙ। গাছের পাতায় লাল-কমলা আগুন, হ্রদের জলে ধীরে ধীরে নেমে আসছে ঠান্ডা কুয়াশা। এমন ঋতু পরিবর্তনের মাঝেই আসছে সময় বদলের মুহূর্ত। প্রতি বছরের মতো নভেম্বরের প্রথম রবিবার ভোরে ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা পিছিয়ে দেওয়া হবে। এর মধ্য দিয়েই শেষ হবে এই বছরের ডেলাইট সেভিং টাইম (Daylight Saving Time সংক্ষেপে DST)।
এ যেন সময়ের সঙ্গে মানুষের এক চিরন্তন দোলাচল। ঋতুর ছন্দে বদলায় সময়ের গতি, আর সময়ের বদলে পাল্টে যায় জীবনযাত্রার ছন্দ।
উত্তর আমেরিকা মহাদেশ সময়ের দিক থেকে এক বৈচিত্র্যের মহাদেশ। আটলান্টিক উপকূল থেকে শুরু করে প্যাসিফিক মহাসাগর পর্যন্ত ছয়টি টাইমজোনে ভাগ হয়ে আছে পুরো যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা।
অ্যাটলান্টিক টাইম (AT) হ্যালিফ্যাক্স, মনকটন; ইস্টার্ন টাইম (ET) টরন্টো, নিউ ইয়র্ক, ওয়াশিংটন; সেন্ট্রাল টাইম (CT) শিকাগো, উইনিপেগ; মাউন্টেন টাইম (MT) ক্যালগারি, ডেনভার; প্যাসিফিক টাইম (PT) ভ্যাঙ্কুভার, লস অ্যাঞ্জেলেস; আলাস্কা ও হাওয়াই টাইম উত্তর-পশ্চিমের প্রান্ত।
এক প্রান্তে সূর্য ওঠে যখন অন্য প্রান্তে তখনও রাতের ঘুম গভীর। এ কারণেই সময় বদলের প্রথা। ঘড়ির কাঁটা এগোনো বা পিছোনো সব অঞ্চলে একসঙ্গে কার্যকর হলেও ভৌগোলিকভাবে তা অনুভূত হয় ভিন্নভাবে।
সময় বদলের ধারণা নতুন নয়, কিন্তু এর প্রয়োগের ইতিহাস বেশ রোমাঞ্চকর। ১৭৮৪ সালে বেনজামিন ফ্রাঙ্কলিন প্রথম প্রস্তাব দেন, দিনের আলো কাজে লাগিয়ে রাতে মোমবাতির খরচ কমানো যেতে পারে। তবে সেটি তখন ছিল কেবল ধারণা।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় (১৯১৬) জার্মানি ও অস্ট্রিয়া যুদ্ধকালীন জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য প্রথমবার ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা এগিয়ে নেয়। অল্প সময়ের মধ্যেই ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার দেশগুলোও এই পদ্ধতি অনুসরণ শুরু করে।
যুক্তরাষ্ট্রে DST চালু হয় ১৯১৮ সালে, আর কানাডায় প্রায় একই সময়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এটি পুনরায় চালু হয় “War Time” নামে, এবং পরে স্থায়ী রূপ পায়।
ডেলাইট সেভিং টাইম আসলে সময়ের দুটি ভিন্ন প্রক্রিয়া। প্রথমটি হচ্ছে মার্চ মাসের দ্বিতীয় রবিবার। এ সময় ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা এগিয়ে দেওয়া হয় (Spring Forward)। উদ্দেশ্য দিনের আলো দীর্ঘ করা, যাতে সন্ধ্যায় বেশি সময় প্রাকৃতিক আলো পাওয়া যায়।
দ্বিতীয়টি হচ্ছে নভেম্বরের প্রথম রবিবার। এ সময় ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা পিছিয়ে দেওয়া হয় (Fall Back)। উদ্দেশ্য সকালবেলার আলো ফিরে পাওয়া এবং শীতকালীন সময়ের সঙ্গে তাল মেলানো।
এই দুটি পরিবর্তনকে অনেকেই মনে রাখেন সহজ ছন্দে “Spring forward, fall back.” সময়ের এই খেলার মূল উদ্দেশ্য শক্তি সাশ্রয় ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি। গ্রীষ্মকালে দিনের আলো দীর্ঘায়িত করলে রাতে কম আলো জ্বালাতে হয়, ফলে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হয়। আবার শীতে সকালবেলার আলো কাজে লাগাতে ঘড়ি পিছিয়ে দেওয়া হয়, যাতে অফিস ও স্কুল শুরুর সময় প্রাকৃতিক আলো পাওয়া যায়।
