
ইংল্যান্ডের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত শান্ত নদীঘেরা ছোট্ট শহর কেমব্রিজ। এ নামটি উচ্চারণ করলেই জ্ঞানের আলোকিত ইতিহাস চোখে ভেসে ওঠে। কেমব্রিজ কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয় নয়, এটি মানবসভ্যতার চিন্তা, বিজ্ঞান ও সৃষ্টিশীলতার এক অবিনশ্বর প্রতীক। আট শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এই নগরী বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মনীষী, বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক ও দার্শনিকদের গড়ে তুলেছে, যারা বিশ্ব ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন করেছেন।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম ১২০৯ সালে। কথিত আছে, অক্সফোর্ডে এক ছাত্র-শিক্ষক বিরোধের পর কিছু পণ্ডিত ও ছাত্র এসে আশ্রয় নেন কেমব্রিজ শহরে, এবং এখানেই গড়ে ওঠে নতুন এক শিক্ষা কেন্দ্র; যা পরবর্তীকালে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ও সম্মানজনক বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়। ১৩১৮ সালে রাজা এডওয়ার্ড (দ্বিতীয়) আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়টির স্বীকৃতি দেন।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ দিক হলো এর “কলেজ ব্যবস্থা”। বর্তমানে এখানে ৩১টি স্বতন্ত্র কলেজ রয়েছে, প্রতিটি নিজস্ব ঐতিহ্য ও স্থাপত্যে অনন্য। যেমন Trinity, King’s, St. John’s, Christ’s ইত্যাদি।
বিশেষ করে Trinity College (প্রতিষ্ঠিত ১৫৪৬ সালে) কেমব্রিজের গৌরবের প্রতীক। এখানেই পড়েছিলেন স্যার আইজ্যাক নিউটন, যিনি আপেলের পতন থেকে মহাকর্ষের সূত্র আবিষ্কার করে বিশ্ববিজ্ঞানকে পাল্টে দেন। ট্রিনিটি কলেজের বিখ্যাত “Newton’s Apple Tree” আজও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে প্রতীকীভাবে রোপিত আছে, যেন যুগে যুগে জ্ঞানের মূলে অনুসন্ধানের সাহস জাগিয়ে রাখে।

কেমব্রিজ শহরটি যেন এক জীবন্ত মিউজিয়াম। গথিক, টিউডর ও ভিক্টোরিয়ান স্থাপত্যের এক চমৎকার সমন্বয় এই শহরের কলেজ ভবনগুলো।
শহরের বুক চিরে বয়ে চলেছে River Cam, যার নাম থেকেই “Cam” + “bridge” মিলে শহরের নাম “Cambridge” হয়েছে। এই নদীই শহরের প্রাণ। নদীর জলে ছোট ছোট পন্টিং নৌকা ভেসে চলে। পর্যটক ও ছাত্রছাত্রী সবাই এখানে সময় কাটায়। নদীর তীরে সবুজ ঘাসে ঘেরা “The Backs” এলাকা যেন প্রকৃতি ও স্থাপত্যের এক মিলনমেলা।
কেমব্রিজ শুধু ইতিহাস নয়, এটি আধুনিক বিজ্ঞানের জন্মভূমি। এখানেই জন্ম নিয়েছে নিউটনের গতিসূত্র, ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্ব, ম্যাক্সওয়েলের তড়িৎচুম্বক তত্ত্ব, ওয়াটসনের ডিএনএ-গঠন আবিষ্কার, এবং স্টিফেন হকিংয়ের মহাবিশ্ব তত্ত্ব।
চার্লস ডারউইন, যিনি “Origin of Species”-এর মাধ্যমে জীববিজ্ঞানে বিপ্লব ঘটান, ছিলেন কেমব্রিজের ছাত্র। জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল, আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের জনক, এখানেই অধ্যাপক ছিলেন। আর আধুনিক যুগে স্টিফেন হকিং, স্যার মার্টিন রিস, এবং রজার পেনরোজ এই প্রতিষ্ঠানকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেন।
এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আজ পর্যন্ত প্রায় ১২১ জন নোবেল বিজয়ী বেরিয়েছেন; যা বিশ্বের যে কোনো প্রতিষ্ঠানের তুলনায় সর্বাধিক।

বিজ্ঞানের আলোয় যেমন কেমব্রিজ উজ্জ্বল, তেমনি মানবিক ও সাহিত্যচর্চাতেও এর অবদান অসীম। এখানে পড়েছেন জন মিল্টন, লর্ড বায়রন, টি. এস. এলিয়ট, ই. এম. ফস্টার, ভার্জিনিয়া উলফ, স্যার আইজ্যাক বার্লো, এ. এন. হোয়াইটহেড, উইটগেনস্টাইন; যাঁদের চিন্তা মানবজীবন ও সভ্যতার দিকনির্দেশক।
রাজনীতিতে এখান থেকেই উঠে এসেছেন অলিভার ক্রমওয়েল, জওহরলাল নেহরু, লি কুয়ান ইউ, বোরিস জনসন, এমনকি প্রিন্স চার্লস পর্যন্ত।
কেমব্রিজের শিক্ষাব্যবস্থা অনন্য। এখানে লেকচারের পাশাপাশি ক্ষুদ্র টিউটোরিয়াল ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীরা সরাসরি অধ্যাপকের সঙ্গে মতবিনিময় করে। এই ব্যক্তিগত মনোযোগই কেমব্রিজের শিক্ষাকে অনন্য করে তুলেছে।
গবেষণার সুযোগও ব্যাপক। এখানে প্রতি বছর অসংখ্য আন্তর্জাতিক প্রকল্পে কাজ করেন বিজ্ঞানী ও গবেষকরা।
কেমব্রিজ শুধু একাডেমিক শহর নয়, এটি সংস্কৃতি ও প্রাণের শহর। এখানকার ক্যাফে, বইয়ের দোকান, সংগীতানুষ্ঠান, নাট্যমঞ্চ ও গ্যালারি শহরটিকে প্রাণবন্ত রাখে।
বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা হাজারো ছাত্রছাত্রী, গবেষক ও পর্যটক শহরটিকে দিয়েছে এক আন্তর্জাতিক রূপ। কেমব্রিজের পথে পথে শোনা যায় ইংরেজির পাশাপাশি ফরাসি, জার্মান, চীনা, এমনকি বাংলা ভাষাও।
কেমব্রিজে এখন অনেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থীও পড়াশোনা করছে। বিশেষ করে বিজ্ঞান, আইন ও সমাজবিজ্ঞানে। তারা কেবল নিজেদের ক্যারিয়ার নয়, দেশের ভাবমূর্তিকেও উজ্জ্বল করছে।
শহরে ছোট একটি বাংলাদেশি কমিউনিটিও আছে। রেস্টুরেন্ট, দোকান, টিউটরিং সেন্টার, এবং সাংস্কৃতিক সংগঠন ঘিরে তাদের জীবনযাপন।

কেমব্রিজের ইতিহাসে বাঙালিদের পদচিহ্ন উজ্জ্বলভাবে লিপিবদ্ধ আছে। দক্ষিণ এশিয়ার এক ক্ষুদ্র জাতি হয়েও জ্ঞান ও গবেষণার আলোয় নিজেদের প্রতিভা প্রমাণ করেছেন একাধিক বাঙালি পণ্ডিত, আইনজ্ঞ ও বিজ্ঞানী। তাঁরা কেউ কেমব্রিজের ছাত্র, কেউ শিক্ষক, কেউবা গবেষক; কিন্তু সবার মধ্যেই একটাই মিল, জ্ঞান ও সততার নিরলস সাধনা।
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম গৌরবময় প্রাক্তন ছাত্র। তিনি পড়াশোনা করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীন ও মর্যাদাপূর্ণ Trinity College, Cambridge-এ।
বাংলাদেশের বিশিষ্ট আইনজীবী ও ব্যবসায়িক সংগঠক ব্যারিস্টার নিহাদ কবির কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী। তিনি পড়াশোনা করেছেন Trinity Hall College-এ, যেখানে তিনি আইনে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে LL.M ডিগ্রিও সম্পন্ন করেন।