লাভের দিক হচ্ছে প্রথমতঃ শক্তি সাশ্রয়। গবেষণায় দেখা গেছে, সময় বদলের ফলে গড়ে ১–২% পর্যন্ত বিদ্যুৎ খরচ কমে।
দ্বিতীয়তঃ অর্থনৈতিক সুবিধা। দীর্ঘ দিনের আলো মানুষকে বাইরে সময় কাটাতে উৎসাহিত করে। ফলে খুচরা ব্যবসা, বিনোদন কেন্দ্র ও রেস্টুরেন্টগুলোতে আয় বেড়ে যায়।
তৃতীয়তঃ সামাজিক ও মানসিক প্রভাব। বিকেলের আলো বাড়ায় অনেকের মনোভাব উন্নত হয়, বিষণ্ণতা কমে, এবং শরীরচর্চা বাড়ে।
ক্ষতির দিক হচ্ছে প্রথমতঃ জৈবঘড়ির ব্যাঘাত ঘটে। মানুষের দেহের অভ্যন্তরীণ সময়চক্র হঠাৎ সময় পরিবর্তনে বিভ্রান্ত হয়। অনিদ্রা, ক্লান্তি, এমনকি হৃদরোগের ঝুঁকিও বাড়ে।
দ্বিতীয়তঃ দুর্ঘটনার আশঙ্কা বৃদ্ধি পায়। সময় এগিয়ে দেওয়ার পরের সপ্তাহে গাড়ি দুর্ঘটনা ও কর্মক্ষেত্রের ভুলের হার বেড়ে যায় এমন তথ্য গবেষণায় পাওয়া গেছে।
তৃতীয়তঃ অনেকেই মনে করেন আধুনিক যুগে এটি অকার্যকর। এখন যখন হিটিং ও কুলিং যন্ত্রের ব্যবহার ব্যাপক, তখন সময় পরিবর্তনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সাশ্রয় আগের মতো কার্যকর নয়।
মজার ব্যাপার হচ্ছে একই দেশে বসবাস করে সময় বদলের এ প্রথা কেউ মানে, আবার কেউ মানে না। হাওয়াই, অ্যারিজোনা (যুক্তরাষ্ট্র) ও সাসকাচুয়ান (কানাডা) DST পালন করে না।
মেক্সিকো ২০২২ সালে জাতীয়ভাবে DST বাতিল করেছে, যদিও সীমান্তবর্তী শহরগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সময়ের সঙ্গে মিল রাখতে এখনো তা অনুসরণ করে।
এই পার্থক্যের কারণে অনেক সময় ভ্রমণকারীদের জন্য বিভ্রান্তি তৈরি হয়। এক শহরে সূর্য ডোবে ৬টায়, পাশের রাজ্যে তখনও ঘড়িতে ৫টা!
সাম্প্রতিক সময়ে উত্তর আমেরিকায় সময় বদলের এই প্রথা নিয়ে বিতর্ক তীব্র হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট ২০২২ সালে “Sunshine Protection Act” নামে একটি বিল পাস করেছে, যার উদ্দেশ্য—ডেলাইট সেভিং টাইমকে স্থায়ী সময় হিসেবে কার্যকর করা। অর্থাৎ আর বছরে দুইবার ঘড়ি বদলানোর দরকার হবে না।
কানাডার অন্টারিও ও ব্রিটিশ কলাম্বিয়াতেও অনুরূপ আলোচনা চলছে, তবে তারা জানিয়েছে প্রতিবেশী রাজ্যগুলো (যেমন নিউ ইয়র্ক, ওয়াশিংটন) একমত হলে তবেই তারা পরিবর্তন আনবে।
সময়কে মানুষ যেমন মাপে ঘড়িতে, তেমনই মাপে সূর্যের আলোয়। প্রতি বছর মার্চে এক ঘণ্টা এগিয়ে যাওয়ায় আমরা পাই দীর্ঘ গ্রীষ্মের দিন, আর নভেম্বরে এক ঘণ্টা পিছিয়ে যাওয়ায় ফিরে পাই উজ্জ্বল সকাল ও দীর্ঘ শীতের রাত।
এই ছোট্ট পরিবর্তন যেন প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এক একান্ত বোঝাপড়া। যেখানে আমরা চেষ্টা করি সময়কে নিজের প্রয়োজনমতো একটু টেনে বা ঠেলে সাজাতে। ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে বা পিছিয়ে নেওয়ার এই প্রথা কারও কাছে বিজ্ঞান, কারও কাছে কেবলই অভ্যাস। কিন্তু এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে সময়, ঋতু ও মানুষের সহাবস্থানের এক অসাধারণ উদাহরণ।