আধুনিক বিজ্ঞানের জগতে বাংলাদেশের গৌরবের নাম প্রফেসর তৌফিক হাসান। তিনি King’s College-এর সাবেক ছাত্র এবং বর্তমানে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের Department of Engineering-এর অধ্যাপক। তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত Cambridge Graphene Centre আজ ইউরোপের অন্যতম প্রভাবশালী গবেষণাকেন্দ্র।
বাংলাদেশের প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও চিন্তাবিদ প্রফেসর সৈয়দ আলী আশরাফ ছিলেন কেমব্রিজের প্রাচীন কলেজ Fitzwilliam College-এর ছাত্র। তিনি সেখানে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং পরবর্তীতে PhD অর্জন করেন। তিনি “Islamic Academy, Cambridge” প্রতিষ্ঠা করেন, যা আজও ইসলামী চিন্তা ও শিক্ষা নিয়ে আন্তর্জাতিক গবেষণা পরিচালনা করছে।
বাংলাদেশের বিখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক প্রফেসর এম. হারুনুর রশিদ কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর পড়াশোনা করেছেন Archaeology and Anthropology বিভাগে। তিনি এখান থেকে PhD ডিগ্রি অর্জন করেন। বাংলাদেশের মহাস্থানগড়, ময়নামতি ও পুন্ড্রনগরীর প্রাচীন সভ্যতা নিয়ে তাঁর গবেষণা বাংলাদেশের ইতিহাসচর্চায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
নতুন প্রজন্মের তরুণ গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাহদি আমিন সম্প্রতি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে MPhil in Modern South Asian Studies সম্পন্ন করেছেন। তিনি ছিলেন St. Edmund’s College-এর ছাত্র। তাঁর গবেষণার ক্ষেত্র দক্ষিণ এশিয়ার আধুনিক রাজনীতি ও গণতান্ত্রিক রূপান্তর।
এইসব নাম কেবল কেমব্রিজের অ্যালামনি তালিকায় যুক্ত নয়; তাঁরা বাংলাদেশকে বিশ্বমানচিত্রে চিনিয়ে দিয়েছেন বুদ্ধি, মেধা ও গবেষণার শক্তিতে। কেমব্রিজের প্রাচীন প্রাঙ্গণে তাঁদের পদচিহ্ন আজও স্মরণ করিয়ে দেয়, শিক্ষার আলো জাতির সীমা মানে না। বাঙালিদের এ সাফল্য প্রমাণ করে জ্ঞান, নৈতিকতা ও সৃজনশীলতার পথে বাংলাদেশও বিশ্বসভায় সম্মানজনক অবস্থান নিতে পারে।
যে কেউ একবার কেমব্রিজে এলে বুঝতে পারবে এই শহর এক জীবন্ত ইতিহাসের ধারক। সকালে কলেজের ঘণ্টাধ্বনি, নদীর পন্টিং নৌকায় ভেসে চলা ছাত্রছাত্রী, পাথরের রাস্তার পাশে বাইসাইকেলে ছুটে চলা গবেষক, আর সবুজ প্রান্তরে বসে থাকা মানুষজন সবকিছু মিলে কেমব্রিজ এক অদ্ভুত প্রশান্তি দেয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারগুলো যেন জ্ঞানের সাগর। Cambridge University Library-এ আছে ৮০ লাখেরও বেশি বই ও পাণ্ডুলিপি। এর মধ্যে শেকসপিয়র, নিউটন ও ডারউইনের হাতে লেখা পাণ্ডুলিপিও সংরক্ষিত আছে।
সময় বদলেছে, প্রযুক্তি এগিয়েছে, কিন্তু কেমব্রিজের মূলে যে আদর্শ, তা আজও অপরিবর্তিত। “From here, light and sacred draughts.” “এখান থেকেই জ্ঞানের আলো ও পবিত্র পানীয় প্রবাহিত হয়।”
এই মন্ত্র যেন আজও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়, নতুন প্রজন্মকে সত্যের অনুসন্ধানে আহ্বান জানায়।









